দেশের চিকিৎসকেরা গড়ে ৪৮ সেকেন্ডে রোগী দেখেন!

দেশের চিকিৎসকেরা একজন রোগীর পেছনে গড়ে ৪৮ সেকেন্ড সময় দেন। ৬৭টি দেশের ওপর করা গবেষণার ভিত্তিতে যুক্তরাজ্যভিত্তিক চিকিৎসা সাময়িকী ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল বলছে, বিশ্বে বাংলাদেশের চিকিৎসকেরা রোগীপ্রতি সবচেয়ে কম সময় ব্যয় করেন। ভারত ও পাকিস্তানের চিকিৎসকেরা রোগীর পেছনে যথাক্রমে ২ দশমিক ৩ মিনিট এবং ১ দশমিক ৩ মিনিট সময় দেন।


ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল বলছে, বিশ্বব্যাপী রোগী দেখার সময়ে ব্যাপক পার্থক্য আছে। অধিকাংশ দেশের মানুষ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করতে মাত্র কয়েক মিনিট সময় পান। এর বিরূপ প্রভাব পড়ে রোগীর স্বাস্থ্যসেবার ওপর। পাশাপাশি কিছু চিকিৎসকের ওপর কাজের বোঝা ও মানসিক চাপও পড়ে।

এ বিষয়ে গত বুধবার একটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেছে ১৭৭ বছরের পুরোনো এই মেডিকেল সাময়িকী। ‘ইন্টারন্যাশনাল ভ্যারিয়েশন ইন প্রাইমারি কেয়ার ফিজিশিয়ান কনসালটেশন টাইম: আ সিস্টেমেটিক রিভিউ অব ৬৭ কান্ট্রিজ’ শিরোনামের প্রবন্ধে দেখা যায়, সুইডেনের চিকিৎসকেরা সবচেয়ে বেশি সময় দেন। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য সুইডেনের রোগীরা গড়ে চিকিৎসকদের কাছ থেকে সাড়ে ২২ মিনিট সময় পান।

বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে এই তথ্য সম্পর্কে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লা প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশের রোগী দেখার সময় সম্পর্কে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। অনেক পুরোনো তথ্য এ প্রবন্ধে ব্যবহার করা হয়েছে। অবস্থার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এ ব্যাপারে নতুন গবেষণা দরকার—এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের চিকিৎসকেরা রোগীকে সময় কম দেন এটা ঠিকই, কিন্তু এতটা কম নয়।’

বর্তমান প্রবন্ধে রোগী দেখা বিষয়ে ৬৭টি দেশের ১৭৯ গবেষণার তথ্য পর্যালোচনা করা হয়েছে। ওই গবেষণাগুলো ১৯৪৬ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ইংরেজি, চীনা, জাপানি, স্পেন, পর্তুগিজ ও রুশ ভাষায় ছাপা হয়েছে। এসব গবেষণায় মোট ২ কোটি ৮৪ লাখ ৭০ হাজার ৭১২টি পরামর্শের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।

ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল–এর গবেষণায় বাংলাদেশের ছয়টি গবেষণার তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলো ১৯৯৪ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে ছাপা হয়েছে। এসব গবেষণায় বাংলাদেশের ৩৩ হাজার ৮৫৬ জন রোগীর তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, রোগী দেখার সময়ের সঙ্গে সেবার মানের সম্পর্ক আছে। ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহারবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল নেটওয়ার্ক ফর দ্য র‍্যাশনাল ইউজ অব ড্রাগস রোগী দেখার সময়কে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। এদের যুক্তি হচ্ছে, ওষুধের নিরাপদ ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে রোগীর বেশি সময় দরকার চিকিৎসকের কাছ থেকে। কিন্তু একজন রোগীর জন্য একজন চিকিৎসক কত সময় ব্যয় করবেন, তা কোনো দেশে নির্দিষ্ট করে দেওয়া নেই। মিসরে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য রোগীকে কমপক্ষে ৩০ মিনিট সময় দেওয়ার একটা সুপারিশ আছে। সাধারণভাবে বলা হয়, রোগীকে বেশি সময় দিলে ফল ভালো হয়।

প্রবন্ধে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, গবেষণার অন্তর্ভুক্ত ১৮টি দেশে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি মানুষ বসবাস করে। অথচ এই দেশগুলোতে রোগীরা গড়ে পাঁচ মিনিটের কম সময় পান। এর পেছনে হয়তো কিছু কারণ থাকে। যেমন সুশাসনের অভাব, জনবলস্বল্পতা, চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সমস্যা ও সমন্বয়হীনতা।

উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও চীনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এই তিনটি দেশে সাক্ষাৎসূচির (অ্যাপয়েন্টমেন্ট) বিষয়টি ঠিকমতো কাজ করে না। অনেক চিকিৎসক দৈনিক ৯০ জনের বেশি রোগী দেখেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ায় রোগী দেখার সময় বাড়ছে।

সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা, মেডিকেল শিক্ষা—এসব নিয়ে গবেষণা করছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, দেশে জনবলের স্বল্পতা একটি সমস্যা। তবে উদ্যোগ নিলে সমস্যা কিছু ক্ষেত্রে দূর করা সম্ভব। হাসপাতালগুলোতে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা চিকিৎসকদের অনেক সময় নিয়ে নেন।