জঙ্গি তৎপরতা-৩

ঝিনাইদহে বিস্তার ঘটছে সালাফি মতাদর্শের

আহমেদ জায়িফ ও আজাদ রহমান
প্রকাশ: ০৪ জুন ২০১৭, ০৩:৪৪
আপডেট: ০৪ জুন ২০১৭, ০৮:১০

৮৫ বছরের রব্বান বিশ্বাস একসময় জামায়াতে ইসলামীর সক্রিয় কর্মী ছিলেন। সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে মনোমালিন্যের কারণে সেই রাজনীতি থেকে সরে এসেছেন বেশ আগে। ধর্মীয় আচার পালনের ক্ষেত্রে জীবনের প্রায় পুরোটাই ছিলেন হানাফি মতাদর্শের অনুসারী। শেষ সময়ে এসে তিনি এখন সালাফি মতাদর্শ গ্রহণ করেছেন।

ঝিনাইদহ শহর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে চুয়াডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা রব্বান বিশ্বাস। সম্প্রতি ঝিনাইদহে র‍্যাব-পুলিশের জঙ্গিবিরোধী চারটি অভিযানের তিনটিতেই জড়িয়ে আছে চুয়াডাঙ্গা ও পাশের পোড়াহাটি গ্রামের নাম। ২৩ এপ্রিল পোড়াহাটি গ্রামের ধর্মান্তরিত মুসলিম আবদুল্লাহর বাড়িতে জঙ্গিবিরোধী অভিযান চালিয়ে বিস্ফোরক উদ্ধার করে পুলিশ। ১৩ দিন পর মহেশপুর উপজেলার বজরাপুর গ্রামে পুলিশের অভিযানে আবদুল্লাহ ও চুয়াডাঙ্গা গ্রামের তুহিন বিশ্বাস নিহত হন। পুলিশ বলছে, তাঁরা নব্য জেএমবির সদস্য ছিলেন। তাঁরা সালাফি মতাদর্শী। রব্বান বিশ্বাস হলেন তুহিন বিশ্বাসের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। আবদুল্লাহ ও তুহিনের বাড়ি রব্বান বিশ্বাসের বাড়ি থেকে হাঁটাপথ। তাঁরা সবাই একই মসজিদে নামাজ পড়তেন।

গ্রামের লোকজন জানান, রব্বান বিশ্বাস ও আবদুল্লাহর শ্বশুর আবদুল লতিফ ছয়-সাত বছর আগে এলাকায় সালাফি মতাদর্শের প্রচার শুরু করেন। তাঁদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে নিহত দুই জঙ্গি আবদুল্লাহ, তুহিনসহ এলাকার ২০-২৫ জন তরুণ ও প্রবীণ ব্যক্তি সালাফি ধারায় নামাজপড়াসহ ধর্মীয় আচার পালন শুরু করেন।

গত ৪, ৫ ও ৬ মে এই এলাকার নয়জন ব্যক্তি নিখোঁজ হন। যাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে গতকাল ভোরে গ্রেপ্তার করেছে বলে জানিয়েছে র‍্যাব। গত ১৫ মে র‍্যাব দুজনকে গ্রেপ্তার করে তাঁদের বাড়ি থেকে বিস্ফোরক উদ্ধারের খবর জানায়। এঁরাসহ সম্প্রতি এ জেলায় জঙ্গি সন্দেহে গ্রেপ্তার সবাই সালাফি ধারায় ধর্মীয় আচার পালন করতেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন। সালাফি মতাদর্শীরা বাংলাদেশে ‘ওহাবি’ নামে বেশি পরিচিত। দেশের কোথাও কোথাও এঁরা ‘আহলে হাদিস’ বা ‘মোহাম্মদী’ নামেও পরিচিত। মধ্যপ্রাচ্যসহ বাইরের দুনিয়ায় এ ধারাটি এখন সালাফি নামেই পরিচিত। মুসলিম বিশ্বে ওহাবি বা সালাফি মতাদর্শ প্রচারের ক্ষেত্রে সৌদি রাজপরিবার পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছে বলে প্রচার আছে। বাংলাদেশে মুসলমানদের অধিকাংশই হানাফি মাজহাবের অনুসারী। সালাফির সংখ্যা খুব বেশি নয়। দেশের উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে সালাফিদের প্রভাব আছে। এ ছাড়া সাতক্ষীরা, জামালপুর, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলের কিছু উপজেলায় সালাফি মতাদর্শী লোকজন রয়েছে।

প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঝিনাইদহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় এই মতাদর্শ অনুসরণকারীর সংখ্যা বাড়ছে। সদর উপজেলার ডাকবাংলা, হলিধানি, চোরকোল গ্রাম ও শৈলকুপা উপজেলার আশুর হাট, ফলিয়া, গয়েশপুর এবং কালীগঞ্জ উপজেলার মনোহরপুর, একতারপুর ও ভিটাখোলা গ্রামে এই মতাদর্শের অনেক অনুসারী আছে। এসব এলাকায় তাদের আলাদা মসজিদ রয়েছে, যার অনেকগুলোই নির্মাণ করা হয়েছে গত পাঁচ-সাত বছরের মধ্যে। বছর দেড়েক ধরে ঝিনাইদহে নব্য জেএমবির তৎপরতার খবরও বের হচ্ছে। ঝিনাইদহে জঙ্গি হামলায় গত বছর চারজন ধর্মীয় ভিন্নমতাবলম্বী খুন হন। গুলশানের হলি আর্টিজানে ও শোলাকিয়ায় ঈদের জামাতে জঙ্গি হামলায় অংশগ্রহণকারী তিনজন ঝিনাইদহ শহরের একটি বাড়িতে ছিলেন কয়েক মাস। সেখানে তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় বলে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের একজন কর্মকর্তা জানান।

সালাফি বা আহলে হাদিস মতাদর্শ অনুসরণ করা মানেই উগ্রপন্থা সমর্থন করা, তা নয়। বড় অংশই শান্তিপ্রিয়, সাধারণ জীবনযাপন করেন। তবে ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ-জেএমবি এবং বর্তমানে সক্রিয় নব্য জেএমবির প্রায় সবাই সালাফি মতাদর্শী হওয়ায় এই ধারাটি আলোচনায় এসেছে। ইসলামের নামে বিভিন্ন দেশে এখন সক্রিয় প্রায় সব উগ্রপন্থী গোষ্ঠীই সালাফি ঘরানার।

ঝিনাইদহের চুয়াডাঙ্গা জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন আবদুল মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, তিনি ২০১০ সালে সৌদি আরব থেকে ফিরে গ্রামের একটা পরিবর্তন দেখেন। প্রথম দিকে রব্বান বিশ্বাস, আবদুল লতিফসহ আরও কয়েকজন মসজিদে ভিন্নভাবে নামাজ (রুকুর আগে ও পরে হাত ওপরে তোলা) পড়তেন। একপর্যায়ে তাঁদের সংখ্যা ২০-২৫ জন হয়ে গেলে তাঁরা নামাজের পর দোয়া করা বা মিলাদ পড়ার বিষয়ে আপত্তি তুলতে শুরু করেন। এ নিয়ে বিভিন্ন সময় গ্রামে বাগ্‌বিতণ্ডাও হয়। তাঁদের নিয়মকানুন না মানায় মসজিদের ইমাম আল আমিন ২০১৪ সালে চাকরি ছেড়ে চলে যান।

গত সপ্তাহে রব্বান বিশ্বাসের সঙ্গে তাঁর বাড়িতে বসে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের কথা ও কাজে মিল না থাকায় ১৯৮৫ সালে দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। এরপর তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর আর কোনো রাজনীতি করেননি।

সালাফি মতাদর্শে ঝোঁকার বিষয়ে তিনি বলেন, ১৯৯৫ সালে তাঁর মেয়েকে চরকোল গ্রামে আহলে হাদিসপন্থী একটি পরিবারে বিয়ে দেন। ওই পরিবার তাঁকে উদ্বুদ্ধ করে। এরপর তিনি নিজে পড়াশোনা করে এই মতাদর্শ গ্রহণ করেন। তাঁর দাবি, আবদুল লতিফ (নিহত জঙ্গি আবদুল্লাহর শ্বশুর, এখন নিখোঁজ) একদিন মসজিদের ইমামের সঙ্গে নিয়মকানুন পরিবর্তন নিয়ে ঝগড়া বাধান। তখন মীমাংসার জন্য কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক খন্দকার আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীরকে ডাকা হয়। তিনি সালাফিদের মতো নামাজ চালিয়ে নিতে কোনো সমস্যা নেই বলে মতামত দেন।

গ্রামের অন্যদেরও এই মতাদর্শের দিকে টেনে আনার কথা অস্বীকার করেন রব্বান বিশ্বাস। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর মতামত দেওয়ার পরে তাঁর লেখা বই এনে অনেকেই পড়েছে। সেখান থেকে তারা এই মতাদর্শে অনুপ্রাণিত হতে পারে।

খন্দকার আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর ঢাকার আলিয়া মাদ্রাসায় পড়াশোনা শেষে সৌদি আরবের ইমাম মুহাম্মদ বিন সাউদ ইসলামিক ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেন। ১৯৯৮ সালে দেশে ফিরে তিনি কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। একই বছর প্রতিষ্ঠা করেন আস্‌ সুন্নাহ ট্রাস্ট। ঝিনাইদহের এর আওতায় মসজিদ, মাদ্রাসা, গবেষণাগার ও পাঠাগার রয়েছে।

আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। আস্‌ সুন্নাহ ট্রাস্টের সেক্রেটারির দায়িত্বে আছেন আবদুর রহমান সালাফি। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর সালাফি মতাদর্শে অনুসরণের কথা বলতেন না। তিনি কোরআন ও হাদিসের ভিত্তিতে ইসলাম পালনের কথা বলতেন।

প্রসংগত, সালাফিপন্থী সংগঠন আহলে হাদিস বাংলাদেশ ও জমিয়তে আহলে হাদিসও একই কথা বলে।

জানা যায়, ঝিনাইদহ শহরের সালাফি মতাদর্শীরা বেপারীপাড়ার ‘আহলে হাদিস জামে মসজিদে’ বিভিন্ন উপলক্ষে একত্র হন। সেখানে ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে সালাফি মতাদর্শ অনুযায়ী আলোচনা হয়। তাঁরা ঈদের নামাজও আলাদা করে পড়েন সরকারি কেশবচন্দ্র (কেসি) কলেজের মাঠে। সম্প্রতি ওই মসজিদটিতে গিয়ে দেখা হয় রবি নামের এক যুবকের সঙ্গে। তিনি নিজের পুরো নাম বলতে রাজি হননি। কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করেছেন বলে জানান। নিজেকে মসজিদের একজন খাদেম বলে পরিচয় দেন।

রবি বলেন, এক আত্মীয়ের মাধ্যমে তিনি সালাফি মতাদর্শের সঙ্গে পরিচিত হন। এরপর নিজে পড়াশোনা করে ২০০৮ সাল থেকে এই মতাদর্শ গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, তাঁর গ্রাম দীঘের পাড়ে একসময় এই মতাদর্শে বিশ্বাসী কেউ ছিল না। এখন অনেকেই এটা অনুসরণ করছে।

বেপারীপাড়া আহলে হাদিস জামে মসজিদের খতিব মো. ইসরাঈল হোসেন থাকেন ঝিনাইদহ শহর থেকে ২৩ কিলোমিটার দূরে কোলাবাজার ইউনিয়নে। গত সপ্তাহে সেখানে গেলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তারা জমিয়তে আহলে হাদিস নামে একটি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। দাওয়াতি কার্যক্রমের কারণে এই মতাদর্শের লোকজনের সংখ্যা বাড়ছে।

২০-২৫ বছর ধরে ঝিনাইদহ শহরে ইমামতি করছেন এমন দুজন ইমামের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁরা বলেন, ১৭-১৮ বছর আগ থেকে সালাফি মতাদর্শী মানুষের উপস্থিতি একটু একুট করে তাঁদের নজরে আসে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এদের সংখ্যা অনেক বাড়ছে। একজন ইমাম বলেছেন, তাঁদের দাওয়াতি কার্যক্রম বেশ জোরদার। এ ক্ষেত্রে আস্‌ সুন্নাহ ট্রাস্টের ভূমিকা আছে বলেও মনে করেন এক ইমাম। তিনি এই ট্রাস্টের অর্থের উৎস খতিয়ে দেখা দরকার বলে মনে করেন।

তবে সালাফি মতাদর্শের এই বিস্তার এবং এর সঙ্গে জঙ্গিবাদের বৃদ্ধির কোনো সম্পর্ক আছে কি না, এ ব্যাপারে পরিষ্কার কোনো ধারণা নেই বলে জানালেন ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, এই সালাফিদের সংখ্যা বাড়ছে এটা তাঁর জানা নেই। সম্প্রতি এখানে পুলিশের অভিযানে যেসব জঙ্গি নিহত হয়েছেন ও যারা গ্রেপ্তার হয়েছে তারা কোনো মতাদর্শের চর্চা করত, সেটাও তাঁর জানা নেই। তবে এরা নব্য জেএমবির সদস্য।

এ বিষয়ে ঢাকায় কাউন্টার টেররিজম বিভাগের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, অন্যান্য এলাকার মতো ঝিনাইদহে নিহত ও গ্রেপ্তার হওয়া নব্য জেএমবির সবাই সালাফি মতাদর্শী। এঁদের মধ্যে যাঁরা পারিবারিক সূত্রে নয়, নতুন করে সালাফি হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে উগ্রতা বেশি। গত বছর ভিন্নমতাবলম্বী যেসব ব্যক্তি ঝিনাইদহে খুন হয়েছেন, তাতে নব্য জেএমবির জঙ্গিরাই জড়িত ছিলেন বলে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।