সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ, জামালপুর

সগৌরবে সত্তর

সজীব মিয়া
প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, ০০:০১
আপডেট: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, ০০:০৪

ছবির মতো সুন্দর ক্যাম্পাস শিক্ষার্থীদের বড় স্বপ্ন দেখার সাহস যোগায়কলেজের মূল ফটকে যখন পৌঁছালাম তখন ভরদুপুর। ভেতরে ঢুকতেই মনে হলো সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ ক্যাম্পাসজুড়ে যেন বইছে উৎসবের হাওয়া। ঝা-চকচকে পথ, নতুন রঙের ছোঁয়া পেয়ে স্থাপনাগুলো হয়ে উঠেছে রঙিন। মূল ফটকের বর্ণিল তোরণটি থেকে জেনেছি জামালপুর জেলার স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি এ বছরই সগৌরবে পা রেখেছে সত্তর বছরে। তবে কি এটি সত্তরের সাজ নাকি পয়লা ফাল্গুনের!
এমন ভাবনায় আরও একটু সামনে এগোতেই হাতের ডানে যে চত্বরটি তার নাম বকুলতলা। কয়েকজনকে দেখা গেল বাসন্তী পোশাকে। তাঁদের উল্টো পাশেই বসে ছিলেন আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী। সেখানেই কথা হয় তাঁদের সঙ্গে। বইয়ের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে অর্থনীতি বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী মহসিন কাঁকন বলেন, ‘আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লাগে কলেজ ক্যাম্পাস। স্নাতক শেষে পরিবারের চাপ ছিল ঢাকায় থিতু হতে, কিন্তু ক্যাম্পাসের টানেই আরও কিছুদিন থাকছি।’ তাঁর পাশে বসা স্নাতক পড়ুয়া লুবা জায়ানা অবশ্য বললেন অন্য কথা, ‘এখানে আমরা সবাই পরিবারের মতো, শিক্ষকদের সঙ্গেও আমাদের সম্পর্কটা দারুণ। আমাদের যেকোনো সমস্যার জন্য তাঁদের পরামর্শ নিতে পারি।’
.বকুলতলা থেকে পা বাড়াই অধ্যক্ষের সাক্ষাৎ পেতে। চলতি পথে কথা হয় উচ্চমাধ্যমিক পড়ুয়াদের দল ফজলে রাব্বী, তৌকির আলম আর আবু লাইসের সঙ্গে। তাদের কণ্ঠে ছিল, কলেজের শৃঙ্খলা, ভালো ফল করার জন্য পড়াশোনার প্রতি শিক্ষকদের তাগাদা আর ঐতিহ্যবাহী এই কলেজে পড়ার গর্ব।
শিক্ষার্থীদের সে শৃঙ্খলার কথা শোনা গেল কলেজের অধ্যক্ষ মুজাহিদ বিল্লাহ ফারুকীর মুখেও। বলছিলেন, ‘শিক্ষার্থী ভর্তি থেকে শুরু করে একাডেমিক উন্নয়নে গত বছর থেকে আমরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তার সুফলও পাচ্ছি। তবে শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধাসহ কিছু ক্ষেত্রে আমাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে শিক্ষার্থীরা যেন তাল মিলিয়ে চলতে পারে, সে জন্য প্রযুক্তির সঙ্গে তাদের মেলবন্ধন তৈরির প্রয়াস আমাদের সব উদ্যোগেই থাকছে।’
একনজরে
আশেক মাহমুদ কলেজের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৪৬ সালে। প্রতিষ্ঠার সময় নাম ছিল জামালপুর কলেজ। উৎসব স্মরণিকা থেকে জানা গেল, আশেক মাহমুদ তালুকদার নামের এই শিক্ষানুরাগী জামালপুর কলেজ প্রতিষ্ঠায় আর্থিকভাবে সার্বিক সহযোগিতা করেন। এরপর ১৯৪৭ সালে তাঁর নামে জামালপুর কলেজকে আশেক মাহমুদ কলেজ নামকরণ করা হয়। ১৯৪৬-৪৭ শিক্ষাবর্ষে ১৬০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে পাঠদান কার্যক্রম শুরু হয় কলেজটিতে। ১৯৭৯ সালে কলেজটি জাতীয়করণ হয়। ময়মনসিংহ বিভাগের জামালপুর ও শেরপুর জেলার শিক্ষার্থীদের স্বনামধন্য এই কলেজটিতে বর্তমানে ১৪টি বিষয়ে স্নাতক ও ৯টি বিষয়ে স্নাতকোত্তর পড়ানো হয়। এ ছাড়া রয়েছে উচ্চমাধ্যমিক পড়ার সুযোগ। উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর মিলে কলেজের শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার।

. .

কৃতী শিক্ষার্থী
এই কলেজের সাবেক শিক্ষার্থীরা জায়গা করে নিয়েছেন দেশের সংগীত, চলচ্চিত্র, খেলাধুলা, রাজনীতিসহ নানা ক্ষেত্রে। প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছেন বরেণ্য গীতিকার নজরুল ইসলাম বাবু ও চলচ্চিত্র পরিচালক আমজাদ হোসেন। ক্রীড়াঙ্গনে এই কলেজের প্রতিনিধিত্ব করছেন জাতীয় ক্রিকেট দলের রকিবুল হাসান ও কলেজের বর্তমান শিক্ষার্থী অনূর্ধ্ব-১৯ দলের আরিফুল ইসলাম জনি।
অধ্যক্ষ মুজাহিদ বিল্লাহ ফারুকী বলেন, ‘পাটের জিনের নকশা আবিষ্কার করা বিজ্ঞানী দলের সামিউল হক কিন্তু আমাদের কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্যসচিব আবুল কালাম আজাদ এবং বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম আশেক মাহমুদ কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী। আরও অনেকের নাম হয়তো চট করে মনে পড়ছে না কিন্তু তাঁরা এই কলেজের প্রতিনিধিত্ব করছেন।’
৭০ বছর পূর্তি উৎসব

২০ ফেব্রুয়ারি থেকে তিন দিনব্যাপী উদ্যাপিত হলো কলেজের ৭০ বছর পূর্তি উৎসব। আয়োজনে ছিল আলোচনা সভা, কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা, প্রাক্তন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের স্মৃতিচারণা, আতশবাজি ও ফানুস ওড়ানো এবং মাইলস, জলের গানসহ দেশ সেরা ব্যান্ড দলের পরিবেশনায় কনসার্ট।
২২ ফেব্রুয়ারি ছিল উৎসব আয়োজনের বিশেষ দিন। এই দিন আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উৎসবে হাজির হয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। এ ছাড়া ক্যাম্পাসে সমবেত হয়েছিলেন কলেজের সাবেক শিক্ষার্থীরা। পুনর্মিলনীর এই আয়োজনে প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা ফিরে গিয়েছিলেন ক্যাম্পাস জীবনে। প্রিয় ক্যাম্পাসে হাজির হয়ে অনেকে হয়ে পড়েন আবেগাপ্লুত। পুরোনোদের কাছে পেয়ে বর্তমান শিক্ষার্থীরা পেয়েছেন এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা।

মুজাহিদ বিল্লাহ ফারুকীঅভিভাবক হিসেবে থাকার চেষ্টা করি
মুজাহিদ বিল্লাহ ফারুকী
অধ্যক্ষ, সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ, জামালপুর জামালপুরের মতো একটি গ্রামীণ জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে আমরা প্রতিটি শিক্ষার্থীর পাশে অভিভাবক হিসেবে থাকার চেষ্টা করি। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের সমন্বিত প্রচেষ্টায় আমরা কিছু উদ্যোগ নিয়েছি। এর মধ্যে রুটিনমাফিক ক্লাস নেওয়া, বিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের বছরের শুরুতেই ব্যবহারিক ক্লাস নেওয়া, ২৫ জন শিক্ষার্থীর শিক্ষাবিষয়ক অগ্রগতি জানার দেখভালের জন্য একজন করে পর্যবেক্ষককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যা খুবই চমকপ্রদ ফল দিয়েছে। এ ছাড়া কলেজের উচ্চমাধ্যমিক থেকে শুরু করে স্নাতক, স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বেসিক কম্পিউটার শিক্ষার পাশাপাশি আইসিটি ক্লাব, বিজ্ঞান ক্লাব, ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব, ক্যারিয়ার কাউন্সিলসহ বিভিন্ন ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত করে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছি।