
বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সঙ্গে স্বজনদের সংঘর্ষ হয়েছে। এতে ছয় ইন্টার্ন চিকিৎসক আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন চিকিৎসকেরা। এ ঘটনার পর অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করেছেন ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা।
গতকাল মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে হাসপাতালের সপ্তম তলার মেডিসিন ওয়ার্ডে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনায় ছাত্রদলের নেতা–কর্মীসহ সাতজনকে আসামি করে মামলা করেছে হাসপাতাল প্রশাসন। পুলিশ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে।
ইন্টার্ন চিকিৎসক ঋতু মণ্ডল বলেন, ‘আমরা অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি পালন করছি। চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতি চলবে।’
ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতির মধ্যে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা চালু আছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জ্যেষ্ঠ ও মধ্য পর্যায়ের চিকিৎসকদের দিয়ে রোগীদের চিকিৎসাসেবা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মেডিসিন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন বগুড়া সদর উপজেলার রাজাপুর এলাকার বাসিন্দা আবদুল মালেক (৫৫) অ্যাজমার জটিলতায় গতকাল রাতে মারা যান। তাঁর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে স্বজনেরা উত্তেজিত হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে দায়িত্বে থাকা চিকিৎসকের সঙ্গে তাঁদের বাগ্বিতণ্ডা ও মারামারি হয়।
ইন্টার্ন চিকিৎসকদের অভিযোগ, একজন চিকিৎসককে রক্ষা করতে গেলে ইন্টার্ন চিকিৎসক আজরাফ ইসলাম হামলার শিকার হন। পরে অন্য ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা এগিয়ে এলে দুই পক্ষের মধ্যে মারামারি শুরু হয়। এতে ছয়জন ইন্টার্ন চিকিৎসক আহত হন। কয়েকজনের হাড় ভেঙেছে বলে দাবি করেছেন তাঁরা।
ঘটনার পরপর তাৎক্ষণিকভাবে রোগীর স্বজনদের কারো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটি তিনি শুনেছেন। চিকিৎসকদের ওপর হামলায় ছাত্রদলের কেউ জড়িত থাকলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।এম আর হাসান পলাশ, বগুড়া জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক
ঘটনার পর রোগীর সঙ্গে আসা ছয়জনকে হাসপাতালের ভেতরে আটকে রাখেন ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা। রাত তিনটার দিকে পুলিশ গিয়ে তাঁদের আহত অবস্থায় উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়।
এ ঘটনায় আজ বুধবার হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার আনোয়ার হোসেন বাদী হয়ে সাতজনের নামে বগুড়া সদর থানায় মামলা করেন। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা ৭-৮ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে চিকিৎসকদের ওপর হামলা, ভাঙচুর এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার ছয়জন হলেন বগুড়া শহরের ফুলবাড়ী দক্ষিণপাড়ার নাফিউল ইসলাম (২৬), প্রান্ত (২২), রাকিবুল হাসান (১৮), ফুলবাড়ী উত্তরপাড়ার মুন্না শেখ (১৮), নামাজগড় এলাকার বিপ্লব সরদার (২৬) ও নিশিন্দারা এলাকার তানভীর শেখ (২৬)। পুলিশ জানিয়েছে, নাফিউল ইসলাম ১৮ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের আহ্বায়ক, প্রান্ত যুগ্ম আহ্বায়ক ও রাকিবুল হাসান সদস্য এবং মুন্না শেখ ১৯ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সহসাংগঠনিক সম্পাদক।
তবে ওই তরুণদের পদ–পদবি নিশ্চিত হওয়া যায়নি বলে দাবি করেছেন বগুড়া জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক এম আর হাসান পলাশ। আজ সকালে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনাটি তিনি শুনেছেন। চিকিৎসকদের ওপর হামলায় ছাত্রদলের কেউ জড়িত থাকলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আবদুল মালেকের মৃত্যুর পেছনে চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা বা ভুল ছিল না। ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতির কারণে চিকিৎসাসেবা যাতে ব্যাহত না হয়, সে জন্য দৈনন্দিন দায়িত্বে বেশিসংখ্যক জ্যেষ্ঠ চিকিৎসককে যুক্ত করা হয়েছে।মনজুর এ মুর্শেদ, হাসপাতালের উপপরিচালক
বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইব্রাহিম আলী বলেন, রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে স্বজন ও ইন্টার্ন চিকিৎসকদের মধ্যে মারামারির খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা অভিযোগ করেছেন, ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলে বহিরাগতরা তাঁদের ওপর হামলা করেছেন।
আবদুল মালেকের মৃত্যুর পেছনে চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা বা ভুল ছিল না বলে দাবি করেছেন হাসপাতালের উপপরিচালক মনজুর এ মুর্শেদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতির কারণে চিকিৎসাসেবা যাতে ব্যাহত না হয়, সে জন্য দৈনন্দিন দায়িত্বে বেশিসংখ্যক জ্যেষ্ঠ চিকিৎসককে যুক্ত করা হয়েছে।
আজ ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সঙ্গে বৈঠকের পরও পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান হয়নি। এ অবস্থায় আগামীকাল বৃহস্পতিবার আবার জরুরি বৈঠক ডেকেছে হাসপাতাল প্রশাসন।
মনজুর-ই-মুশেদ বলেন, উদ্ভুত পরিস্থিতিতে আগামীকাল জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে। বৈঠকে বগুড়া জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।