
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজধানীর গুলশানের ১৯৬ নম্বর বাসভবনকে ‘বিশেষ শ্রেণির’ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা (কেপিআই) হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে বাড়িটি এখন থেকে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থার আওতায় আসবে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভবন ও আশপাশের এলাকায় কিছু বিধিনিষেধও কার্যকর হবে।
ইতিমধ্যে এ–সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ৭ জুন কেপিআই–সংক্রান্ত কমিটির (কেপিআইডিসি) মাসিক সভায় গুলশানের ১৯৬ নম্বর ভবনটিকে কেপিআই নীতিমালার ‘বিশেষ শ্রেণি’তে অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ করা হয়। সরকারের অনুমোদনের ভিত্তিতে ১৬ জুন এ–সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি হয়।
আওয়ামী লীগের শাসনামলে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ছিল গণভবন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতন হয়। সেদিন বিক্ষুব্ধ জনতা গণভবনে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর করে। এরপর গণভবনকে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ করার সিদ্ধান্ত নেয় তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। সেখানে জাদুঘরের নির্মাণকাজ শেষে এখন তা উদ্বোধনের অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর থাকার সুযোগ নেই।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরার পর রাজধানীর গুলশানের ১৯৬ নম্বর বাড়িতে ওঠেন। এ ভবনের মালিকানা প্রসঙ্গে জানা যায়, ১৯৮১ সালের ৩১ মে রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার পর গুলশানে প্রায় দেড় বিঘা জমির ওপর নির্মিত বাড়িটি তাঁর স্ত্রী খালেদা জিয়াকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। তবে তাঁর নামে নামজারি করা ছিল না। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত বছরের ৫ জুন খালেদা জিয়ার নামে বাড়িটি নামজারি করা হয়। পরে বাড়িটি সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা হয়।
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও ওই বাড়িতে থেকেই সরকারি কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা সরকারি কাজে প্রস্তুত থাকলেও তিনি সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন না। এ কারণে নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনকে কেপিআইয়ের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
কেপিআই স্থাপনা কী
সরকারি স্থাপনা বহু রয়েছে, তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও রয়েছে অনেক। এর বাইরে ‘কি পয়েন্ট ইনস্টলেশন (কেপিআই)’ কী, সে প্রশ্নের জবাব পাওয়া যায় কেপিআই নিরাপত্তা নীতিমালায়।
সেখানে বলা হয়েছে, কেপিআই হলো এমন স্থাপনা বা অবকাঠামো, যার নিরাপত্তা রাষ্ট্রের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ যেসব স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশের যুদ্ধ, প্রতিরক্ষা কিংবা অর্থনৈতিক সামর্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, সেগুলোই কেপিআই স্থাপনা।
বঙ্গভবন, সচিবালয়, জাতীয় সংসদ, বিমানবন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো স্থাপনাগুলো কেপিআই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত।
কেপিআই স্থাপনা কে ঠিক করে
কোন স্থাপনা কেপিআই হবে, সে ঘোষণা দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আর তা হয় একটি নীতিমালার ভিত্তিতে। বাংলাদেশে কেপিআইয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১৯৯৭ সালে ইংরেজিতে ‘ইনস্ট্রাকশন ফর সিকিউরিটি অব কেপিআই ইন বাংলাদেশ’ প্রণয়ন করা হয়েছিল। পরে সেটি হালনাগাদ করে বাংলা ভাষায় ‘কেপিআই নিরাপত্তা নীতিমালা-২০১৩’ জারি করা হয়।
এ নীতিমালার অধীন কেপিআই ডিফেন্স কমিটি গঠিত হয়; এ কমিটি নতুন কেপিআই অন্তর্ভুক্ত করা, বাদ দেওয়াসহ স্থাপনাগুলোর মান উন্নয়নের সুপারিশ করে। এ ছাড়া প্রতিটি বিভাগের জন্য একটি এবং মহানগর এলাকাগুলোর জন্য একটি করে কেপিআই জরিপ কমিটি থাকে।
কেপিআই ঘোষণা করলে কী হয়
নাশকতা, সন্ত্রাসী হামলা বা ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড থেকে কোনো স্থাপনাকে রক্ষা করতে সরকার মূলত কেপিআই ঘোষণা করে। কোনো স্থাপনাকে কেপিআই ঘোষণা করা হলে ভবনের বাইরে ও ভেতরে অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়।
সব শ্রেণির কেপিআই নিরাপত্তায় সাধারণ বিষয় সম্পর্কে নীতিমালায় বলা হয়েছে, প্রতিটি কেপিআই স্থাপনায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একজন মনোনীত বা নিয়োগ করা কর্মকর্তা দায়িত্বে থাকবেন। কর্মকর্তারা কেপিআই নিরাপত্তা–সংক্রান্ত সব নির্দেশনা দ্রুত বাস্তবায়ন করবেন।
কেপিআই সুরক্ষায় কী বন্দোবস্তু
নীতিমালা অনুসারে, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান কেপিআইয়ের সাধারণ এলাকা থেকে আলাদা রাখতে হয়। এসব ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে প্রবেশ ও বের হওয়ার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি থাকে। এসব স্থাপনায় চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে স্থানীয় পুলিশ বা বিশেষ শাখার (এসবি) মাধ্যমে ব্যক্তির পরিচয় যাচাই করা হবে। বিশেষ ক্ষেত্রে কেপিআইগুলোয় কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের গতিবিধি ও কর্মকাণ্ডও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, প্রতিটি কেপিআই স্থাপনার নিরাপত্তাবেষ্টনী মজবুত প্রাচীর বা বেড়া দিয়ে তৈরি করতে হবে। রাতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা এবং শ্রেণিভেদে ভবনের ভেতরে–বাইরে আসা–যাওয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য সশস্ত্র প্রহরার ব্যবস্থা রাখতে হবে। কেপিআই এলাকায় কোনো ধরনের অবৈধ স্থাপনা যাতে নির্মিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে নিরাপদে রাখতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষ শ্রেণি ছাড়া অন্য সব শ্রেণির স্থাপনার নিরাপত্তার জন্য বিশেষায়িত পুলিশের ব্যবস্থা রাখতে হয়। পুলিশি ব্যবস্থার যাবতীয় ব্যয়ভার স্থাপনা কর্তৃপক্ষকে বহন করতে হবে।
বিশেষ শ্রেণির কেপিআই কোনগুলো
কেপিআইগুলোর মধ্যে আবার শ্রেণিভেদ রয়েছে। এর একটি হলো বিশেষ শ্রেণি। নীতিমালায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের কার্যালয় ও বাসভবন বিশেষ শ্রেণির কেপিআই হিসেবে বিবেচিত হবে। এ নীতিমালাকে বিশেষ শ্রেণির কেপিআইয়ের নিরাপত্তা নীতিমালা হিসেবে আখ্যায়িত করা হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গুলশানের বাসভবনকে এ ‘বিশেষ শ্রেণির’ কেপিআই ঘোষণা করা হয়েছে।
বিশেষ শ্রেণির কেপিআইগুলোর কার্যক্রম ও সেবা দেশের যুদ্ধ–সামর্থ্য ও জাতীয় গুরুত্বের দিক থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যা ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ও যুদ্ধ–সামর্থ্য বা প্রতিরক্ষা কিংবা জাতীয় অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিশেষ শ্রেণির নিরাপত্তা কেমন
বিশেষ শ্রেণির কেপিআইয়ের সার্বিক নিরাপত্তা চার ভাগে (আঙিনা, কর্মকর্তা ও কর্মচারী, তথ্য ও দলিলপত্র এবং বিবিধ) ভাগ করে নিশ্চিত করা হয়। এসব বিষয় তদারক করতে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) সমন্বয়ে নিরাপত্তা কমিটি গঠিত হবে।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, বিশেষ শ্রেণির কেপিআই স্থাপনার চতুর্দিকের সীমানাপ্রাচীরের উচ্চতা হবে ১২ ফুট এবং তার ওপরে ৩ ফুট ‘ওয়াই’ আকৃতির কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করতে হবে। সীমানাপ্রাচীর–সংলগ্ন প্রতিবন্ধক হিসেবে ৩৩ ইঞ্চি আরসিসি ঢালাই দিতে হবে। নিকটস্থ দূরত্বের মধ্যে থাকা সুউচ্চ ভবন, যেখান থেকে ছবি তোলা যায় বা যেসব স্থান বন্দুক বা আগ্নেয়াস্ত্রের নিশানার আওতায় পড়ে, সেগুলো নজরদারিতে থাকবে।
বাসভবনের আঙিনা ও বাইরের নিরাপত্তার বিষয়ে নীতিমালায় বলা হয়েছে, নিরাপত্তার স্বার্থে স্থাপনার সীমানাপ্রাচীর থেকে ২৫ মিটারের মধ্যে কোনো ভবন বা স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। তবে অনুমতিসাপেক্ষে সর্বোচ্চ একতলা ভবন বা স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে। সীমানাপ্রাচীর থেকে ১৫০ মিটারের মধ্যে দুইতলার বেশি কোনো ভবন নির্মাণ করা যাবে না। সীমানাপ্রাচীরের বাইরে ১৫০ থেকে ৩০০ মিটারের মধ্যে ২৫ ফুটের অধিক উচ্চতাসম্পন্ন ভবন নির্মাণ করতে হলে কেপিআই ডিফেন্স কমিটির (কেপিআইডিসি) মতামত নিতে হবে। তবে বঙ্গভবন, গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের ৫০০ মিটারের মধ্যে ৮.৭৫ মিটারের বেশি উচ্চতাসম্পন্ন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে মতামতের পাশাপাশি বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর ছাড়পত্র নিতে হবে।
সীমানাদেয়ালের ভেতরে ও বাইরে ৫ ফুটের মধ্যে থাকা গাছপালা কেটে পরিষ্কার করাসহ বৈদ্যুতিক লাইট পোস্ট ও টেলিফোন পোস্ট থাকলে তা সরিয়ে নিতে হবে। সীমানাপ্রচীর থেকে ৩০ মিটার বা এর বেশি দূরত্ব থেকে কোনো প্রকার সুড়ঙ্গপথ তৈরি করে যাতে কেউ নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে না পারে, সে জন্য গোয়েন্দা সংস্থার নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকবে।
বিশেষ শ্রেণির কেপিআই ভবনে প্রবেশপথের সংখ্যা কম হতে হবে। জরুরি প্রয়োজনে একাধিক প্রবেশপথ ব্যবহার করা হলে তা সিলগালা করে বন্ধ রাখতে হবে। প্রবেশপথে কাঁটাতারের বেড়া এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যাতে তা ডিঙিয়ে কোনোক্রমেই কেউ ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে।
বিশেষ শ্রেণির কেপিআইয়ের ওপর দিয়ে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বৈদ্যুতিক তার বা কোনো ফ্লাইওভার নির্মাণ করা যাবে না। কেপিআই–সংলগ্ন এলাকায় পার্ক, ভবন, সড়কে পর্যাপ্ত আলো নিশ্চিত করার পাশাপাশি সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারার ব্যবস্থা থাকতে হবে। রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের কার্যালয় ও বাসভবনকে ‘নো ফ্লাইং জোন’ ঘোষণা করা হবে।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গোয়েন্দা নজরদারির জন্য এনএসআই, ডিজিএফআই ও এসবির বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত সদস্যদের সমন্বয়ে একটি ইন্টেলিজেন্স সেল গঠন করতে হবে। এ সেল নিরাপত্তা–সম্পর্কিত তথ্য এসএসএফকে জানাবে।
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের বিষয়ে বলা হয়েছে, নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয়সংখ্যক প্রেসিডেনশিয়াল গার্ড রেজিমেন্ট (পিজিআর) থাকবে। পাশাপাশি বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পুলিশও নিয়োজিত থাকবে।
সীমানাপ্রাচীরের কাছাকাছি ১৫ থেকে ২০ ফুট উচ্চতার প্রহরাচৌকি থাকবে। প্রহরাচৌকিতে বাইনোকুলারসহ সশস্ত্র অবস্থায় নিরাপত্তা প্রহরী নিয়োজিত থাকবে। নিরাপত্তা সদস্যরা দিনে-রাতে টহল দেবেন। সাক্ষাৎপ্রার্থীদের জন্য পাস ইস্যু করা হবে। ফটকে নিরাপত্তাতল্লাশির ব্যবস্থা করা হবে। অনুমতি ছাড়া এ এলাকায় কেউ ছবি বা ভিডিও ধারণ করতে পারবে না।