ইউএসটিআরের লোগো
ইউএসটিআরের লোগো

ইউএসটিআরের ঘোষণা 

আবারও বাড়তি শুল্ক বসাতে চায় যুক্তরাষ্ট্র

জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্য বা কাঁচামাল আমদানি কমাতে ব্যর্থতার কারণে বাংলাদেশসহ ৬০ দেশের পণ্যে শুল্কারোপের উদ্যোগ নিয়েছে দেশটি।

বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের পণ্যে আরও ১০ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্ক আরোপের উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। নতুন এই শুল্ক আরোপের কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্য বা কাঁচামাল আমদানি কমাতে ব্যর্থ হয়েছে এই দেশগুলো। নতুন এই শুল্ক আরোপ হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্য কিনতে বাড়তি শুল্ক গুনতে হবে দেশটির আমদানিকারকদের।

গত মঙ্গলবার মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় বা ইউএসটিআর জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে ৬০টি দেশের পণ্যে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেয়। এ পদক্ষেপ কার্যকর হলে বাংলাদেশ, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), জাপানসহ যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ বাণিজ্য অংশীদারই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যদিও এটি কার্যকর হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে শুনানি করবে ইউএসটিআর। 

জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্য বা কাঁচামাল আমদানি করে না বাংলাদেশ। এমনকি তৈরি পোশাকশিল্পসহ কোনো খাতেই জোরপূর্বক শ্রমের চর্চা নেই।
মাহমুদ হাসান খান, সভাপতি, বিজিএমইএ 

ইউএসটিআরের প্রস্তাব, যেসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের বাণিজ্যে পূর্ণ বা আংশিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হতে পারে। আর যেসব দেশ এ ধরনের কোনো উদ্যোগ নেয়নি, তাদের জন্য শুল্কের হার হতে পারে সাড়ে ১২ শতাংশ। 

কোন দেশকে কত শুল্ক দিতে হবে, সে বিষয় ইউএসটিআরের বিজ্ঞপ্তিতে পরিষ্কার কিছু বলা না হলেও বৈশ্বিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশসহ ১৫টি দেশকে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক দিতে হতে পারে। এ তালিকায় ইইউ ছাড়াও যুক্তরাজ্য, কানাডা, ইকুয়েডর, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান, আর্জেন্টিনা, কম্বোডিয়া, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, মালয়েশিয়া ও তাইওয়ান রয়েছে। বাকি ৪৫টি দেশের ক্ষেত্রে সাড়ে ১২ শতাংশ হারে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি। 

ইউএসটিআর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারার আওতায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তালিকাভুক্ত ৬০টি দেশই জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য বা কাঁচামাল আমদানি নিষিদ্ধ করতে বা সেই নিষেধাজ্ঞা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে মার্কিন শ্রমিকেরা ‘অসম প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের’ সম্মুখীন হয়েছেন বলে সংস্থাটির মূল্যায়ন। সংস্থাটি মনে করছে, এই ব্যর্থতা অযৌক্তিক বা বৈষম্যমূলক। এতে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১ (বি) (১) ধারার আওতায় এসব দেশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব করেছে তারা। 

বাংলাদেশের শুল্ক কত হবে

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পণ্য আমদানির ওপর বিভিন্ন হারে পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। শুরুতে বাংলাদেশের জন্য এই হারটি ছিল ৩৭ শতাংশ। পরে শুল্ক আরোপ তিন মাসের জন্য পিছিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। গত বছরের ৭ জুলাই বাংলাদেশের ওপর আরোপিত শুল্ক ৩৭ থেকে ৩৫ শতাংশে নামানোর ঘোষণা দেন ট্রাম্প। আরও দর-কষাকষির পর ২ আগস্ট এ হার কমে হয় ২০ শতাংশ। গত বছরের ৭ আগস্ট থেকে এই পাল্টা শুল্কহার কার্যকর হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে গড় শুল্ক ১৫ শতাংশ। পাল্টা শুল্ক এই শুল্কের অতিরিক্ত হিসেবে আরোপ হয়। 

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি করেছে গত ৯ ফেব্রুয়ারি। সে চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের ওপর দেশটির পাল্টা শুল্কের হার ১৯ শতাংশ। দুই সপ্তাহ পার না হতেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ওপর যে পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিলেন, তা মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট অবৈধ ঘোষণা করেন। সেই রায়ের কয়েক ঘণ্টার মাথায় সব দেশের পণ্যের ওপর ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। নতুন শুল্ক ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হয়। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আইন অনুযায়ী ১৫০ দিনের জন্য শুল্ক আরোপ করতে পারেন প্রেসিডেন্ট। সেই হিসেবে ওই ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ জুলাইয়ের পর আর বলবৎ থাকবে না। 

দেশের একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্য বা কাঁচামাল আমদানি কমানোর ব্যর্থতার অজুহাতে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র যদি নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক বসায়, তাহলে তা অতিরিক্ত হিসেবে যুক্ত হবে। এর আগে বাণিজ্য আইন অনুযায়ী আরোপ করা ১০ শতাংশ শুল্ক না-ও থাকতে পারে। 

জোরপূর্বক শ্রমসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে ইউএসটিআর আরও জানায়, কিছু নির্দিষ্ট পণ্য প্রস্তাবিত শুল্কের আওতার বাইরে রাখা হবে। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি, বিরল খনিজ ও নির্দিষ্ট কিছু ধাতু, গরুর মাংস, কফি, নির্দিষ্ট ফল ও সবজি, ওষুধ, জৈব রাসায়নিক ও উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ। 

গত ১২ মার্চ বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের বিরুদ্ধে এই তদন্ত শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। ইউএসটিআর জানিয়েছে, তদন্তে তারা দেখতে পেয়েছে, বাংলাদেশ জোরপূর্বক শ্রম দিয়ে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করার ব্যবস্থা গ্রহণ ও তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে। এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে ব্যর্থতা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের ওপর বোঝা সৃষ্টি করে। তবে জোরপূর্বক শ্রমের পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কিত বিষয়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ এআরটি চুক্তির অধীনে কিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। 

ইউএসটিআর জানিয়েছে, জোরপূর্বক শ্রমের তদন্তের শুনানিতে অংশগ্রহণের আবেদন ও সাক্ষ্যের সারসংক্ষেপ সংশ্লিষ্ট দেশকে ২১ জুনের মধ্যে আবেদন জমা দিতে হবে। আর লিখিত মতামত জমা দেওয়ার শেষ সময় হচ্ছে আগামী ৬ জুলাই। 

এ ছাড়া বাংলাদেশ, চীনসহ বিশ্বের ১৬টি বাণিজ্য অংশীদার দেশের অতিরিক্ত শিল্প উৎপাদন সক্ষমতা-সংক্রান্ত আরেকটি বড় তদন্তের ফলাফলও শিগগিরই প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছে ইউএসটিআর। গত ১১ মার্চ এই তদন্ত শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মূলত তৈরি পোশাক ও সিমেন্ট খাতের অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে কি না, সেটি তদন্ত করছে যুক্তরাষ্ট্র। 

জানতে চাইলে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্য বা কাঁচামাল আমদানি করে না বাংলাদেশ। এমনকি তৈরি পোশাকশিল্পসহ কোনো খাতেই জোরপূর্বক শ্রমের চর্চা নেই। আমাদের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে যুক্তরাষ্ট্রের এই তদন্তের শুনানিকে খুবই গুরুত্ব সহকারে নিতে হবে। প্রয়োজনে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে যুক্ত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে পররাষ্ট্রমন্ত্রী কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন বলে আমরা মনে করি।’