বাণিজ্য

অবমূল্যায়ন কতটা জরুরি

গত বছরটা বিশ্ব অর্থনীতিকে তোলপাড় করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার বাণিজ্যযুদ্ধ। বাণিজ্যযুদ্ধের শুরুতে আমদানির ওপর শুল্ক-পাল্টাশুল্ক আরোপের তির ছোড়াছুড়ি করে দুই দেশ। গত বছরের আগস্টে এসে মুদ্রা নিয়েও খেলা শুরু করে চীন। বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনের পোশাক রপ্তানি কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছিল। প্রথমে সে রকম হলেও খুব দ্রুতই মুদ্রার অবমূল্যায়ন করে তা সামলে নেয় চীন। দুর্বল ইউয়ান চীনা রপ্তানিকে আরও বেশি প্রতিযোগিতামূলক করে তোলে। অর্থাৎ চীনা পণ্যগুলো বিদেশি মুদ্রায় কিনতে গেলে দাম কম পড়ে। এতে চীন থেকে আমদানি বাড়ানো শুরু করে অন্য দেশগুলোও। আসলে বিভিন্ন সময়ই ইউয়ানকে ব্যবহার করে বাণিজ্য সক্ষমতা টিকিয়ে রেখেছে চীন। ২০১৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ইউয়ানের অবমূল্যায়ন করা হয়েছে ৩৩ শতাংশ। আর চীনের এই অস্ত্রকে কখনোই ভালোভাবে নেননি ট্রাম্প। বরাবরই বিষয়টি মুদ্রার কারসাজি বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। 

তবে একটা কথা বলাই যায়, সব সময় তাত্ত্বিক দিক আর মূল প্রেক্ষাপট এক হয় না। মুদ্রার অবমূল্যায়ন নেতিবাচক না ইতিবাচক, সেই সিদ্ধান্ত দেশ অনুযায়ী আপেক্ষিক। এককথায় এর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়। আধুনিক মুদ্রানীতি অনুযায়ী ‘অবমূল্যায়ন’ অর্থ একটি সুনির্দিষ্ট বিনিময় হার পদ্ধতিতে দেশের মুদ্রার মূল্য অন্য দেশের মুদ্রার বিপরীতে আনুপাতিক হারে কমানো। অর্থনীতির তত্ত্ব বলে, অবমূল্যায়ন হলে রপ্তানি বাড়ে। আর অতিমূল্যায়ন হলে রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু বাস্তবে কী পরিমাণ এর লাভ-ক্ষতি, তা নিয়ে নানা মতভেদ আছে।

অবমূল্যায়নের লাভ-ক্ষতি

এ বিষয়ে আইএমএফের এক গবেষণায় বলা হয়, একটি দেশের মুদ্রামানের ১০ শতাংশ অবমূল্যায়ন করা হলে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ দশমিক ৫ শতাংশ রপ্তানি বৃদ্ধি পায়। তাত্ত্বিকভাবে স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন হলে রপ্তানিকারক ও প্রবাসীরা লাভবান হন। কারণ, আগের তুলনায় ডলারের বিপরীতে বেশি হারে টাকা পাওয়া যায়। আবার মুদ্রার অবমূল্যায়নের ফলে সামগ্রিক চাহিদা বৃদ্ধি পায়। কারণ রপ্তানি বৃদ্ধি পেলে এবং আমদানি কমলে সামগ্রিক চাহিদা বাড়ে। সাধারণ দৃষ্টিতে সামগ্রিক চাহিদা বৃদ্ধির প্রভাবে প্রকৃতি জিডিপি ও মূল্যস্ফীতি বাড়ে। এ ছাড়া দেশীয় পর্যটনশিল্প লাভবান হয়, সেই সঙ্গে রপ্তানি খাতে কর্মসংস্থান বাড়ে। আমদানির চেয়ে রপ্তানি বেশি হওয়ায় দেশে মুদ্রা ঘাটতির পরিমাণও কমে। 

অন্যদিকে মুদ্রার অবমূল্যায়ন আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। কারণ, আমদানিকারকদের আগের তুলনায় বাড়তি অর্থ দিয়ে ডলার কিনতে হয়। এ ছাড়া কোনো দেশে স্থির মজুরি প্রবৃদ্ধি থাকলে অবমূল্যায়ন হলে প্রকৃতি মজুরি কমে যায়। যাঁরা বিদেশ ভ্রমণে যান তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। দেশের যেসব রপ্তানিকারক পণ্য উৎপাদনের জন্য কাঁচামাল আমদানি করেন, তাঁরাও পড়েন বিপাকে। কারণ কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় পণ্য উৎপাদনের ব্যয় বেড়ে যায়। আবার স্বল্প মেয়াদে মূল্যস্ফীতির একটা আশঙ্কা থাকায় মানুষের প্রকৃত আয় কমে যায়।

বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশে ডলার ও টাকার বিনিময় হার স্বাধীনতার পর থেকে সরকার নির্ধারণ করে দিত। টাকাকে রূপান্তরযোগ্য ঘোষণা করা হয় ১৯৯৪ সালের ২৪ মার্চ। আর ২০০৩ সালে এই বিনিময় হারকে করা হয় ফ্লোটিং বা ভাসমান। এরপর থেকে আর ঘোষণা দিয়ে টাকার অবমূল্যায়ন বা পুনর্মূল্যায়ন করা হয় না। তবে বিনিময় হার ভাসমান হলেও পুরোপুরি তা বাজারভিত্তিক থাকেনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব সময়ই এতে পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ রেখে আসছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংক এ ব্যাপারে অনুসরণ করে আসছে ‘ম্যানেজড ফ্লোটিং রেট’ নীতি। 

১৯৭১ সালে প্রতি ১ ডলার সমান ছিল সাড়ে ৭ থেকে ৮ টাকা। ১৯৭৮ সাল ছাড়া ১৯৭১ থেকে ১৯৮৭ পর্যন্ত টাকা প্রতিবছর মুদ্রাস্ফীতির কারণে মার্কিন ডলারের বিপরীতে মূল্য হারায় টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১ মার্কিন ডলারের (ইউএসডি) বিপরীতে টাকার দর ৮৪ দশমিক ৯১ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে।

অন্য দেশের সঙ্গে অবস্থান

গত বছর বাণিজ্যযুদ্ধের প্রভাব থেকে রক্ষা পেতে অনেক দেশ তাদের মুদ্রার অবমূল্যায়ন শুরু করে। এতে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় রপ্তানি সক্ষমতায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে, এমন আশঙ্কা তৈরি হয় রপ্তানিকারকদের মনে। ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অবমূল্যায়ন হলে রপ্তানি বাণিজ্য থেকে শুরু করে প্রবাসী আয় অনেক বেড়ে যাবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার দর কমেছে ১ দশমিক ১২ শতাংশ।

বাণিজ্য তথ্য

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বরে গত বছরের একই সময়ের চেয়ে রপ্তানির প্রবৃদ্ধির হার ঋণাত্মক, ৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ। তবে চলতি অর্থবছরের বাজেটে পোশাক খাতে ২ হাজার ৮২৫ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে। বিদ্যমান প্রণোদনার ওপর অতিরিক্ত ১ শতাংশ হারে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। এর অর্থ হলো ১ ডলার আয়ে যদি রপ্তানিকারকেরা ৮৪ দশমিক ৯০ টাকা পান, তাহলে ১ শতাংশ প্রণোদনা যোগ করে রপ্তানিকারকের আয় হবে ৮৫ দশমিক ৭৫ টাকা। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) আমদানি ব্যয় কমেছে ৫ দশমিক ২৬ শতাংশ। আমদানি-রপ্তানির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ৬৬৮ কোটি ডলার। 

চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই প্রবাসী আয় বাড়ছে। এই আয় গত বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় সাড়ে ২৫ শতাংশ বেশি। গত ১ জুলাই থেকে সরকার প্রবাসী আয়ে ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা দিচ্ছে। সেই হিসাবে বর্তমান দরে ১ ডলার প্রবাসী আয়ে পাওয়া যাচ্ছে ৮৬ দশমিক ৬০ টাকা।

অবমূল্যায়ন কতটুকু জরুরি

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) নাজনীন আহমেদ বলেন, ‘বর্তমান অর্থনীতিতে ঠেকা দেওয়ার জন্য অবমূল্যায়ন প্রয়োজন। কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতি আমদানিনির্ভর নয়। যেখানে ভিয়েতনামের অর্থনীতি ৯০ শতাংশই আমদানিনির্ভর সেখানে আমাদের অর্থনীতিতে আমদানির অংশ ২৪ শতাংশের মতো। তাই যে কথাটা বলা হয়, অবমূল্যায়ন হলে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাবে, এটা আসলে আমাদের অর্থনীতির জন্য পুরোপুরি যথার্থ নয়। আর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে কর কমিয়ে দিয়েও একটা ভারসাম্য করা সম্ভব। আরেকটি কথা বলা হয়, অবমূল্যায়ন হলে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে ব্যয় বেড়ে যাবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও পাল্টা যুক্তি আছে, আমাদের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কাঁচামালের একটি বড় অংশ স্থানীয়ভাবে নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় শ্রমিকেরা কাজ করছেন। আমাদের আসলে দেখতে হবে বর্তমান পরিস্থিতি। আমরা ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিচ্ছি। অথচ মুদ্রার অবমূল্যায়ন হলে বিদেশি ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার অপশন তৈরি হয়, যা টাকার অঙ্কে বেশি আসবে। ফলে স্থানীয় বেসরকারি খাতে চাপ কম পড়বে।’ নাজনীন আহমেদ আরও বলেন, ‘আমরা তৈরি পোশাক খাতে নগদ প্রণোদনা দিচ্ছি, এতেও আমাদের বিপুল পরিমাণ ব্যয় হবে। অথচ এটি কিছুটা কমিয়ে মুদ্রার অবমূল্যায়ন করলে অর্থনীতি আরও বেশি লাভবান হতো।’

সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ প্রয়োজন বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। কেননা দেশে এখন হুটহাট অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, কিন্তু এ নিয়ে কোনো বিশ্লেষণ হয় না।