নারীমঞ্চ

দৃষ্টিজয়ীদের বাতিঘর...

রাজধানীর গুলশানে নাজিয়া জাবীনের অফিসের টেবিলে অনেক ব্রেইল বই। হাতের আঙুলের স্পর্শে দৃষ্টিজয়ীরা (দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী) তা পড়ছে। মুহম্মদ জাফর ইকবালের দলের নাম ব্ল্যাক ড্রাগন, মফিদুল হকের সে কোন রবীন্দ্রনাথসহ বিভিন্ন বইয়ের পাতায় হাত বুলিয়ে দৃষ্টিজয়ীরা তাদের কল্পনার জগতে পাড়ি জমাচ্ছে। পাঠ্যবইয়ের বাইরে ব্রেইলে গল্প, উপন্যাস, ছড়াসহ বিভিন্ন বই পড়ার সুযোগটি করে দিয়েছেন নাজিয়া জাবীন। এই দৃষ্টিজয়ীদের কাছে তিনি বাতিঘর হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছেন।

নাজিয়া জাবীন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বলতে নারাজ। তাঁর কাছে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা হলেন দৃষ্টিজয়ী। এই দৃষ্টিজয়ীদের চোখে-মুখে খুশির ঝিলিক দেখতেই তিনি গড়ে তুলেছেন স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনা। এই প্রকাশনা বর্তমানের ৬৮টিসহ সামনের বছরেই একুশে বইমেলায় দৃষ্টিজয়ীদের কাছে মোট ৮০টি প্রকাশনা নিয়ে হাজির হবে। আর মেলা শেষে নিবন্ধন করা দৃষ্টিজয়ীরা বইগুলো পাবেন বিনা মূল্যে।

২০০৮ সালে স্পর্শ ফাউন্ডেশনের যাত্রা শুরু। ২০০৯ সালে দেশে প্রথম ব্রেইলে ছড়ার বই প্রকাশ করে স্পর্শ প্রকাশনা। ২০১১ সালে বাংলা একাডেমির একুশের বইমেলায় হাজির হয় স্পর্শের ব্রেইল বই। ২০১৬ সালে স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনার সহযোগিতায় বাংলা একাডেমির প্রথম ব্রেইল বই প্রকাশিত হয় এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বইমেলায় বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন। ২০১৭ সাল থেকে ব্রেইল বইগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে যাচ্ছে। দেশের বাইরেও বাংলাভাষী এবং ইংরেজি ভাষা জানা শিশুদের কাছে পাঠানো হচ্ছে বই। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, ব্যাপ্টিস্ট মিশন ইন্টিগ্রেটেড স্কুলে ব্রেইল বইয়ের আলাদা কর্নার করা হয়েছে।

নাজিয়া জাবীন। ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

নাজিয়া জাবীন শিশুসাহিত্যিক। স্পর্শ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা এবং স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনার প্রধান উদ্যোক্তা নাজিয়া জানালেন, শিশুদের জন্য একটি ছড়ার বই বের করেছিলেন। সে সময় বইটির প্রকাশনা উৎসবে যোগ দেওয়া কয়েকজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বইয়ের মলাট ছুঁয়ে, পৃষ্ঠা গুনে নেড়েচেড়ে রেখে দিতে বাধ্য হয়। অথচ তারাও অন্যদের মতো বইটি পড়তে আকুল ছিল।

এ ঘটনার পাশাপাশি নাজিয়া জাবীনের ব্যক্তিগত জীবনে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনাও দৃষ্টিজয়ীদের জন্য কিছু করতে উৎসাহী করে। ১৯৯০ সালে এক সড়ক দুর্ঘটনায় নাজিয়া জাবীনের স্বামী সৈয়দ ফারহাত আনোয়ার গুরুতর আঘাত পান। প্রায় ১৫ বছর তিনি চোখে তেমন কিছু দেখতে পেতেন না। দেশের বাইরে অস্ত্রোপচারের পর এখন তিনি পুরোপুরি দেখতে পাচ্ছেন। পিএইচডি করেছেন। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই দম্পতির একমাত্র মেয়ে ব্যারিস্টার সিলমা তামানীনা ও স্বামীর সার্বিক সহায়তা এবং পরিবার ও বন্ধুদের সহায়তায় ব্রেইল প্রকাশনা গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে চলছে বলে জানালেন নাজিয়া জাবীন। গত বছর এই প্রকাশনার সঙ্গে যোগ দিয়েছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক। নাজিয়া অনন্যা শীর্ষ ১০ সম্মাননাসহ পেয়েছেন নানান সম্মাননা।

 দৃষ্টিজয়ী নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া তারিকুল ইসলাম ও তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া আনিকা ইবনাত নামিরা বলল, স্পর্শের কারণেই তারা এখন অনেক ধরনের বই পড়তে পারছে। স্পর্শ ছাড়া তাদের কথা আর কেউ ভাবেনি। এই অফিসে বসেই দৃষ্টিজয়ীরা বই প্রকাশের আগে বইয়ের প্রুফ দেখে দেয়।