default-image

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জনজীবন ও কর্মজীবনে অভাবনীয় সংকট দেখা দেয়। ছাপা পত্রিকাও বেশ বিপদে পড়ে। কিন্তু আমরা তো বসে থাকতে পারি না। কিছু উদ্ভাবনী উদ্যোগ গ্রহণ করতে থাকি। স্বাস্থ্যবিধি মেনে সংবাদ সংগ্রহ থেকে শুরু করে প্রেসে ছাপানো ও গ্রাহকের কাছে পত্রিকা পৌঁছানো কম কথা নয়। হোম অফিস চালু হয়ে যায়। পত্রিকাও ছাপা হতে থাকে। কিন্তু গোলটেবিল বৈঠকগুলো কীভাবে করব? এই সমস্যা আমাদের চিন্তায় ফেলে।

আমরা তো শুধু ছাপা পত্রিকা ও অনলাইনের মাধ্যমেই মানুষের কাছে পৌঁছাই না। অন্য অনেক কাজের মাধ্যমে জনসচেতনতা বাড়ানোর কাজও করি। গোলটেবিল বৈঠকগুলো সেখানে একটি বড় ভূমিকা পালন করে। এর প্রধান কাজ হলো দেশের আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সমস্যা এবং উত্তরণের উপায় নিয়ে দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তি, বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের আলোচনার ব্যবস্থা করা। পরে আলোচনার মূল কথাগুলো পত্রিকায় প্রকাশ করি। এর গুরুত্ব অপরিসীম। নারী-শিশু, প্রজনন-স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, কৃষি থেকে শুরু করে জনজীবনের বিভিন্ন সংকট—এই বিষয়গুলো নিয়ে সব সময় গোলটেবিল বৈঠক করে আসছি। বিশেষজ্ঞদের কথা আমরা সরকারের নীতিনির্ধারকসহ সব মহলের কাছে নিয়মিত পৌঁছে দিচ্ছি।

বিজ্ঞাপন

করোনার কারণে এক ঘরে, এক টেবিলে বসে আলোচনার ব্যবস্থা অসম্ভব। স্বাস্থ্যবিধি মেনে আলোচনার ব্যবস্থা করাও কঠিন। কারণ, অনেকেই বিশেষত সমাজে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের বিশিষ্টজনদের অনেকেই বয়স্ক। তাঁদের পক্ষে আমাদের অফিসের সেমিনার কক্ষে এসে আলোচনায় অংশগ্রহণ সম্ভব নয়। তাই আমরা একটি বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুললাম।

এই সময়ে জুম, গুগল মিট, স্ট্রিমইয়ার্ড প্রভৃতি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালু হতে শুরু করেছে। আমরা দ্রুত অনলাইনে ভার্চ্যুয়াল আলোচনা বৈঠকের ব্যবস্থা করলাম। এ জন্য আমাদের ভিডিওতে লাইভ প্রচারের ব্যবস্থা শক্তিশালী করে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ফেললাম।

আমাদের প্রথম কাজ ছিল সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানানো যে জনস্বার্থে আমাদের কাজ অব্যাহত থাকবে। যেসব উন্নয়ন সহযোগী আন্তর্জাতিক সংস্থা, বেসরকারি সংস্থা, সরকারি প্রকল্প সংস্থা সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষের মধ্যে কাজ করে, তাদের নেতৃত্বের কাছে ই-মেইলে চিঠি দিলাম। তাদের জানালাম, আমরা এই করোনাকালে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ভার্চ্যুয়াল গোলটেবিল বৈঠক শুরু করেছি। তাই আহ্বান জানালাম, আসুন, আপনাদের কাজের সাফল্যগাথা আমাদের ভার্চ্যুয়াল আলোচনার মাধ্যমে সবার কাছে নিয়ে যাই।

আমাদের এই উদ্যোগে অভূতপূর্ব সাড়া পেলাম। একের পর এক প্রতিষ্ঠান তাদের প্রস্তাব নিয়ে আসতে শুরু করল। মে-জুন মাসে আমরা এএলআরডি (অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট), পিআরআই (পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট) প্রভৃতি সংস্থা কৃষিতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও নারীর অবদান, সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা প্রদানে ডিজিটাল লেনদেন প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ভার্চ্যুয়াল গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বিষয়গুলোর সঙ্গে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন-মৃত্যুর সমস্যা জড়িত। সমস্যাগুলো কী, চ্যালেঞ্জগুলো কীভাবে সমাধান করা যায় প্রভৃতি এই সময়ের খুব জরুরি বিষয়।

আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু প্রথম আলোয় নিউজ আকারে ও অনলাইনে ছাপা হয়। একই সঙ্গে অনলাইন ইংরেজি সংস্করণেও ছাপা হয়। পরে পুরো এক পৃষ্ঠাজুড়ে সবার আলোচনা আরও বিস্তৃতভাবে ছাপা হয়। প্রথম আলো অনলাইনে বাংলা ও ইংরেজিতেও তা ছাপা হয়। এর ফলে সরকার ও বিদেশি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার নীতিনির্ধারকদের কাছে দ্রুত বার্তা পৌঁছানো সম্ভব হয়।

এই অচিন্তনীয় সুযোগ সৃষ্টির ফলে একের পর এক সংস্থা, বিশেষভাবে জাতিসংঘের আওতায় কাজে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে আসে। আমাদের দেশে দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর প্রজনন-স্বাস্থ্যসেবা, মা ও শিশুর পুষ্টি, সবার জন্য শিক্ষা, কৃষি ও মাছের খামারে সাফল্য এবং একই সঙ্গে সমস্যা ও সমাধানে করণীয় প্রভৃতি বিষয়ে আমাদের ভার্চ্যুয়াল গোলটেবিল বৈঠকে প্রাধান্য পায়।

ইংরেজিতে প্রবাদসম একটি বাক্য আছে, ‘এভরি ক্রাইসিস ইজ অ্যান অপরচুনিটি’। প্রতিটি সংকট নতুন সম্ভাবনা এনে দেয়। করোনা সংকটেও আমরা এর প্রমাণ পেলাম। আজ প্রথম আলোর ভার্চ্যুয়াল গোলটেবিল বৈঠক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আগের চেয়েও বেশি আলোচনার ব্যবস্থা আমরা করতে পারছি। এসব আলোচনায় সমাজের বিভিন্ন স্তরের বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণও সহজতর হয়েছে। এখন আর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে এসে গোলটেবিলে অংশগ্রহণের সেই ঝামেলা নেই। অসহনীয় যানজট সহ্য করা এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট করার ঝামেলা নেই। সময় বাঁচে। এমনকি সুদূর বিলাত-আমেরিকা থেকেও বিশেষজ্ঞরা আলোচনায় যুক্ত হতে পারেন। একই দিনে নিজের শত কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও আলোচনায় যুক্ত হওয়া যায়। শুধু দরকার একটি স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ!

ভার্চ্যুয়াল গোলটেবিল বৈঠকের জন্য প্রথম আলো ভিডিও বিভাগকে শক্তিশালী করেছে। আমরা জানি, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে অনলাইনই গণমাধ্যমে বিপ্লবের সূচনা ঘটাবে। তার প্রস্তুতি আমরা আগে থেকেই নিচ্ছিলাম। এর মধ্যে করোনা সংকট আমাদের অনলাইনে উত্তরণ ত্বরান্বিত করার অভাবনীয় সুযোগ এনে দিল।

প্রথম আলো পিছিয়ে পড়ে থাকে না, বরং নতুন দিনের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পথ দেখায়। ভার্চ্যুয়াল গোলটেবিল বৈঠকের সাফল্য এর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।


আব্দুল কাইয়ুম প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0