প্রথম দিন রাস্তায় নেমেই মনে হলো, পথ ভুলে কোনো এক অচেনা শহরে এসে পড়েছি। এ যেন সেই চেনা কক্সবাজার নয়। মেরিন ড্রাইভ ধরে টেকনাফের দিকে যত যাই, দেখি ভয়ের পরিবেশ।
বিজ্ঞাপন
default-image

১১ আগস্ট ২০২০। ইউএস–বাংলা এয়ারলাইনসের এটিআর ৭২-৬০০ মডেলের উড়োজাহাজটি যখন কক্সবাজার বিমানবন্দরের মসৃণ রানওয়ের মাটি ছুঁয়েছে, তখন ঝুম বৃষ্টি। বড় বড় ছাতা নিয়ে এয়ারলাইনসের কর্মীরা যাত্রীদের গা ভেজা থেকে রক্ষা করলেন ঠিকই, তবে মালপত্র আর বাঁচাতে পারলেন না। ক্যামেরা, ল্যাপটপ, ফোন ভিজলে আর রক্ষা নেই। সব বাঁচিয়ে কোনোমতে হোটেলে উঠলাম। কিন্তু বৃষ্টির দাপাদাপিতে সেদিন আর বেরোনো গেল না। পরদিন সকালে বেরোলাম, তখনো বৃষ্টি। প্রথম আলোর কক্সবাজার প্রতিনিধি আবদুল কুদ্দুস বিজ্ঞ আবহাওয়াবিদের মতো বললেন, দুই দিন থেকে নিম্নচাপ শুরু হয়েছে। সাগর উত্তাল। এ বৃষ্টি সহজে যাবে না।

টেকনাফের শামলাপুর তল্লাশিচৌকিতে ৩১ জুলাই রাতে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান। সে ঘটনা সারা দেশে আলোচিত হচ্ছে। শুরু থেকে প্রথম আলোর কক্সবাজার প্রতিনিধিই সবকিছু সামাল দিচ্ছিলেন। শেষে সিদ্ধান্ত হলো, আমাকেও কক্সবাজারে যেতে হবে। মালপত্র গুছিয়ে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উড়াল দিলাম।

সিনহা হত্যার ঘটনা ততক্ষণে ১০ দিন পেরিয়ে গেছে। ঘটনার প্রায় সবকিছু গণমাধ্যমে এসেও গেছে। টেলিভিশনের একদল সংবাদকর্মী ঢাকা থেকে কক্সবাজারে গিয়ে আস্তানা গেড়েছেন। পান থেকে চুন খসলেই তাঁরা লাইভে এসে জানান দিচ্ছেন। তারপরও নতুন কিছু পেতে হবে, সেই ভাবনায় নোটবুক আর ছোট আকারের লেইকা ক্যামেরাটা নিয়ে পথে নামলাম।

প্রথম দিন কক্সবাজারের রাস্তায় নেমেই মনে হলো, পথ ভুলে কোনো এক অচেনা শহরে এসে পড়েছি। এ যেন সেই চেনা কক্সবাজার নয়। মেরিন ড্রাইভ ধরে টেকনাফের দিকে যত যাই, দেখি ভয়ের পরিবেশ। পথে পথে তল্লাশিচৌকি। পথচলতি মানুষ ও যানবাহন থামিয়ে পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনী তল্লাশি করছে। কোনো কোনো তল্লাশিচৌকিতে নাম-পরিচয়ের পাশাপাশি ফোন নম্বরও দিতে হচ্ছে। কক্সবাজারের পরিস্থিতি যে এত খারাপ, তা এই কদিনে ঢাকায় বসে টের পাইনি।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপারের কার্যালয় শহরের একেবারে কেন্দ্রস্থলে। একদিন সেখানে গিয়ে দেখি, একজন পাহারাদার ছাড়া কেউ নেই। পুলিশ সুপারের দরজায় তালা ঝুলছে। কার্যদিবসে পুলিশ সুপারের অফিসের দরজায় তালা কেন—প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে বোবা হয়ে থাকেন। একটু দূরে কক্সবাজার সদর থানা। সেখানেও একই অবস্থা। থানার ভেজানো দরজা খুলে ঢুকতে গেলেই তেড়ে আসেন এক সিপাই। বলেন, থানার ভেতরে যাওয়া যাবে না। দুই দিন পরে গেলাম টেকনাফ থানায়। দেখি থানার দরজায় তালা দিয়ে নিরাপত্তাকর্মীরা বসে আছেন। আমাদের দেখে একজন এসে তালাটি ভালো করে দেখে গেলেন, সেটা ঠিকমতো লাগানো হয়েছে কি না। জীবনে প্রথম দেখলাম, থানার ফটকেও তালা থাকে।

বিজ্ঞাপন

সিনহা হত্যা তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছে র​্যাব। মনে হলো, তাদের কাছে গেলে কাজ হবে। হয়তো ভালো খবরের রসদ মিলবে। র ্যাব সদস্যরা দল বেঁধে উঠেছেন কক্সবাজার বিচ ঘেঁষে গড়ে তোলা আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের বিশ্রামাগার জলতরঙ্গে। সেখানে গিয়ে দেখি, স্বয়ংক্রিয় বৈদ্যুতিক দরজা বন্ধ করে নিরাপত্তাকর্মীরা বসে আছেন। অনুমতি ছাড়া ঢোকা বারণ। এক কর্মকর্তাকে ফোন দিলাম, তিনি বললেন, বাইরে আছেন, আসতে দেরি হবে।

খবরের সন্ধানে এসে এভাবে বন্ধ দরজায় ঘুরে ঘুরে দিন শেষ করার পর একজন সংবাদকর্মীর মনের অবস্থা কী হতে পারে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এদিকে অফিস থেকে বারবার ফোন আসছে, আজ কী পাঠাচ্ছেন? সংবাদ জোগাড়ের সম্ভাব্য সব কটি সূত্র বন্ধ হওয়ার পর ভরসা থাকে হাতের মোবাইল ফোন। ফোন দিলাম কয়েকজন পরিচিত কর্মকর্তাকে। পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে তাঁদের কাছে সাহায্য চাইলাম, কিন্তু কেউ রাজি হচ্ছেন না। সবাই বলছেন, চারদিকে গোয়েন্দারা জাল বিছিয়েছে। কোনো তথ্য ফাঁস হলেই গলায় রশি পড়বে। তাঁদের বললাম, খবরের সোর্স বা সংবাদ উৎস হচ্ছে একজন পেশাদার সাংবাদিকের প্রধান পুঁজি। আর সংবাদপত্রের স্বাধীনতার মূল উপাদান হচ্ছে, প্রয়োজনে সেই সংবাদসূত্রকে গোপন রাখা। কাজেই, সেই সুযোগের সম্ভাব্য সদ্ব্যবহার করা হবে। এ নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। সব শুনে একজন সহায়তা করতে রাজি হলেন। কিন্তু সমস্যা দেখা গেল অন্যত্র। রাতের মধ্যে বিভিন্ন সংস্থা সেই খবর জেনে গেল ফোনে আড়ি পেতে। পরদিন সেই কর্মকর্তা অজ্ঞাত নম্বর থেকে ফোন করে ভয় জড়ানো কণ্ঠে বললেন, ভাই, এ যাত্রায় মাফ করে দেন। লোকজন পিছু লেগেছে। এভাবে শেষ ভরসাও গেল।

দেশে মাদকবিরোধী অভিযান শুরুর পর পাল্লা দিয়ে শুরু হয়েছিল কথিত বন্দুকযুদ্ধ। সেই যুদ্ধে সারা দেশে ৫৮৬ জন নিহত হন। এর প্রায় অর্ধেকই (২৩০ জন) নিহত হন কক্সবাজারে। কক্সবাজারে এত মানুষের প্রাণহানি হয় যে দিনদুপুরে লাশ পড়ে থাকার মতো বীভৎস ঘটনাও মানুষের চোখ সওয়া হয়ে গিয়েছিল। দৃষ্টিনন্দন মেরিন ড্রাইভ পর্যন্ত পরিণত হয়েছিল আতঙ্কের সড়কে। রাত হলেই সেখানে গুলিবিদ্ধ লাশ পড়ে থাকত। কক্সবাজারের মানুষ এ নিয়ে ভেতরে-ভেতরে চরম ক্ষুব্ধ হলেও বিপদের কথা ভেবে প্রকাশ্যে কেউ কিছু বলতেন না। সিনহা হত্যার পর সয়ে যাওয়া সেই অবস্থার হঠাৎ যেন বিস্ফোরণ হয়। দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভ উগরে পড়ে।

default-image

সিনহা হত্যাকাণ্ড নিয়ে বাহিনীগুলোর ভেতরেও বিরোধ শুরু হয়। একদিকে সেনাবাহিনী ও বিজিবি, অন্যদিকে পুলিশ। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে চলে যায় যে দুই বাহিনীর প্রধানকে কক্সবাজারে এসে গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে হয়।

এই অবস্থা একজন সংবাদকর্মীর জন্য খুবই সংকটের। এ পরিস্থিতিতে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচার করার ক্ষেত্রে বেশ ঝুঁকি থাকে।

র​্যােবর গোয়েন্দা শাখার পরিচালক সারওয়ার বিন কাশেম ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক আশিক বিল্লাহ এলেন কক্সবাজারে। তাঁদের কাছে তদন্তের অগ্রগতি জানতে চাইলে যা বললেন, তা দিয়ে ভেতরের জুতসই দুটি লাইনই পূর্ণ হয় না। একদিন কক্সবাজারে র ্যাব-১৫–এর অধিনায়ক আজিম উদ্দিন সংবাদ সম্মেলন ডেকে বললেন, সিনহা হত্যার তদন্তে তাঁরা ‘চাঞ্চল্যকর’ তথ্য পেয়েছেন। কিন্তু সেই তথ্যটা কী, আর কেনই–বা তা নিয়ে চাঞ্চল্য, সে কথা তিনি আর বললেন না।

সিনহা হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, পরিদর্শক লিয়াকতসহ আসামিদের একদিন আদালতে নেওয়া হলো। ভাবলাম, আদালতে গেলে সুযোগ মিলবে। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখি তিন স্তরের নিরাপত্তা। আসামিদের ধারে–কাছে ঘেঁষার কোনো সুযোগ নেই। কয়েকজন আইনজীবীকে রাজি করানোর চেষ্টা করলাম, তাঁরা সাহস পেলেন না।

এবার বলি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির কথা। সিনহা হত্যার ঘটনা তদন্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান সেই কমিটির প্রধান। একবার এই কমিটি গণশুনানির আয়োজন করে সিনহা যেখানে নিহত হয়েছিলেন, সেই শামলাপুরে। আমাদের প্রস্তুতি ছিল তদন্ত কমিটিতে যাঁরা সাক্ষ্য দিতে আসবেন, তাঁদের ধরে প্রতিবেদন করা। তো যথাসময়ে কমিটির কাজ শুরু হলো। আমরা বসে আছি সাক্ষীরা বের হবেন আর আমরা কথা বলব। কিন্তু সাক্ষী আর বের হন না। সকাল থেকে দুপুর, তারপর বিকেল গড়িয়ে যায়। একপর্যায়ে কমিটির সদস্যরা সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ করে বেরিয়ে আসেন। কিন্তু সাক্ষীরা সঙ্গে নেই। তাঁরা গেলেন কোথায়? জানতে পারলাম, তাঁদের পেছনের দরজা দিয়ে আগেই বের করে দেওয়া হয়েছে। দিন শেষে আমরা ফিরে এলাম বিফল মনোরথে।

স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বলে গেছেন, যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে। সেই মন্ত্রে দীক্ষা নিয়ে শুরু করলাম একলা চলা। প্রথম আলোর কক্সবাজার প্রতিনিধি আবদুল কুদ্দুসকে নিয়ে পরিকল্পনা করলাম, হাল ছেড়ে বসে থাকলে চলবে না। মেজর সিনহা যে যে পথে, যেভাবে পাহাড়ে গেছেন, আমরাও সেই পথ ধরে সেইভাবে যাব। আর বোঝার চেষ্টা করব, সেদিন সিনহার যাত্রা এবং তার পরের অবস্থা কেমন ছিল। যে কথা সেই কাজ। যাত্রা শুরু হলো। পথ ও ঘটনার বর্ণনা দিতে দিতেই প্রতিবেদন দাঁড়িয়ে গেল। ছাপা হওয়ার পর পাঠকও ভালোভাবেই নিলেন। প্রথম অনলাইনে দেখলাম পারদ ওপরের দিকে। ফেসবুক পেজে হাজার হাজার শেয়ার হয়েছে। এরপর আর থামায় কে। শুরু হলো ঘটনার বিভিন্ন পর্যায় ধরে প্রতিবেদন করা।

অপরাধ রিপোর্টিং নিয়ে বিভিন্ন প্রশিক্ষণে শিখেছি, একটি ঘটনাকে কীভাবে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলতে হয়। এরপর অপরাধের উপাদানগুলো সেই ঘটনার ভেতর থেকে টেনে বের করে আনলেই গল্প দাঁড়িয়ে যায়। সেই বুদ্ধিটা কাজে লাগালাম। দেখি কাজ হয়েছে। কক্সবাজার থেকে পাঠানো অনেকগুলো প্রতিবেদন প্রধান শিরোনাম হয়েছে। ফিরে আসার পর অফিসের সহকর্মীদের হাসিমুখ দেখে আরও নিশ্চিত হই, এবারের সফরটা একদম বিফলে যায়নি।

কামরুল হাসান: প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0