default-image

শোবার ঘরের জানালা লাগোয়া একটা জামগাছ। গাছের সবুজ পাতার ফাঁকে দোয়েল ও কাকের ছোটাছুটি। লকডাউনে গৃহবন্দী বা হোম অফিসের সময় বাইরের পৃথিবী বলতে আমার ওই জানালা আর জামগাছটি। তাকিয়ে থাকতাম। দেখতাম সবুজ পাতার ঝোপের আড়ালে কাকের ঘরবসতি। ছানাও আছে এক-দুটি। প্রতিদিন ভোরে কা কা শব্দে ঘুম ভাঙে।

এপ্রিলে হোম অফিস ও কোয়ারেন্টিনের সময় এভাবে দিন পার হতো। ৩ এপ্রিল চট্টগ্রামে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। চারদিকে একটা ভয়, আতঙ্ক। ঢাকায় দু-একজন সহকর্মী আক্রান্ত হওয়ার পর এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের পর চট্টগ্রামে শুরু হয় হোম অফিস। কিন্তু ঘরবন্দী থেকে তো আর সাংবাদিকতা হয় না। রিপোর্ট তৈরির জন্য বাইরে যেতেই হতো।

চট্টগ্রামে করোনায় প্রথম মারা যান একজন বৃদ্ধ, ৯ এপ্রিল। চারদিকে আতঙ্ক আরও জেঁকে বসে। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে আক্রান্তের সংখ্যা। চট্টগ্রামের জেনারেল হাসপাতালকে প্রস্তুত করা হয় করোনা রোগীদের জন্য। খবর সংগ্রহ আর বাজার করার জন্য আমাকে বাইরে বের হতে হতো। এ নিয়ে পরিবারে দুশ্চিন্তার অন্ত ছিল না। ঘরে বৃদ্ধ মা, স্ত্রী ও পুত্র। তাই স্বাস্থ্যবিধি যতটা সম্ভব মেনে চলার চেষ্টা করি শুরু থেকেই।

এর মধ্যেই বিপদ কড়া নাড়ল। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে ৯ বছরের একমাত্র ছেলেটি বাসায় পা পিছলে পায়ের আঙুলে ব্যথা পেল। পা ফুলে যাচ্ছে। চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বার বন্ধ। ব্যথাও বাড়ছে। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক সমিরুল ইসলামের পরামর্শে ছেলেকে নিয়ে গেলাম মেট্রোপলিটন হাসপাতালে। এক্স–রে করে দেখা গেল, একটা আঙুলে ফ্র্যাকচার হয়েছে। চিকিৎসক ব্যান্ডেজ করে ওষুধ দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন।

বিজ্ঞাপন

যাক, দুশ্চিন্তা দূর হলো। বাসায় ফিরে যথারীতি একঘেয়ে দিনকাল পার করছি। প্রতিদিন ল্যাপটপ নিয়ে জামগাছের পাশে বসি। আর সবুজ পাতার দিকে তাকিয়ে থাকি। দেখতে দেখতে জামগাছে মুকুল এসেছে। প্রতিদিন সকালে উঠে দেখি জামের পরিবর্তন। ঠিক যেন রবীন্দ্রনাথের ‘ক্যামেলিয়া’ কবিতার মতো, ‘সন্ধ্যার আগে ফিরে এসে টবে দিই জল/ আর দেখি কুঁড়ি এগোল কত দূর।’ এখানে জল দেওয়ার দরকার হচ্ছে না। প্রকৃতির আপন নিয়মে বেড়ে উঠছে জাম।

এদিকে বাড়ছে করোনা। চারদিকে হাহাকার, চিকিৎসা নেই, বেসরকারি হাসপাতালে রোগী ভর্তি বন্ধ, আইসিইউ নেই। প্রতিদিন মারা যাচ্ছেন দু-চারজন। আইসিইউ না পেয়ে এক নারীর মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হলো অনলাইন ও ছাপা কাগজে। পাশাপাশি জেনারেল হাসপাতালে চার বছর ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকা আইসিইউ শয্যার বিষয়টিও তুলে ধরি।

এর মধ্যে ১৩ মে আবার জেঠাতো ভাই প্রভাসদা মারা গেলেন। করোনায় নয়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গেলাম তাঁকে দেখতে। যথারীতি মাস্ক, গ্লাভস পরে। একই সময় খোঁজ নিলাম হাসপাতালের ফ্লু কর্নারের চিকিৎসা নিয়ে। সেখানে তখন রোগীর ঠেলাঠেলি আর ভিড়। দুদিন পর খবর পেলাম চিকিৎসক বন্ধু সমিরুল ইসলাম পরিবারসহ করোনায় আক্রান্ত। মনটা খারাপ হয়ে গেল। হাসপাতালে ভর্তি করা হলো তাঁকে। প্রতিদিন খোঁজ নিতে থাকলাম।

দেখতে দেখতে ঈদ চলে এল। বাইরে তেমন কোনো প্রভাব নেই। মার্কেট বন্ধ। যারা বের হচ্ছে, তারাও একটা ভয় নিয়ে চলছে। ঈদের দুদিন আগে আমি আবার বের হলাম রিপোর্ট খোঁজার কাজে। জেনারেল হাসপাতালের বাইরে থেকে ঘুরে এলাম। প্রয়োজন সেরে আবার বাসায়।

ঈদের আগের দিন ২৪ মে শরীরের তাপমাত্রা হঠাৎ বাড়তে শুরু করল। ঘাবড়ে গেলাম যথারীতি। চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ খেলাম। কিন্তু মন থেকে ভয় যায় না। জ্বর কমে আবার ওঠে। অন্য কোনো উপসর্গ তেমন নেই। অফিসের সহকর্মীদের ফোন দিয়ে জানালাম। তাঁরা সাহস দিলেন। এবার নিজেকে ঘরের মধ্যে বন্দী করে ফেললাম। এক দিন যায়, দুই দিন যায়। জ্বর আসে, জ্বর যায়। মনের মধ্যে শঙ্কাও দানা বাঁধে। সে যাহোক, মনে সাহস রাখলাম। কাজের মধ্যে ডুব দিয়ে দুশ্চিন্তা ভোলার চেষ্টা করলাম। চট্টগ্রামে ২৬ মে প্রথমবারের মতো সমিরুল ইসলামকে প্লাজমা থেরাপি দেওয়া হয়। ঘরে বসে প্রতিবেদনটি করলাম। আরও দুই করোনাজয়ী চিকিৎসক প্লাজমা দিতে আগ্রহী, সেটাও দিলাম ২৬ মে অনলাইনে।

কিন্তু সময় তো কাটে না। টিভিও অন্য ঘরে। শেষ পর্যন্ত সেই জামগাছটিতে আশ্রয় খোঁজার মতো জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকি। জ্বরের ঘোরে এই কদিনে সেভাবে খেয়াল করতে পারিনি, জাম লালচে হয়ে কালো রং ধারণ করেছে। বেশ হৃষ্টপুষ্ট। জামের লোভে কি না জানি না, অন্য দু-একটি পাখির আনাগোনাও বেড়েছে গাছে। আর তা নিয়ে যত আপত্তি কাকের। গাছে যে তার ছানাসমেত বাসা! সারা দিন জাম, কাক, দোয়েল আর আকাশ দেখি।

শরীরে উপসর্গ বেড়েছে। করোনার ঘরবসতি শুরু হয়েছে ধারণা। ২৯ মে নমুনাও পরীক্ষার জন্য দিয়ে এলাম। তবে মনে সাহস রাখলাম নানাজনের সঙ্গে কথা বলে এবং করোনাজয়ীদের লেখা পড়ে। শওকত হোসেন ভাইয়ের লেখাটি পড়ে প্রেরণা পেলাম। ৩ জুন আশঙ্কা সত্যি করে করোনার সঙ্গে বসবাসের নিশ্চিত প্রমাণ মিলল। জামগাছের সঙ্গে সখ্যটা যেন আরও দীর্ঘ হবে এবার। আরও কমপক্ষে তিন সপ্তাহ এই ঘরের কোণে, জামের পাশে কাটাতে হবে।

ছায়াসঙ্গী জামগাছে ফল কমে এসেছে তত দিনে। ৩০ জুন বন্দিজীবন ছেড়ে বের হয়ে এলাম মুক্ত আকাশে। ঝড় বয়ে যাওয়ার পর ক্ষতচিহ্নের মতো করোনার প্রভাব তখনো শরীরে।

এবার দেখি গাছের সব জাম কালো। আর পাশের বাড়ির একতলার ছাদে প্রতিদিন সকালে জাম পড়ে কালো হয়ে যাচ্ছে। কিছু পাখি খায় আর কিছু ঝরে পড়ে। এর মধ্যে আম্পানের কবলেও পড়েছিল জাম। এক সপ্তাহের মধ্যে স্ত্রী সুমি সরকারেরও করোনা পজিটিভ রিপোর্ট এল। আমার মা, ছেলে, ভাই ও তাঁর স্ত্রীর জন্য দুশ্চিন্তা বাড়ল। একলা ঘরে সময় যেন কাটে না। পরিচিত চিকিৎসকদের কাছ থেকে ফোনে ব্যবস্থাপত্র নিয়ে অনুসরণ করতে লাগলাম দুজনে। চারদিকে তখন কেবল মৃত্যুসংবাদ। ফেসবুক খুললেই কেবল পরিচিত–অপরিচিতের আক্রান্ত হওয়া, নয়তো মৃত্যুর তথ্য। এর মধ্যে চারদিনের জ্বরে ভুগে ২১ জুন মারা যান আমার শাশুড়ি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা চিনু মল্লিক। খবর এল চিকিৎসক বন্ধু অনীক চন্দ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এদিকে সমিরুল আইসিইউতে। অবস্থা ভালো নয়।

এই খবরগুলো নিজের উদ্বেগ বাড়াচ্ছিল। চট্টগ্রাম ছাড়াও ঢাকা অফিস থেকেও নিয়মিত খোঁজ নিচ্ছিলেন সহকর্মীরা। অক্সিজেন যদি দরকার হয় কী করব, সে চিন্তাও মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত অত দূর গড়ায়নি। ১৫ জুন রিপোর্ট পেলাম আমার করোনা নেগেটিভ। স্ত্রী তখনো পজিটিভ। আরও দুই সপ্তাহ ঘরে থাকার পরামর্শ দিলেন চিকিৎসক। ঘরে বসেই ফেসবুকে দেখলাম অনীক চন্দ আইসিইউতে। তাঁর স্ত্রী মনিকা চন্দও আক্রান্ত। মনিকা ফেসবুকে আইসিইউতে অনীকের পাশে বসে একটা যুগল ছবি পোস্ট করলেন। ঘরে বসে সেই ছবি দিয়ে করোনায় আক্রান্ত এই দম্পতিকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন করলাম ২০ জুন, ‘​সবার ভালোবাসায় আমরা এখনো বেঁচে আছি।’

তিন দিন পর ২৪ জুন দুঃখজাগানিয়া খবরটি দিলেন চিকিৎসক নেতা আ ম ম মিনহাজুর রহমান, ‘সমিরুলকে আর বাঁচানো গেল না। সুস্থ হয়ে আবার ইনফেকশনে সব শেষ হয়ে গেল।’ নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলাম না। ঘরে বসে আপনজনটির সেই শোকগাথা লিখলাম পত্রিকার জন্য, ‘তিনি আর ফিরবেন না রোগীর সেবায়’।

ছায়াসঙ্গী জামগাছে ফল কমে এসেছে তত দিনে। ৩০ জুন বন্দিজীবন ছেড়ে বের হয়ে এলাম মুক্ত আকাশে। ঝড় বয়ে যাওয়ার পর ক্ষতচিহ্নের মতো করোনার প্রভাব তখনো শরীরে। এক সপ্তাহ পর ৭ জুলাই বান্দরবানে গুলিতে ছয়জন নিহত হয়। ছুটলাম অশান্ত পাহাড়ে। আবার পুরোদমে কাজে নেমে পড়লাম।


প্রণব বল চট্টগ্রামে কর্মরত প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0