default-image

সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্য ভুটান আমার খুব প্রিয়। কারণ, ভুটানকে বলা হয় ‘অক্সিজেনের দেশ’। কেউ বলে ‘সুখী মানুষের দেশ’। আবার কেউ বলে ‘বজ্র ড্রাগনের দেশ’। কেউ বলে রাজার দেশ, যেখানে অপরাধ প্রায় শূন্যের কোঠায়। এসব জেনেছি আগে বিটিভিতে সার্কভুক্ত দেশগুলোর সিনেমা প্রচারিত হতো, সেই সব সিনেমা দেখে। যে দেশ এতগুলো উপাধিতে ভূষিত, সেই দেশে যাওয়ার ইচ্ছা কার না জাগে। তাই আমাদের এবারের গন্তব্য ভুটান।

এবার আমাদের বড় টিম, ৯ জন। গত বছরের ১২ আগস্ট আমাদের যাত্রা শুরু। আমি সাধারণত মাসের মাঝামাঝি ভ্রমণ করি। ১২ থেকে ২০–এর মধ্য পূর্ণিমা থাকে, যা প্রকৃতিকে আরও রূপবতী করে তোলে।

সার্কভুক্ত দেশ হওয়ায় ভুটানে ভিসার ঝামেলা নেই বললেই চলে। শুধু বিমান টিকিট, জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, এক কপি ছবি আর অফিসের অনুমতিপত্র। এই কাগজগুলো হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশনে দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে পাসপোর্টে সিল মেরে মুচকি হেসে ইমিগ্রেশন অফিসার জানান দিলেন আমরা সুখী মানুষের দেশে যাচ্ছি।

ভুটানের একমাত্র বিমানবন্দর পারো। পারো পৃথিবীর ঝুঁকিপূর্ণ এয়ারপোর্টগুলোর মধ্যে একটা। আমাদের এই উপমহাদেশে দুটি ঝুঁকিপূর্ণ এয়ারপোর্ট আছে, একটা নেপালের লুকলা এয়ারপোর্ট, অন্যটা ভুটানের পারো। পারো ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এখানে শুধু ড্রক এয়ারলাইনসের বিমান ওঠানামা করে। এ এয়ারপোর্ট ব্যবহারের জন্য পাইলটদের বিশেষ প্রশিক্ষণ নিতে হয়।

১২টা ৪০, একদম ইন টাইমে প্লেন ছাড়ল। সুখী মানুষের দেশ বলে কথা। ছোটখাটো প্লেন। সব সিট বুক। কেবিন ক্রুদের আচরণে স্পষ্ট প্রকাশ পেল আমরা সুখী মানুষের দেশে যাচ্ছি। যেহেতু আমরা জানি পারো ঝুঁকিপূর্ণ এয়ারপোর্ট, তাই কিছুটা টেনশনে আছি। এক ঘণ্টার জার্নি। কিছুক্ষণ পর থেকেই জানালা দিয়ে দেখতে পাচ্ছি পাহাড়। সবচেয়ে অদ্ভুত ল্যান্ডিং করার সময়। দুই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে এঁকেবেঁকে নামছে। জানালা দিয়ে মনে হচ্ছে হাত বাড়ালেই পাহাড় ছোঁয়া যাবে। আর প্লেন মনে হচ্ছে দুই পাহাড়ের ফাঁকা অংশের মাপে বানানো। একটু এদিক–ওদিক হলেই পাহাড়ে ধাক্কা লাগবে। অবশেষে ৭ হাজার ৩০০ ফুট উচ্চতার পারো এয়ারপোর্টে নামলাম। অসম্ভব সুন্দর চারপাশ। সবুজ পাহাড়ে মোড়া। ছোট রানওয়ে।

default-image

পারোর রানওয়ের পাশে সরু নদী। পাহাড়ি ঢলে দারুণ শব্দ হচ্ছে। বিমান থেকে নেমে কিছুক্ষণ নির্বাক তাকিয়ে থাকলাম। চারদিকে শুধু দেখছি। ছবি তুলতেও ভুলে গেছি। সবার একই অবস্থা। কিছুক্ষণ পর নিরাপত্তাকর্মীদের আলতো ইশারায় সংবিৎ ফিরে পেলাম। অন অ্যারাইভাল ভিসা হওয়ায় সহজেই ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ করা গেল। ছোট্ট একটা এয়ারপোর্ট। ভাবতে পারেন, ৭ হাজার ৩০০ ফুট উচ্চতায় পাহাড়ের ওপর একটা পোর্ট। বাইরে বের হয়ে দেখি সবকিছু অন্য রকম।

এখানকার ভবনের নকশা একেবারেই আলাদা। ছোট ছোট সব বাড়ি, পাহাড়ের গা ঘেঁষে বানানো। আগে থেকেই ঠিক করে রাখা গাইড একটি ট্যুরিস্ট কোচ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। হাস্যোজ্জ্বল বিনয়ী গাইড আমাদের নিয়ে চললেন পারো শহরে। রাতে আমরা পারোতে থাকব। বার্ড আই নামক একটা উঁচু স্থানে দাঁড়ালাম। এখান থেকে পারো এয়ারপোর্ট নিচে দেখা যায়। অনেকটা ওপর থেকে পাখির চোখের মতো। রানওয়ের পাশ দিয়ে বয়ে চলা নদী, উঁচু সবুজ পাহাড় ভীষণ ভালো লাগল। তাপমাত্রা ২২ ডিগ্রি থাকায় চলাফেরা করাটাও ছিল আরামদায়ক।

৭ হাজার ফুট উচ্চতায় পারো একটা ছোট শহর। খুবই পরিচ্ছন্ন। এখানে লোকজন খুবই কম। ফাঁকা ফাঁকা শহর পেরিয়ে চলে এলাম হোটেলে। হোটেলের সামনেই বিশাল সবুজ পাহাড়, অর্ধেকটাই সাদা মেঘে ঢাকা। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে নদী। রাতে ভীষণ শীত। নদীর পারে বসে গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা দিলাম। পরদিন পারোর সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান টাইগার নেস্ট যাব।

default-image

টাইগার নেস্টে সোনায় মোড়ানো বুদ্ধের মূর্তি

গুগলে ভুটান লিখে সার্চ দিলে এই টাইগার নেস্টের ছবি প্রথমে আসে। টাইগার নেস্ট যেতে একটু সকাল সকাল রওনা দিলাম। ১০ হাজার ২০০ ফুট উচ্চতায় আমাদের উঠতে হবে হেঁটে। অনেকেই কিছুদূর পর্যন্ত ঘোড়ায় চড়ে গেলেও আমরা হেঁটেই রওনা দিলাম। ৪ ঘণ্টার ট্র্যাক। নিচ থেকে বাঁশের লাঠি কিনে ওপরে উঠছি। শুরুতে সবার মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য থাকলেও কিছুদূর যাওয়ার পর কমতে থাকল। পথে প্রচুর পর্যটকের দেখা মিলল। যখন দেখা গেল ইউরোপ-আমেরিকা থেকে আসা নারী পর্যটকেরাও হাঁটছেন, তখন আবারও দলে প্রাণ ফিরে এল। অর্ধেক পথ ওঠার পরে আবারও ক্লান্ত। ইতিমধ্যে মূল যে মনস্টার, সেটা আবছা দেখা যাচ্ছে। কখনো মেঘে ঢেকে যাচ্ছে আবার পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। ক্লান্ত শরীরে আবারও কিছুটা চাঞ্চল্য এল। কিছুদূর যাওয়ার পর দলের অর্ধেক বসে পড়ল। একটা চায়ের দোকানে বসিয়ে রেখে আমরা পাঁচজন যাত্রা শুরু করলাম। পথে চা, কলা, পেঁপে চলছে। এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সেই মনেস্ট্রি। কিছুদূর যাওয়ার পর আরও দুজন বসে পড়ল। একটা ঝরনার পাশে বসিয়ে রেখে আমরা তিনজন অবশেষে উঠলাম টাইগার নেস্টে। সুন্দর সোনায় মোড়ানো গৌতম বুদ্ধের মূর্তি। বেশ কিছু ভিক্ষু ধর্মীয় বই পাঠ করছেন। কেউ ধ্যান করছেন। কেউ ছন্দ করে জোরে ঢোল বাজাচ্ছেন। মন্দিরটা একেবারে পাহাড়ের কিনারায়। মনে হচ্ছে যেকোনো সময় পড়ে যাবে।

টাইগার নেস্টে ক্যামেরাসহ সব ইলেকট্রিক ডিভাইস নিয়ে প্রবেশ নিষেধ। বাইরের লকারে জুতাসহ সবকিছু রেখে ভেতরে ঢুকতেই মূল পুরোহিত বিনয়ের সঙ্গে স্বাগত জানালেন ইংরেজিতে। হাতের তালুতে কয়েক ফোঁটা মধুর মতো দেখতে জল দিয়ে ইংরেজিতে বললেন, যদি তুমি গৌতম বুদ্ধের অনুসারী হও, তবে এই জল পান করো, আর না হলে এই জল মাথায় মেখে নেও। আমরা জল মাথায় নিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখলাম। এখানে ১০০ জন ভিক্ষু থাকেন। ধর্মচর্চার জন্য এখানে যাঁরা থাকেন, তাঁরা কখনোই বিয়ে, সংসার করবেন না। সারাক্ষণ ধ্যানে মগ্ন। অবশেষে নামতে শুরু করলাম। যাকে যেখানে রেখেছিলাম, তাকে সেখান থেকে নিয়ে চলে এলাম পাদদেশে।

default-image

পারো ভুটানের পর্যটন নগরী। এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মনোমুগ্ধকর। পরের দিন সকালে রওনা দিলাম পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট রাজধানী শহর থিম্পুর উদ্দেশে। তিন ঘণ্টার পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা। আপেল বাগান, নদী পেরিয়ে চলে এলাম থিম্পু। এ এক অন্য রকম রাজধানী। কোলাহল নেই, যানজট নেই, লোকজন খুবই কম। রাস্তায় হর্নের শব্দ নেই। উঁচু কোনো ভবন নেই। কোনো সিগন্যাল বাতিও চোখে পড়েনি। পুলিশ কিংবা সেনাবাহিনী কারও হাতে কোনো অস্ত্র দেখিনি। রাস্তায় গাড়ি থাকলেও কেউ হর্ন বাজায় না। একটা গাড়িকে টপকে আরেকটা গাড়ি এগিয়ে যাওয়ার চিন্তাও তাদের নেই। আরও মজার ব্যাপার হলো সেখানে রাস্তা পারাপারের জন্য জেব্রা ক্রসিংয়ের গুরুত্ব অনন্য। চমৎকার আবহাওয়া। হোটেলে চেক ইন করে হাঁটতে বের হলাম।

ভুটানে শিক্ষার হার ৯৯%। প্রায় সবাই ইংরেজি বলতে পারেন। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করলে এমন বিনয়ের সঙ্গে উওর দেয়, মনটা ভরে যায়। ভুটানে মাত্র সাড়ে সাত লাখ লোকের বসবাস। মনে হচ্ছে সবাই সবাইকে চেনে। ভুটানে খাওয়া একটু কষ্টের আমাদের কাছে এবং ব্যয়বহুল। হেঁটে হেঁটে শহর দেখলাম। পরের দিন থিম্পু থেকে পুনাখা। তবে পুনাখা যেতে হলে অনুমতি নিতে হয়। থিম্পুর ইমিগ্রেশন অফিস থেকে আগের দিন আমরা পাসপোর্টের ফটোকপি, ছবি দিয়ে পারমিট করিয়ে রাখি।

পুনাখা ভুটানের শীতকালীন রাজধানী। শীতকালে থিম্পুতে স্নোফল হয়। তখন পুনাখা থেকে সরকারি কাজকর্ম পরিচালিত হয়। রাষ্ট্রীয় ভবন, রাজার বাড়ি ঘুরে চলে গেলাম সাসপেনশন ব্রিজ দেখতে। ফো চু নদীর ওপর নির্মিত ভুটানের দীর্ঘতম ঝুলন্ত ব্রিজ। যেটি লম্বায় ৩৫০ মিটার। ব্রিজটি লোহা দিয়ে মজবুত করে তৈরি করা। বিশাল একটা ব্রিজ এপার থেকে ওপার দেখা যায় না, মাঝখানে নদী। একটু জোরে হাঁটলেই দোল খায়। পুনাখা ঘুরে ফিরে এলাম থিম্পু।

পরের দিন ভুটানের উঁচু মনেস্ট্রি দেখতে গেলাম দোচালা (কেউ কেউ দোচুলা বলেন) পাস। উঁচু পাহাড়ি রাস্তা। দুই ঘণ্টা পর পৌঁছালাম। দারুণ সুন্দর। দোচালা পাস ভুটানের সব থেকে সুন্দর পাস। ভুটানের অন্যতম একটি দর্শনীয় ও পবিত্র স্থান দোচালা পাস। পাহাড়ের চূড়ায় এ জায়গা একেবারেই ছবির মতো সাজানো, এটি রাজধানী থিম্পু থেকে পুনাখা যাওয়ার পথে পড়ে।

default-image

পাহাড়ি এলাকায় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার সময় দুই স্থানের মাঝখানের সব থেকে উঁচু জায়গাকে পাস বলে। ভুটানের রাজধানী থিম্পু থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে পুনাখার পথে দোচালা পাসের অবস্থান। দোচালা পাসের উচ্চতা প্রায় ১০ হাজার ৫০০ ফুট৷ গাড়ি থেকে নামার কিছুক্ষণের মধ্যেই মেঘে ঢেকে যায়। এটি প্রায় সাদা মেঘে ঢাকা থাকে। এই চূড়ায় রয়েছে একটি স্মৃতিস্তম্ভ, মন্দির। এখান থেকে কাঞ্চনজংঘা দেখা যায়। পরের দিন থিম্পুর আশপাশে দেখার পালা। শুরু করলাম বৌদ্ধ পয়েন্ট দিয়ে। বুদ্ধ পয়েন্ট দেখে সবাই বিস্মিত হতে বাধ্য। কারণ, এই মূর্তির বিশালতা ও সামনের বিস্তৃত জায়গা মনটাকে বিশাল করে দেয়। কারণ, মূর্তিটি ১৭৭ ফুট উঁচু। এখানে রয়েছে একই ধরনের ১৭টি মূর্তি, যা ব্রোঞ্জ দিয়ে তৈরি। থিম্পু শহরের প্রায় সব প্রান্ত থেকেই মূর্তিটি চোখে পড়ে। স্থানীয়দের মতে গৌতম বুদ্ধ সর্বদা তাদের ওপর থেকে দেখছে। এটি মহামতি বুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূর্তি। রাজা জিগমে সিঙ্গে ওয়াংচুকের ৬০তম জন্মবার্ষিকী উদ্‌যাপন উপলক্ষে ভুটানের রাজধানী থিম্পুর পাহাড়ে এই বিশালকায় মূর্তিটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপর ন্যাশনাল পার্ক চিড়িয়াখানা দেখে দিন শেষ করলাম রাজার দেশ ভ্রমণ।

এখানে সবাই রাজাকে ভীষণ শ্রদ্ধা করেন। সব জায়গায় রাজার ছবি টানানো। আর পরিচ্ছন্নতা, সবার বিনয়ী আচরণ ভীষণ মুগ্ধ করেছে। এখানকার মানুষের উচ্চাভিলাষী ভাব নেই। রাস্তায় দামি গাড়ি নেই। বাহারি পোশাক পরে না। জাতীয় পোশাক gho পরে সবাই। অল্পতেই সন্তুষ্ট। অপরাধ শূন্যের কোঠায়।

*বেসরকারি চাকরিজীবী ও পর্যটক। maruf_sw@yahoo.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0