গবেষকেরা দেখেছেন, সেবা পাওয়া মায়েদের জীবনমানেরও পরিবর্তন ঘটে। ঘরে ও ঘরের বাইরে অটিস্টিক শিশুদের নিয়ে বা শিশুদের কারণে কিছু সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় তাঁদের। পরামর্শ সেবা পাওয়ার পর সেসব সমস্যা কম পোহাতে হয়েছে।
ঢাকা শহরের অটিস্টিক শিশুদের দুটি বিশেষায়িত স্কুলকে গবেষকেরা বেছে নেন। স্কুলগুলোয় শিশুর সংখ্যা ৩১০। এসব শিশুর ১৮৮ জন মা ভিন্ন মাত্রার বিষণ্নতায় ভুগছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৮১ জন মা মানসিক পরামর্শ সেবা নিয়েছিলেন।

গবেষণাটি হয়েছিল ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে। গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়েছে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে স্কুলভিত্তিক এ ধরনের গবেষণা এটাই প্রথম।

দুটি স্কুলে ২৪ সপ্তাহে মোট ৩১৮টি পরামর্শ সভার আয়োজন করা হয়েছিল। এ জন্য স্কুলে নির্দিষ্ট স্থান ছিল। পরামর্শে যুক্ত ছিলেন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পরামর্শকেরা। এ ছাড়া পরামর্শক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা ১৪টি কর্মশালার আয়োজন করেন। ১৬ জন মাকে চিকিৎসা দেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা।

প্রধান গবেষক আলিয়া নাহিদ প্রথম আলোকে বলেন, মানসিক পরামর্শ সেবা দেওয়ার জন্য মান নির্দেশিকা (স্ট্যান্ডার্ড প্রটোকল) ব্যবহার করা হয়। বিশেষজ্ঞরা তা তৈরি করেন। এই গবেষণার আগে এ ধরনের নির্দেশিকা দেশে ব্যবহৃত হয়নি। দ্বিতীয়ত, ব্যয় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, একটি পরামর্শ সভার জন্য মাথাপিছু খরচ পড়ে এক মার্কিন ডলার। সমস্যার তুলনায় এই খরচ খুবই কম।

মানসিক পরামর্শ সেবা নিয়ে জীবনমানের উন্নতি হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন ৮৮ শতাংশ মা, আত্মবিশ্বাস বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ৮১ শতাংশ, নিজে যত্নের উন্নতির কথা বলেছেন ৭৯ শতাংশ ও দৈনন্দিন কাজে আগ্রহ বাড়ার কথা বলেছেন ৭৭ শতাংশ। আর ৮৭ শতাংশ মা বলেছেন, তাঁরা শিশুদের আগের চেয়ে বেশি যত্ন নিতে পারছেন। এর অর্থ, অটিস্টিক শিশুদের নিয়ে যেসব নেতিবাচক চিন্তা বা দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, তা দূর হতে সহায়তা করেছে এই সেবা।

একজন অটিস্টিক সন্তানের মা প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিষণ্নতা দূর করা বা কমিয়ে আনা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তবে বিষণ্নতায় মা বা বাবার একমাত্র সমস্যা নয়। আমার মৃত্যুর পর আমার সন্তানের কী হবে, সেই চিন্তা আমাকে তাড়া করে। আমার এই দুশ্চিন্তা দূর করতে সমাজকে উদ্যোগী হতে হবে।’ এই মা গবেষণাটিতে যুক্ত ছিলেন না। অটিস্টিক শিশুদের নিয়ে কাজ করে, এমন একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা তিনি।
বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজার শিশুর মধ্যে ১৫টি শিশু অটিস্টিক। গ্রামের চেয়ে শহরে এই সমস্যা বেশি। সারা বিশ্বে একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, অটিস্টিক শিশুদের মা–বাবার জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বাড়িতে অটিস্টিক শিশুর সেবা নেওয়ার ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ে। গবেষণায় এ-ও দেখা গেছে, মনস্তাত্ত্বিক পরামর্শ সেবা মা–বাবার মানসিক অবস্থার উন্নতি ঘটায়। বর্তমানে বাংলাদেশে অটিস্টিক শিশুদের মায়েদের মানসিক পরামর্শ সেবার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেই।

উপসংহারে গবেষকেরা বলেছেন, বাংলাদেশের নগরগুলোতে অটিস্টিক শিশুদের মায়েদের মানসিক পরামর্শ সেবা বাস্তবায়নযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য। এই সেবার ফলে বিষণ্নতার তীব্রতার মাত্রা কমে ও সার্বিকভাবে মায়েদের জীবনমান বাড়ে। ব্যয় সাশ্রয়ী ও ওষুধবিহীন এই সেবা নিয়ে বড় পরিসরে গবেষণা হওয়া প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন গবেষকেরা।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন