বিজ্ঞাপন

সাংবাদিকদের পাশাপাশি দেশি–বিদেশি বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন গতকালও বিবৃতি দিয়ে রোজিনা ইসলামের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে, তার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) গতকাল বলেছে, পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার বন্ধ করাও উচিত কর্তৃপক্ষের। সমালোচকদের আটক না করে মহামারি মোকাবিলায় স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী করতে সরকারের মূল কৌশল হওয়া উচিত মুক্ত গণমাধ্যমকে উৎসাহিত করা।

আর সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসও (আরএসএফ) এক বিবৃতিতে রোজিনা ইসলামকে অবিলম্বে মুক্তি দিয়ে বাংলাদেশের সরকারকে বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানিয়েছে।

এর আগে জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করে রোজিনা ইসলামকে মুক্তি দিতে বলেছে। উল্লেখ্য, পেশাগত দায়িত্ব পালনে গত সোমবার সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যাওয়ার পর সেখানে একটি কক্ষে প্রায় ছয় ঘণ্টা আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয় রোজিনাকে। একপর্যায়ে অসুস্থ হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেও তাঁর তাৎক্ষণিক চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়নি। সেদিন রাত সাড়ে আটটার পর তাঁকে নেওয়া হয় শাহবাগ থানায়। সেখানে প্রায় ১১ ঘণ্টা পুলিশি হেফাজতে ছিলেন তিনি। এর মধ্যেই থানায় তাঁর বিরুদ্ধে অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে মামলা দেওয়া হয়। মঙ্গলবার সকালে তাঁকে আদালতে হাজির করা হয়। সেখানে হাজতখানায় ছিলেন প্রায় তিন ঘণ্টা। আদালতে শুনানি শেষে প্রিজন ভ্যানে করে তাঁকে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে নেওয়া পর্যন্ত প্রায় ২৩ ঘণ্টা সময় লাগে। গতকাল তাঁর জামিনের বিষয়ে শুনানি হয়। আদালত রোববার এ বিষয়ে আদেশের দিন ধার্য রেখেছেন।

সাংবাদিকতায় ক্রান্তিকাল চলছে

রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে গতকাল ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে রোজিনাকে নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়ার দাবি জানান সাংবাদিক নেতারা।

সমাবেশে প্রধানমন্ত্রীর সাবেক তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, রোজিনা ইসলাম সত্য প্রকাশ, অবাধ তথ্য ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতীক। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা ও মুক্ত গণমাধ্যমের প্রতীকও তিনি। রোজিনা যে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন, সেটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নয়, জনগণের তথ্য। তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অবাধ তথ্য পাওয়ার অধিকার আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, ভালো সাংবাদিক শুধু শুভাকাঙ্ক্ষী, বন্ধু তৈরি করে না, শত্রুও তৈরি করে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে রোজিনার সেই শত্রু তৈরি হয়েছে। যারা মিলিয়ন মিলিয়ন টাকা ঘুষ খায়, পাচার করে সেই চক্র রোজিনার বিরুদ্ধে।

দেশের সাংবাদিকতায় একটা ক্রান্তিকাল চলছে বলে সমাবেশে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) একাংশের সভাপতি মোল্লা জালাল।

জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘যদি তাঁদের (স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়) দৃষ্টিতে অন্যায় হয়েও থাকে, তাহলে তাঁরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারতেন। সাংবাদিক নেতাদের ডাকতে পারতেন, প্রেস কাউন্সিলকে বলতে পারতেন। একটা সুরাহা করতে পারতেন। তা না করে কেন ছয় ঘণ্টা নির্যাতন করা হলো? নির্যাতনের ঘটনায় জড়িত কর্মকর্তাদের বিচারের দাবি জানান তিনি।

সভাপতির বক্তব্যে ডিইউজের সভাপতি কুদ্দুস আফ্রাদ বলেন, রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এবং মামলায় যা লেখা হয়েছে, দুয়ের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই।

ডিইউজের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ আলম খান বলেন, সবচেয়ে বড় কষ্ট, উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার বিষয় হলো, তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের নিপীড়নের শিকার হতে হচ্ছে। এসব নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।

সমাবেশে বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক সমিতি, বাংলাদেশ অনলাইন সাংবাদিক পরিষদ, বাংলাদেশ জার্নালিস্ট ফোরাম, বাংলাদেশ আন্তধর্মীয় লেখক ও সাংবাদিক সমিতি, ঢাকা জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন, টেলিভিশন ক্যামেরা জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ সাংবাদিক জোট, ঢাকা বিভাগ সাংবাদিক ফোরাম, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম, লালমনিরহাট সাংবাদিক ফোরাম, শরীয়তপুর সাংবাদিক সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যরা অংশ নেন।

এ ছাড়া রোজিনা ইসলামের মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে প্রেসক্লাবের সামনে গতকাল বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে ঢাকা মহানগর জাতীয় পার্টি, বাম গণতান্ত্রিক জোট, জাতীয় নারী জোট, জাতীয় শ্রমিক জোট, জাতীয় যুব জোট। এসব সমাবেশ থেকে বক্তারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতিগ্রস্তদের বিচার, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের দাবি জানান।

ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের আহ্বান

রোজিনাকে নির্যাতন ও গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে পৃথক কর্মসূচি পালন না করে সব সাংবাদিক সংগঠন মিলে মোর্চা তৈরি করে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। ডিআরইউ প্রাঙ্গণে আয়োজিত এই সমাবেশে সংগঠনের নেতারা বলেন, আগামীকাল শনিবার সব সাংবাদিক সংগঠনের নেতাদের একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন নিয়ে আলোচনা হবে। তাঁরা বলেন, রোজিনার মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন থামবে না।

ডিআরইউর সভাপতি মোরসালিন নোমানী জানান, আজ শুক্রবার সকাল ১০টায় ডিআরইউ প্রাঙ্গণে মুখে কালো কাপড় বেঁধে প্রতিবাদ সমাবেশ করা হবে।

রোজিনা ন্যায়বিচার পাবেন কি না, তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন জাতীয় প্রেসক্লাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাইনুল আলম।

ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সভাপতি কুদ্দুস আফ্রাদ বলেন, রাষ্ট্রীয় গোপনীয় তথ্য যদি টেবিলে পড়ে থাকে, তাহলে স্বাস্থ্যসচিবের নামে মামলা হবে সবার আগে।

ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের আরেক অংশের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে সাংবাদিকদের এই আন্দোলন নজিরবিহীন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন হেলথ রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তৌফিক মারুফ। তিনি বলেন, অনেক কষ্ট করে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়। রোজিনার ঘটনায় স্বাস্থ্যসচিবসহ জড়িত সবাইকে অপসারণ করতে হবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে জবাবদিহি করতে হবে।

দুপুর থেকে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত চলে এই সমাবেশ। এতে সাংবাদিক নেতারা বলেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।

রিপোর্টার্স অ্যাগেইনস্ট করাপশনের সাধারণ সম্পাদক আহমেদ ফয়েজ বলেন, সরকার জেনেবুঝেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করেছে, অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের ব্যবহার করছে।

সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন ডিআরইউর সাধারণ সম্পাদক মসিউর রহমান খান, সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম, সাবেক সাধারণ সম্পাদক কবির আহমেদ খান ও রিয়াজ চৌধুরী, ডিক্যাবের সভাপতি পান্থ রহমান, কারা নির্যাতিত সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল প্রমুখ।

শিক্ষা উপমন্ত্রীকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা

এদিকে রোজিনা ইসলামকে হেনস্তার আংশিক ভিডিও প্রকাশ করে ফেসবুকে অবমাননাকর বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে ডিআরইউ। সংগঠনটি বলেছে, বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটি থাকা অবস্থায় তিনি ডিআরইউতে প্রবেশ করতে পারবেন না। এই ঘোষণা দেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মসিউর রহমান খান।

প্রতিবাদ ও নিন্দা

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের সংগঠন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন গতকাল এক বিবৃতিতে বলেছে, রোজিনার সঙ্গে হওয়া ঘটনা ব্যক্তির অনিয়মের গোপন তথ্য রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য বলে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা হয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি রাখে। পৃথক বিবৃতিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি রোজিনাকে হয়রানির ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে।

ফোরাম ফর ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন, বাংলাদেশ (এফএক্সবি/মুক্তপ্রকাশ) এক বিবৃতিতে রোজিনার নিঃশর্ত মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। বিবৃতিতে সই করেছেন পেন ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের সেক্রেটারি জেনারেল সৈয়দা আইরিন জামান, আর্টিকেল নাইনটিনের সাউথ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক ফারুখ ফয়সল প্রমুখ।

এ ঘটনার প্রতিবাদে ভার্চ্যুয়াল মানববন্ধন করেছে বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম। জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান গতকাল তাঁর জন্মদিনে কেক না কেটে কলম ভেঙে রোজিনাকে হেনস্তা ও গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ জানান।

এ ছাড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচ, বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার, বাংলাদেশ ইউনেসকো ক্লাব অ্যাসোসিয়েশন, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন সংগঠন।

উইমেন এন্ট্রাপ্রেনিউর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি নাসরিন ফাতেমা আউয়াল এক বিবৃতিতে বলেন, প্রশাসন, সাংবাদিকতাসহ সব ক্ষেত্রে নারীরা যখন অগ্রসর হচ্ছেন, তখন এই ঘটনা নারী উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করবে।

পথনাটকে রোজিনার মুক্তি দাবি

পথনাটক ও নাট্যযাত্রা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে রোজিনা ইসলামকে নির্যাতনের প্রতিবাদ ও মুক্তি দাবি করেছে নাটকের দল প্রাচ্যনাট৷ গতকাল বিকেলে সচিবালয় এলাকা থেকে ‘ফ্রি রোজিনা’ শিরোনামে নাট্যযাত্রা শুরু করেন প্রাচ্যনাটের সদস্যরা৷ পরে শাহবাগে পথনাটকের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শেষ হয়।

প্রাচ্যনাটের মুখ্য সম্পাদক কাজী তৌফিকুল ইসলাম বলেন, যে সচিবালয়ে রোজিনা ইসলামকে হেনস্তা-নির্যাতন করা হয়েছে, সেখান থেকে হেঁটে তাঁরা শাহবাগ পর্যন্ত প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছেন তাঁরা।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন