default-image

‘ছিনতাইকারী হওনের বড় ভেজাল কি জানোস লিটন?’
‘পুলিশ ধরে।’
‘উহু। মশায় ধরে।’ কথাটা বলেই দুহাত দিয়ে মশা মারার ব্যর্থ চেষ্টা করল নান্নু। অন্ধকার এক গলিতে ঘাপটি মেরে আছে সে। সঙ্গে তার বন্ধু লিটন। দুজনই পেশাদার ছিনতাইকারী। এ খাতে তেমন সফল না হলেও গলিতে পজিশন নিয়েছে তারা। কেউ এলেই হামলা করতে প্রস্তুত দুজনে। যদিও মশার যন্ত্রণায় তাদের মনঃসংযোগ ব্যাহত হচ্ছে।
‘কথা ঠিক।’ মশা তাড়াতে তাড়াতে বলল লিটন, ‘পুলিশরে তাও তাড়ানো যায়, কিন্তু মশা তাড়ানো যায় না। চল, যাইগা। আজকে ফর্ম খারাপ।’
‘খাড়া। এত বিজি হইস না। ধৈর্য ধর।’
‘ধৈর্য ধরুম কী দিয়া? এক হাতে ক্ষুর ধরছি। আরেক হাতে...’
‘চোপ! একটা আইতাছে।’
আবছা আলোয় এক যুবককে দেখে নড়েচড়ে বসল ওরা। নাগালের মধ্যে আসতেই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে তার পথরোধ করল নান্নু আর লিটন। ভয়ে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া যুবকের গলায় ক্ষুর ধরে লিটন বলল, ‘চায়নিজ ক্ষুর। খুব ধার।’ বুঝতে দেরি হলো না যুবকের। মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ দ্রুত বের করে বিশালদেহী নান্নুর হাতে দিল সে। ‘বাহ্, মানিব্যাগের সাইজ তো তোর মতো রে নান্নু!’ শিস দিয়ে বলল লিটন। ‘কিন্তু ট্যাকা তো নাই। ষাইট ট্যাকার মতো আছে, বাকি সব ভিজিটিং কার্ড। ফোনটাও চায়নিজ। ডিসপ্লে ভালো না।’ মানিব্যাগ-মোবাইল ফোন ঘেঁটে হতাশ হলো নান্নু।
‘কী কস!’ লিটনের কণ্ঠে বিস্ময়, ‘হুদাই মশার কামড় খাইলাম। দুইটা ঘুষা দিয়া ছাইড়া দে এইটারে।’
‘এর যে খোমা, ঘুষি মারার জায়গাই তো নাই!’ যুবককে কষে একটা ঘুষি দিতে গিয়েও শেষ মুহূর্তে মত পাল্টাল নান্নু, ‘ছাইড়া দিলাম আজকে।’
ওরা এগোতেই ‘ভাইয়া’ বলে ডাক দিল যুবক। ‘কী?’ ঘুরে দাঁড়াল নান্নু।
‘মোজার ভেতরে ১০ হাজার টাকা আছে। নিয়ে যান প্লিজ।’ এ কথা শুনে বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেল ওরা। পাঁচ বছরের ছিনতাই ক্যারিয়ারে তারা এমন কথা শোনেনি। ‘আপনে কে ভাই?’ যুবকের কাছে গিয়ে বলল লিটন, ‘নিজ থেকে ট্যাকা দিতেছেন, বিষয়টা কী?’
‘আমি সবুজ। কী বলব ভাই! এক মেয়ের সঙ্গে তিন বছর প্রেম করেছি। আজ তার বিয়ে। সবাই আমাকে ফিরিয়ে দেয়। আপনারা অন্তত ফিরিয়ে দিয়েন না। প্লিজ, টাকাটা রাখুন। আমার আর টাকার দরকার নাই।’
‘আমরা ছিনতাইকারী, ফকির না। খাইটা খাই।’ লিটন বেশ বিরক্ত।
‘ইশ্! কী কষ্ট!’ নান্নুর চোখে প্রায় পানি চলে এল, ‘মেয়েটা এইভাবে আপনারে ধোঁকা দিল?’
‘ওর দোষ নেই। বাবা-মা জোর করে বিয়ে দিচ্ছে। ছেলে ওর পছন্দ না। টাকা যেমন আছে, তেমনি আছে টাক।’
‘আহা রে!’
‘নান্নু, কী ঢং শুরু করছস?’ ধমক দেয় লিটন।
‘ছিনতাইকারী হইলেও আমার আবেগ আছে। তুই জানোস, টাইটানিক আমি নয়বার দেখছি। প্রতিবার কানছি।’
‘কী কস?’
‘খুব দুঃখের সিনেমা। এত সুন্দর জাহাজটা ডুইবা গেল! এতগুলা খাবার! ওহ...ভাই, বিয়া কই হইতাছে? বলো, আমরা তারে তোমার কাছে নিয়া আসমু।’
‘কিন্তু ভাইয়া...’
‘কোনো চার্জ লাগব না। আমরা মাঝেমধ্যে সোশ্যালওয়ার্কও করি। মেয়েটার ছবি দেখাও আমারে। নাইলে কল্লা কাইট্টালামু।’
যুবক সঙ্গে সঙ্গে ফেসবুকে লগইন করে প্রেমিকার প্রোফাইলে গেল।
‘সুন্দর মেয়েটারে জোর কইরা এক টাকলার লগে বিয়া দিতাছে? এইটা হইতে পারে না লিটন। চল যাই। এখনো সময় আছে।’
তৈরি হয়ে কমিউনিটি সেন্টারে আসে লিটন-নান্নু। নান্নুর সিদ্ধান্তে লিটন বেশ বিরক্ত। ওর সব ভালো, খালি এই আবেগটাই সমস্যা। কতবার বলেছে, আবেগ নিয়ে ছিনতাই করা যায় না। শোনেনি। এখন কী হয় কে জানে।
কোনো ভুল যাতে না হয় সে জন্য আগেই গাড়ি তৈরি আছে। পরিকল্পনাটা ঝালিয়ে নিয়ে লিটনসহ ভেতরে ঢুকে গেল নান্নু। তিনতলা কমিউনিটি সেন্টার। তিন ফ্লোরে তিনটা বিয়ের অনুষ্ঠান। তিনটা ফ্লোরই ঘুরল ওরা। সবুজের প্রেমিকার সঙ্গে কারও চেহারাই মেলে না। সব কনেকে দেখতে একই রকম লাগল ওদের। ধবধবে ফরসা। শেষে প্রথম ফ্লোরে মঞ্চের কাছে চলে এল ওরা। ফুলে সাজানো সোফায় বসে আছে কনে। একজন একজন করে তার পাশে বসছে, ছবি তুলছে।
‘এই মেয়ের ছবিই কি দেখছিলাম? মনে হয় না। এত ফরসা তো ছিল না।’ লিটনের কণ্ঠে দ্বিধা।
‘এর সঙ্গেই মোটামুটি মেলে। এই মেয়েই। আমি শিয়োর। মেয়েদের চেহারা আমি ভুলি না। তা ছাড়া বিয়ার দিন মেয়েদের অন্য রকম লাগে। দেখ, ওই যে এক টাকলা বারবার মেয়েটার পাশে বইসা ছবি তুলতেছে। এর লগেই বোধ হয় বিয়ে হইতাছে। চল, আর দেরি করা ঠিক হইব না।’
‘খাইয়া যামু না?’
‘আরে না, কী কস? এখনই যাইতে হইব।’
দুজন দুপাশে চলে আসে। আচমকা মঞ্চের পেছন থেকে কনের সামনে চলে আসে ওরা। কনের মাথায় পিস্তল তাক করে লিটন। চাপা আর্তনাদ ওঠে সবার কণ্ঠে। ‘চোপ!’ পিস্তল হাতে গর্জে ওঠে নান্নু, ‘নড়লেই গুলি!’ কয়েকজনের কান্নার আওয়াজ পায় সে। দ্রুত বের হতে ইশারা দেয় লিটনকে। পিস্তল নিয়ে সামনে থাকে লিটন। কনের হাত ধরে ধীরে ধীরে সবার সামনে গেট দিয়ে বেরিয়ে যায় ওরা।
গাড়িতে উঠেই আস্তানার দিকে রওনা দেয় ওরা। ‘আপা, ভয় পাবেন না।’ নরম কণ্ঠে বলে নান্নু। ‘আপনাকে আপনার প্রেমিকের কাছে নিয়ে যাচ্ছি।’
‘সত্যি?’ খুশি হয়ে ওঠে মেয়েটা, ‘আমি জানতাম, ও এ রকম কিছু একটা করবে! ওয়াও.. কী অ্যাডভেঞ্চারাস ব্যাপার!’ মেয়েটার খুশি দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে নান্নু।
আস্তানার সামনে থামল গাড়ি। মেয়েটাকে গাড়িতে বসিয়ে ঘরে ঢুকল লিটন আর নান্নু। ভেতরে মন খারাপ করে বসে আছে সবুজ। ওদের দেখেই উঠে দাঁড়াল সে। ‘যাও, দেখো গাড়িতে কে বইসা আছে।’ হাসিমুখে বলল নান্নু। দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সবুজ। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ফিরে এল হন্তদন্ত হয়ে। ‘কী হইল?’ চিন্তিত মুখে জিজ্ঞেস করল লিটন।
‘কাকে নিয়ে এসেছেন? এ তো আমার প্রেমিকা না!’
‘কী কয়?’ নান্নু অবাক।
‘মনে হয় আমরা ভুল করছি। চাপা গলায় বলল লিটন। ‘আগেই কইসিলাম, শিয়োর হইয়া ল। ফেসবুকের প্রোফাইল পিকচার আর বাস্তব এক জিনিস না।’
এমন সময় ঘরের বাইরে থেকে মেয়েটা বলল, ‘ভূত দেখার মতো দৌড় দিলে কেন সবুজ? চিনতে পারছ না আমাকে?’
বিস্মিত হয়ে গেল সবুজ। ভেতরে আসতেই বুঝতে পারল ব্যাপারটা। কড়া মেকআপ আর গাড়ির অন্ধকার চেনা মানুষকে অচেনা করে ফেলেছিল। ‘না মানে অন্ধকার তো...!’ কোনোমতে বলল সে।
‘নিজের প্রেমিকারে চিনস না ব্যাটা! আর তোমরাও ক্যান যে মুখে এত পাউডার দাও! মুখ কি ক্যারাম বোর্ড? যাক, মিলায়া দিলাম দুইটারে।’ বিরক্ত মুখে বলল নান্নু। ভেতরে ভেতরে অবশ্য খুশি সে। হাসি দেখা গেল লিটনের মুখেও। এই প্রথম কোনো কাজে সফল হয়েছে তারা। টাকা হয়তো পায়নি, তবে শান্তি পেয়েছে। শান্তিই তো আসল।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন