বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সাদেকের পরিবার ও হারুনের মতো একই পরিস্থিতিতে রয়েছেন দেশের পৌরসভাগুলো থেকে অবসরে যাওয়া ৯৯৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাঁদের মধ্যে কেউ অবসরকালীন কোনো সুযোগ-সুবিধা (গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড) পাচ্ছেন না। অবসরে যাওয়া পৌর কর্মীদের আনুতোষিক বাবদ মোট বকেয়ার পরিমাণ ১৯৩ কোটি টাকার বেশি। এসব পৌর কর্মীর এককালীন ১৮ মাসের মূল বেতন (লামগ্র্যান্ড) পাওয়ার কথা। সেটিও অধিকাংশ কর্মী পাচ্ছেন না।

অবসরে যাওয়া কর্মীদের সমস্যা সমাধানে তিন বছর আগে একটি কমিটি করে স্থানীয় সরকার বিভাগ। ৩০ দিনের মধ্যে কমিটির প্রতিবেদন দেওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত তা জমা হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা একটি কেন্দ্রীয় আনুতোষিক তহবিল গঠনের দাবি জানিয়েছেন।

বাবা মারা যাওয়ার আগে কয়েক মাসের বেতন বকেয়া ছিল। সেই বকেয়া টাকাই পৌরসভা দেয়নি। প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি এসব পাওয়ার আশা করি না।
তাসনুভা মেহেরিন, রায়পুর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী এ টি এম সাদেকের মেয়ে

পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংগঠন পৌরসভা সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায়, দেশের মোট ৩২৮টি পৌরসভা থেকে বিভিন্ন সময়ে স্থায়ী পদ থেকে অবসরে গেছেন ৯৯৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাঁদের বড় অংশই দেশের পুরোনো পৌরসভাগুলোর কর্মী। নতুন গঠিত পৌরসভাগুলো থেকে অবসরে যাওয়া কর্মীর সংখ্যা কম।

পৌরসভার নিজস্ব তহবিল থেকে বেতন–ভাতা–আনুতোষিক হওয়ার নিয়ম

স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯-এর ৫ ধারায় পৌরসভাকে সরকারের একটি প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আইনের ৯১ (৪-এর ক) ধারায় বলা আছে, পৌরসভার কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা নিজস্ব তহবিল থেকে দিতে হবে। কিন্তু দেশের অধিকাংশ পৌরসভার নিজস্ব আয় পর্যাপ্ত না থাকায় কর্মীদের বেতন-ভাতা দেওয়ার সামর্থ্য নেই। অর্থাভাবে অবসরকালীন সুযোগ-সুবিধাও দিতে পারছে না পৌরসভাগুলো।

রায়পুর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী এ টি এম সাদেকের মেয়ে তাসনুভা মেহেরিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাবা মারা যাওয়ার আগে কয়েক মাসের বেতন বকেয়া ছিল। সেই বকেয়া টাকাই পৌরসভা দেয়নি। প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি এসব পাওয়ার আশা করি না।’ তাসনুভা বর্তমানে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অপেক্ষায় আছেন। তাঁর ভাই সরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী।

পৌরসভার কর্মীদের অবসরকালীন সুবিধা নিয়ে কোনো ব্যবস্থাপনা নেই। পুরো বিষয়টি পৌরসভার মেয়রের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। কর্মীদের বেতন দিতে পারছে না, এককালীন এত টাকা কীভাবে দেবে?
শামসুল আলম, ফরিদপুর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী

স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইনে বলা হয়েছে, পৌরসভা নির্ধারিত পদ্ধতিতে কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অবসর গ্রহণের পর আনুতোষিক দেবে। আনুতোষিক তহবিলের অর্থ কেবল কর্মচারীদের পাওনা পরিশোধ করার জন্যই ব্যয় করা যাবে। দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনের সময় মৃত্যুবরণকারী অথবা আহত অথবা ক্ষতিগ্রস্ত কর্মকর্তা বা কর্মচারীর পরিবারকে পৌরসভা বিশেষ আনুতোষিক দিতে পারবে।

লক্ষ্মীপুর পৌরসভার টিকাদানকারী সুপারভাইজার আনোয়ার হোসেন অবসরে যান ২০২০ সালের শুরুতে। এখন পর্যন্ত কোনো সুযোগ-সুবিধা পাননি। আনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘পৌর কর্তৃপক্ষ দরখাস্ত আমলে না নেওয়ায় মন্ত্রণালয়ে দরখাস্ত দিয়েছি। আনুতোষিকের টাকা বেতন থেকে কেটে নিয়েছে, এখন কেন দেবে না। টাকাপয়সা পেলে ছোট ছেলেকে ব্যবসার পুঁজি দেব, স্ত্রীকে হজে পাঠানোর ইচ্ছা ছিল।’

৩০ দিনের মধ্যে সুপারিশ দাখিল ৩ বছরেও হয়নি

পৌরসভা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আনুতোষিক ও কল্যাণ তহবিল গঠন এবং পরিচালনা করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি পর্যালোচনা করে সুপারিশ দেওয়ার জন্য একটি কমিটি গঠন করে স্থানীয় সরকার বিভাগ। স্থানীয় সরকার বিভাগের নগর উন্নয়ন শাখার যুগ্ম সচিবকে আহ্বায়ক করে ২০১৯ সালের ৪ আগস্ট এই কমিটি করা হয়। কমিটির কার্যপরিধিতে বলা হয়, ৩০ দিনের মধ্যে কমিটি সুপারিশসহ প্রতিবেদন দাখিল করবে।

কমিটি গঠনের পর থেকে প্রায় তিন বছর পেরিয়েছে। কিন্তু কমিটি তাদের সুপারিশ জমা দেয়নি। সর্বশেষ গত ৭ মার্চ কমিটি একটি সভা করেছে। এই সভায় পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে চারজন অংশ নেন। তাঁদের একজন ফরিদপুর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী শামসুল আলম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘পৌরসভার কর্মীদের অবসরকালীন সুবিধা নিয়ে কোনো ব্যবস্থাপনা নেই। পুরো বিষয়টি পৌরসভার মেয়রের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। কর্মীদের বেতন দিতে পারছে না, এককালীন এত টাকা কীভাবে দেবে?’

পৌর কর্মকর্তাদের নিয়োগ, বদলি ও শাস্তি দেয় সরকার; আর বেতন দেয় পৌরসভা। একজন কর্মকর্তা চাকরিজীবনে একাধিক পৌরসভায় কাজ করেন। সব পৌরসভা থেকে গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকার হিসাব চূড়ান্ত ও আদায় করা কষ্টসাধ্য। তাই পৌর কর্মীরা একটি কেন্দ্রীয় আনুতোষিক তহবিল গঠনের দাবি জানাচ্ছেন।

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের গঠিত কমিটির আহ্বায়ক নগর উন্নয়ন অধিশাখার যুগ্ম সচিব সবুর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর একটি সভা করা হয়েছে। আরও একাধিক সভা করতে হবে। কেন্দ্রীয়ভাবে তহবিল ব্যবস্থাপনার বিষয়ে আইন-বিধিসহ অন্যান্য দিক পর্যালোচনা করা হচ্ছে। খুব শিগগির এই বিষয়ে সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন