সংবাদ সম্মেলনে শারমিন চৌধুরী বলেন, ‘আমি কারও কাছে বিচার ভিক্ষা করতে আসিনি। আমি শুধু অভিসম্পাত দিতে এসেছি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ ডিবির (গুলশান) উপকমিশনার মশিউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, স্বচ্ছতা, সর্বোচ্চ সতর্কতা ও যত্নের সঙ্গে ডিবি এই মামলার তদন্ত করেছে। তদন্তের প্রতিটি ধাপে এলমার পরিবারের সদস্যরা সম্পৃক্ত ছিলেন। বনানীর যে বাসাটি এলমা হত্যা মামলার ঘটনাস্থল, সেখানে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের শিক্ষককে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল কোনোভাবেই যেন মামলার তদন্তে কোনো ত্রুটি না থাকে। নিজস্ব, ডিজিটাল ও ফরেনসিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়।

গত ১৪ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃত্যকলা বিভাগের ছাত্রী এলমা চৌধুরীর অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়। সুরতহাল প্রতিবেদনে এলমার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। ওই ঘটনায় এলমার বাবা সাইফুল ইসলাম চৌধুরী মেয়ের স্বামী ইফতেখার আবেদীন, শাশুড়ি শিরিন আমিন ও শাশুড়ির স্বামী সাবেক সেনা কর্মকর্তা মো. আমিনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। এলমার মৃত্যুর পরপরই তাঁর স্বামী ইফতেখার আবেদীনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

সংবাদ সম্মেলনে শারমিন চৌধুরী বলেন, ১৯ এপ্রিল ইফতেখার আবেদীনের জামিন মঞ্জুর হয়। জামিন দেওয়ার আগে ডিবি পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা হয়নি। আসামিপক্ষ একটি প্রতিবেদন ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের অনুলিপি আদালতে জমা দিয়েছিল। তিনি বলেন, বাদীপক্ষ এতে আপত্তি জানালে বিচারক তাঁর বিচারকাজ স্থগিত রেখে ডিবির সঙ্গে ফোনে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছেন যে ফটোকপি বা আংশিক প্রতিবেদন সঠিক কি না। তারপর জামিনের আদেশ দিয়েছেন।

আসামির জামিন নিশ্চিত করতে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়ার আগে পুলিশ গণমাধ্যমে তা প্রচার করে বলে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন শারমিন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘এলমা চৌধুরী কানাডা যাওয়ার লোভে ইফতেখারকে বিয়ে করেছেন এটা প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে তারা। মেয়েকে ফেসবুকে এসে বোরকা ও নেকাব পরে লাইভ করতে বাধ্য করে ইফতেখার। যেখানে এলমা বলতে বাধ্য হয়, সে একজন খারাপ মেয়ে। ইফতেখার কানাডায় দিনের বেলায় ট্যাক্সি চালাতেন, এলমাকে তখন ভিডিও কলে যুক্ত থাকতে হতো। এলমা কখনো বাইরে গেলেও তাঁকে অনলাইনে থাকতে হতো। এলমার বন্ধুরাও এসব দেখেছে। তা ছাড়া ফোনে তুই–তোকারি, বাপ–মা তুলে গালিগালাজ ছিল নৈমিত্তিক ব্যাপার।’

শারমিনের অভিযোগ, ডিবি তাঁকে এসব বলার সুযোগ দেয়নি। তাঁর ভাষায় ডিবি কুশল বিনিময়ের নামে ‘নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে’ জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। কখনো ধমক–ধামক দিয়েছে। কখনো বোঝানোর চেষ্টা করেছে।

শারমিন চৌধুরী বলেন, ‘আমার কেবলই মনে হয়েছে আমরা ভিকটিম না, আসামি। আমাকে কোনো কথা স্বাভাবিকভাবে বলতে দেয়নি। অভিযোগ শোনেনি। আসামিদের সাজানো স্ক্রিপ্ট হজম করতে হয়েছে।’ তিনি বলেন, মামলার আসামি ছিলেন ইফতেখার আবেদীন, তাঁর মা ও সৎবাবা। ইফতেখার ছাড়া বাকি দুজন এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। প্রভাব খাটিয়ে তাঁরা মামলাকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। যখনই তাঁরা পুলিশকে জিজ্ঞেস করেছেন তখনই শুনেছেন, তাঁরা দুজন পলাতক। পুলিশ উল্টো প্রশ্ন করেছে, ‘এত বড় ঢাকা শহরে কোথায় খুঁজব?’

শারমিন অভিযোগ করেন, ময়নাতদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঢাকা মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপককে পুলিশ ডিবি অফিসে ডেকে নিয়ে যায়। তাঁকেও আসামির জবানি শুনতে বাধ্য করা হয়।

অন্যদিকে এলমার বাবা সাইফুল ইসলাম চৌধুরী ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের খোঁজে ঢাকা মেডিকেল কলেজ, থানা ও ডিবিতে ঘুরতে থাকেন। শারমিন বলেন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে জানানোর নামে ডিবি অফিসে ডেকে নিয়ে দ্বিতীয়বার তাঁদের মানসিকভাবে হয়রানি করা হয়। এলমার মৃত্যুকে যেন তাঁরা আত্মহত্যা হিসেবে মেনে নেন, সে জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে এলমার মা শারমিন চৌধুরী বলেছেন, এ মামলায় ডিবির তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে তাঁরা আদালতে নারাজি দেবেন। মামলার তদন্ত পিবিআইতে স্থানান্তরের আবেদনও জানাবেন। একই সঙ্গে তাঁরা ইফতেখার যেন বিদেশে পালিয়ে যেতে না পারেন, সে জন্য সীমান্তে সতর্কতা জারিরও আবেদন করেছেন।

এলমার মামলায় আইনি সহযোগিতা দিচ্ছেন ব্যারিস্টার সরওয়ার হোসেন। তিনি বলেন, যেভাবে ইফতেখারকে জামিন দেওয়া হয়েছে, তা নজিরবিহীন।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন