default-image

শখের গাড়িটা আগে প্রতিদিনই চালিয়ে বাইরে যেতেন, অফিস করতেন। বাস কিংবা ট্রাক বসিয়ে না রেখে চালালেই বরং আয় বেশি। গত দেড় বাস ধরে লকডাউনে আপনি ঘরবন্দি। সেই সঙ্গে বাস, ট্রাক, ব্যক্তিগত গাড়িসহ প্রায় সব যানবাহনই বসে আছে।

এক তো আয় বঞ্চিত, পাওয়া যাচ্ছে না সেবাও। দীর্ঘ সময় অলস বসে থাকা যানবাহনগুলোর কারিগরি ক্ষতিও আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অলস বসে থাকা যানবাহনের ব্যাটারি দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। এ জন্য সপ্তাহে অন্তত একবার কিছুক্ষণের জন্য চালু করা উচিত। এতে ব্যাটারির বিকল হওয়া ঠেকাবে। ইঞ্জিনে একটা নির্দিষ্ট তাপমাত্রা দরকার হয়। দীর্ঘদিন গাড়ি পড়ে থাকলে ইঞ্জিনেও কারিগরি সমস্যা হতে পারে। মাঝে–মধ্যে ইঞ্জিন চালু করলে সেই ঝামেলা এড়ানো যেতে পারে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মাগলুব আল নূর প্রথম আলোকে বলেন, গাড়ির বয়স কত, ব্যাটারি কতদিন ধরে লাগানো হয়েছে এটা বড় বিষয়। তবে ৫–৬ দিন পর পর একবার ইঞ্জিন চালু করলে সমস্যা হবে না। অনেকদিন চালু না করে ফেলে রাখলে ব্যাটারি অকেজো হয়ে যাবে। গাড়ির ইঞ্জিনের ক্ষতি খুব একটা হবে না। তবে গাড়ির বয়স বেশি হলে সমস্যা হতে পারে। এ ছাড়া গাড়ি চালু থাকলে যে যত্ন নেওয়া হয়, বসে থাকলে সেটা হয় না। ফলে কারিগরি ও বাহ্যিক অনেক অসঙ্গতিই হতে পারে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের হিসেবে, সারা দেশে যানবাহন আছে প্রায় ৪৪ লাখ। পরিবহন মালিক–শ্রমিকদের সূত্র বলছে, লকডাউনের মধ্যে ২০ হাজারের মতো মালবাহী ট্রাক, জ্বালানি তেলবাহী ট্যাংকলরি ও নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যবাহী পিকআপ ভ্যান চলাচল করছে। এর বাইরে শহরকেন্দ্রিক কিছু ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল চলে। বাকি সব যানই বসে আছে। এর বাইরে গ্রামে–গঞ্জে ১০ লাখের বেশি নসিমন, করিমন, ভটভটিসহ স্থানীয় যানবাহন আছে। এগুলো যান্ত্রিক যান হলেও এর কারগরি মান যাইয়ের কোনো স্বীকৃত কর্তৃপক্ষ নেই। ফলে এসব যান পুনরায় চালু হলে কতটা কার্যকর থাকবে? এর কারগরি কোনো ত্রুটি দেখা দেবে কি না, তা তো দেখারই কেউ নেই।

পরিবহন মালিক–শ্রমিকেরা বলছেন, যান্ত্রিক যান চালু রাখলে এক ধরনের ক্ষয় হয়। তবে বসে থাকলে ক্ষয় আরও বেশি হয়। এ জন্যে কয়েকদিন পর পর কিছু সময়ের জন্য ইঞ্জিন চালু করে রাখতে হয়। ব্যক্তিগত যানের মালিকেরা হয়তো সেটা করে থাকবেন। কিন্তু বাণিজ্যিক যানের মালিকদের পক্ষে কতটা সম্ভব?

এ ছাড়া অধিকাংশ বাণিজ্যিক যান রাখার ভালো গ্যারেজ নেই অধিকাংশ মালেকর। এই বন্ধের সময় তাঁরা সড়কের পাশে, পরিত্যক্ত খোলা জায়গায়, উড়াল সড়কের নিচে, পেট্রোল পাম্পে বাস–ট্রাক রেখে দিয়েছেন। ফলে কেউ কল–কবজা খুলে নিয়েও যেতে পারে। অল্প কয়েকটি বাস কোম্পানির শেডওয়ালা নিজস্ব গ্যারেজ আছে। ফলে বাকিদের বাস–ট্রাক অযত্ন–অবহেলায় থাকছে। সরকার গণরিবহন চালু করলে এসব যান হুড়মুড়িয়ে নেমে যাবে। তখন পর্যাপ্ত কারিগরি সারাইয়ের কাজ করবেন কতজন? আর একটু অসতর্কতায় দুর্ঘটনা বা সম্পদের ক্ষতির আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

ঢাকার ফার্মগেট–নিউমার্কেট পথে লেগুনা চালান আবু তালেব। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তাদের চালানো লেগুনা আসলেই জীর্ণ–শীর্ণ। বডি, কল–কবজা ঠিক নেই। সব সময় জোড়াতালি দিয়ে চালিয়ে থাকেন। এখন দেড় মাস বন্ধ থাকার পর ওই আর চালু করা যাবে কি না, সেটাই বড় বিষয়। তবে লক্কড়–ঝক্কড় এসব যান পুনরায় চালাতে হলে মেরামতে মোটা অঙ্কের টাকা ব্যয় করা লাগতে পারে। মালিক তা করবে কি না, কে জানে।

রাজধানী ঢাকার আজিমপুর–গাজীপুর পথে চলাচলকারী ভিআইপি পরিবহন কোম্পানি বাস চলাচল করে এমন একজন মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর একটি বাস আছে। এর আয় সংসারের জন্য খুবই দরকারি ছিল। গত দেড় মাস ধরে যে লকাউন চলছে, তা কল্পনাতীত। সরকার চালুর ঘোষণা দিলেই সবাই নেমে পড়বে। কার বাস ঠিক, বিকল এগুলো দেখবে না কেউ। তিনি আরও বলেন, করোনার ক্ষতি পোষাতে সরকার কোনো প্রণোদনা দিলেও তাঁর মতো সাধারণ মালিক–শ্রমিকেরা পাবে না। সুতরাং, নিজের রোজগার নিজেরই করতে হবে।

জানতে চাইলে সোহাগ পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফারুক তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, লকডাউনে বসে থাকা সব গাড়ি পুনরায় চালু করার আগে পূর্ণাঙ্গ সার্ভিসিং করতে হবে। কতজনের এই সামর্থ্য আছে, কতজন সচেতন—এটা একটা বড় বিষয়। তবে বড় কোম্পানিগুলোর দামি দামি বাস আছে। ফলে সচেতন না হয়ে উপায় নেই। তিনি বলেন, বসে থাকার সময়টাতে ব্যাটারি ঠিক রাখতে মাঝে মধ্যে বাস চালু করেন তাঁর কর্মীরা। এরপরও বসে থাকার কারণে ব্রেকসহ কারিগরি নানা ত্রুটি দেখা দিতে পারে। সেটা ভালোভাবে না দেখে গাড়ি নামিয়ে দিলে তো ঝুঁকি থাকেই।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0