বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

২০১৬ সালে করা বাংলাদেশ হেলথ অ্যান্ড ইনজুরি সার্ভে অনুযায়ী, দেশে ১ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশুমৃত্যুর (আঘাতজনিত) ৩৭ শতাংশই হয় পানিতে ডুবে। সে হিসাবে বছরে সাড়ে ১৪ হাজার শিশু ডুবে মারা যায়। এর মধ্যে ৭১ শতাংশই ২ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশু। ২৮ শতাংশ শিশুর বয়স ৫ থেকে ৯ বছর।

শিশুমৃত্যু রোধ, পুষ্টি ইত্যাদি খাতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বড় বিনিয়োগ থাকলেও পানিতে ডুবে মৃত্যু রোধে তৎপরতা একেবারেই কম।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এই মৃত্যু প্রতিরোধে ১০টি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে। এর তিনটিই বাংলাদেশের সাফল্যের অভিজ্ঞতা থেকে নেওয়া। এগুলো হলো শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র, সাঁতার শেখানো ও প্রাথমিক চিকিৎসা।

শিশুদের জন্য দিবাযত্ন কেন্দ্রের দরকার কোথায়? এ প্রশ্নের উত্তর মিলবে হেলথ অ্যান্ড ইনজুরি সার্ভের তথ্যে। তারা বলছে, দেশের শিশুর ডুবে মৃত্যুর ৬০ শতাংশ ঘটে সকাল ৯টা থেকে বেলা ১টার মধ্যে। তাই সেই সময়ে শিশুকে যদি নিরাপদ আশ্রয়ে রাখা যায়, তবে শিশুর মৃত্যু রোধ করা যায়।

শিশুমৃত্যু রোধের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বেসরকারি সংগঠন সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ (সিআইপিআরবি)। প্রতিষ্ঠানটি ২০০৫ সাল থেকে শিশুমৃত্যু রোধে কাজ করে আসছে। ডব্লিউএইচওর তিন ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সিআইপিআরবির অভিজ্ঞতা থেকেই নেওয়া।

সিআইপিআরবি প্রথমে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ, নরসিংদীর মনোহরদী এবং শেরপুর সদর উপজেলায় কাজ শুরু করে। এরপর ক্রমান্বয়ে চাঁদপুর সদর, মতলব উত্তর, মতলব দক্ষিণ, কুমিল্লার দাউদকান্দি, পটুয়াখালীর কলাপাড়া এবং বরগুনার বেতাগী ও তালতলী উপজেলায় তাদের কাজ সম্প্রসারিত হয়। সিআইপিআরবি এসব উপজেলায় একটি করে দিবাযত্ন কেন্দ্র তৈরি করেছে।

এখন সারা দেশের ১০ উপজেলার ৩ হাজার ২০০টি কেন্দ্রে প্রায় ৮০ হাজার শিশুকে দিবাযত্ন কেন্দ্র বা আঁচলে রাখা হয়। তারা সকাল নয়টার সময় আসে, চলে যায় বেলা দুইটায়। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একজন নারী শিশুদের দেখভাল করেন। তিনি ‘আঁচল মা’ নামে পরিচিত। প্রতিটি কেন্দ্রে তাঁদের একজন সহযোগী থাকেন। তিনিও নারী।
সম্প্রতি সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জের বেড়াবাজুয়া গ্রামের আঁচল কেন্দ্রে গিয়ে কথা হলো এ কেন্দ্রের ‘আঁচল মা’ নমিতা রানী মালাকারের সঙ্গে। তখন বেলা প্রায় ১১টা। আটটি শিশুকে নিয়ে তিনি এবং তাঁর সহকারী তখন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।

এখানে এই দীর্ঘ সময় ধরে বসিয়ে রাখা হয় না শিশুদের। প্রাক্‌–প্রাথমিকের নানা শিক্ষা দেওয়া হয়। ছন্দে ছন্দে শেখানো হয় সবকিছু। শুধু পাঠ্যপুস্তকের পাঠ নয়, নীতি–আদর্শের নানা গল্প, পানিতে ডুবে গেলে করণীয় সম্পর্কে ছড়া, এর সঙ্গে অঙ্গভঙ্গি—এসব নিয়ে আনন্দময় করে তোলা হয় সময়টুকু। যখন ‘আঁচল’ কেন্দ্রটির ভেতরে ঢুকলাম, তখন শিশুরা সমস্বরে গাইছে,
‘আমাদের কেউ যদি পানিতে পড়ে,
নামব নাকো নিজে পুকুরে
ডাক দেব বড়দের,
আমরা তো পারব না টেনে তাকে তুলতে
দুজনেই ডুবে যাব
পুকুরের তলাতে।’

default-image

নমিতা রানী মালাকার বলছিলেন, এ গ্রামের পাশেই ফুলজোড় নদ; পুকুর-খাল-বিল তো রয়েছেই। আগে ফি বছর নদীতে অনেক শিশু ডুবে মারা যেত; তবে এখন সেই এর সংখ্যা অনেক কমেছে।

সিআইপিআরবির উপনির্বাহী পরিচালক আমিনুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের গবেষণা থেকে দেখেছি, যেসব এলাকায় আঁচল আছে, সেখানে ডুবে যাওয়ার ঘটনা ৮৬ শতাংশ কমে গেছে।’

সিআইপিআরবি নিজ উদ্যোগে এই কাজ পরিচালনা করে। এর সঙ্গে সরকারি কার্যক্রমের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। প্রতিষ্ঠানটির ডুবে যাওয়া মৃত্যুরোধের কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা থাকলেও এর বিস্তারিত তথ্য জানেন না বলে জানান রায়গঞ্জের উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আমিমুল ইহসান তৌহিদ। তবে তিনি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, অন্য উপজেলার সঙ্গে তুলনা করলে রায়গঞ্জে শিশুদের ডুবে মৃত্যুর সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম। চলতি বছর দুটি শিশু পানিতে ডুবে মারা গেছে।

আঁচলের নামের দিবাযত্ন কেন্দ্রই শুধু নয়, ছয় বছরের বেশি বয়সী শিশুদের সাঁতার শেখানো সিআইপিআরবির আরেকটি কাজ। একজন প্রশিক্ষিত ব্যক্তি এ সাঁতার শেখান। তবে করোনাকালে এই শেখানোর কাজ বন্ধ আছে বলে জানান সিআইপিআরবির উপকর্মসূচি ব্যবস্থাপক যোবায়ের আলম। পানিতে ডুবে মৃত্যুর পর প্রাথমিক প্রতিবিধানের ভুল প্রয়োগ অনেক শিশুর মৃত্যু ঘটে বলে জানান আমিনুর রহমান। তাই সাঁতার শেখার পাশাপাশি এসব শিশুকে প্রাথমিক প্রতিবিধানের শিক্ষাও দেওয়া হয়।

সিআইপিআরবির গবেষণায় দেখা গেছে, আঁচল দিবাযত্ন কেন্দ্র ডুবে যাওয়া রোধে ৮০ শতাংশ সুরক্ষা দেয়। আর সাঁতার শেখানোর প্রকল্প ৯০ শতাংশের বেশি সুরক্ষা দিতে পারে।

খ্যাতনামা শিশু বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সহিদুল্লা প্রথম আলোকে বলেন, আঁচল প্রকল্পে যে প্রক্রিয়ায় ডুবে যাওয়া রোধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তার প্রতিটিই বিজ্ঞানসম্মত। ডুবে যাওয়ার ঘটনা যে সময় বেশি হয়, তখন শিশুদের নজরদারিতে রাখা জরুরি। আর এরপর আছে ছয় বছরের বেশি বয়সী শিশুদের সাঁতার শেখানো। এই দক্ষতা সারা জীবন কাজে লাগে।

মোহাম্মদ সহিদুল্লা মনে করেন, শিশুদের ডুবে যাওয়া রোধে আঁচলের এই অভিজ্ঞতা সারা দেশে কাজে লাগানো উচিত। এ নিয়ে সরকারি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কথাও বলেছেন বলে জানান তিনি।

পানিতে ডুবে এত শিশুর মৃত্যু হলেও এ নিয়ে এত দিন সরকারের তেমন উদ্যোগ ছিল না। সম্প্রতি এ নিয়ে নীতিনির্ধারণী স্তরে নড়াচড়া শুরু হয়েছে। ডুবে শিশুমৃত্যু রোধে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় ৩০৯ কোটি ৮৭ লাখ টাকার একটি প্রকল্পও তৈরি করেছে।

default-image

মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত প্রকল্প হলো ‘সমাজভিত্তিক সমন্বিত শিশুযত্ন কেন্দ্রের মাধ্যমে শিশুদের প্রারম্ভিক বিকাশ ও সুরক্ষা এবং শিশুর সাঁতার-সুবিধা প্রদান প্রকল্প’। প্রকল্পের ৮০ ভাগ অর্থই দেবে বাংলাদেশ সরকার। বাকি অর্থ আসবে ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রোপিজ ও রয়্যাল ন্যাশনাল লাইফবোট ইনস্টিটিউট (আরএনএলআই) নামের দুই আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে। এ বছর শুরু হয়ে চলবে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত।

প্রকল্পে এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুর সুরক্ষায় দিবাযত্ন কেন্দ্র, ওই বয়সী ২ লাখ শিশুর জন্য সকাল ৯টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত সুরক্ষার ব্যবস্থা এবং ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী ৩ লাখ ৬০ হাজার শিশুকে সাঁতার শেখানোর ব্যবস্থা রাখা আছে। এসবের পাশাপাশি দুই লাখ অভিভাবককে শিশুর লালন-পালনে সক্ষমতা বাড়ানো ও সচেতনতা তৈরির বিষয়ও আছে।

মোহাম্মদ সহিদুল্লা মনে করেন, এ ধরনের প্রকল্পের কার্যকর বাস্তবায়নে ডুবে শিশুমৃত্যু অনেক কমতে পারে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন