ইরাক ও সিরিয়াভিত্তিক সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) জঙ্গিরা ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে গত কয়েক মাসে বড় বড় সন্ত্রাসী হামলার ষড়যন্ত্রের পাশাপাশি রীতিমতো সামরিক বিজয়ের উচ্চাভিলাষ দেখিয়েছে। বাংলাদেশের মতো দেশেও তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়েছে এবং চিহ্নিত ব্যক্তিদের গুপ্তহত্যার মতো নতুন কৌশল বেছে নিচ্ছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় টেলিভিশন নেটওয়ার্ক এনবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এনবিসির খবরে বলা হয়, আইএসের নিজস্ব সাময়িকী দাবিক-এর সর্বশেষ সংস্করণে সংগঠনটির সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। একটি বিস্ফোরক যন্ত্রের ছবিসহ অনলাইনে গত বুধবার সাময়িকীটি প্রকাশিত হয়েছে। মিসরের সিনাই উপদ্বীপে রাশিয়ার যাত্রীবাহী বিমানে ওই বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
৬৫ পৃষ্ঠার ওই সাময়িকীতে সাম্প্রতিক বিভিন্ন হামলার দায় স্বীকার করে এবং নিজেদের সম্পর্কে আরও যেসব তথ্য দিয়েছে আইএস, সেগুলো প্রমাণিত হয়নি। কিন্তু সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে অংশগ্রহণকারী যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র দেশগুলোর কর্মকর্তারা আইএসের প্রকাশনাটি গভীর সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করে দেখছেন। তাঁরা আইএসের পরবর্তী সম্ভাব্য তৎপরতার বিষয়ে ইঙ্গিত পাওয়ার চেষ্টা করছেন। ওই সাময়িকীতে প্রকাশিত নিবন্ধগুলোয় আইএস সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্যের মধ্যে ইরাকের একটি সামরিক ঘাঁটি দখলের পরিকল্পনা, জাপানের নাগরিকদের যেখানেই পাওয়া যাক হত্যা করা এবং দেশটির স্বার্থহানি করা এবং বাংলাদেশে আইএসের কার্যক্রম সম্প্রসারিত করার কথা রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ দেশে আইএস আছে কি না, সেটা আমরা জানি না। তবে বিশ্বব্যাপী তাদের তৎপরতা দেখে বোঝা যায়, আইএস অনেক শক্তি সঞ্চয় করেছে। তারা এখন সিরিয়ার বাইরেও হামলা করার ক্ষমতা রাখে। প্যারিসে হামলা এর বড় প্রমাণ। আর প্যারিসের হামলায় যারা অংশ নিয়েছে তারা বাইরে থেকে আসেনি, ওই দেশেই ছিল। আইএস ওখানে “স্লিপার সেল” তৈরি করেছে। তাই বাংলাদেশ সম্পর্কে আইএসের প্রকাশনায় যেভাবে এসেছে, এটা খুবই উদ্বেগের বিষয়।’ তিনি বলেন, বিষয়টাকে হালকাভাবে নেওয়ার উপায় নেই। এ বিষয়ে ভালোভাবে তদন্ত করতে হবে এবং দেশের জনগণকে আস্থায় নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে সবাইকে নিয়ে এ ধরনের গোষ্ঠীকে মোকাবিলা করতে হবে।
এনবিসির খবরে আরও বলা হয়, আইএসের সাময়িকীতে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস এবং লেবাননের রাজধানী বৈরুতে হামলা, রাশিয়ার যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত করা ও বাংলাদেশে ইতালীয় সহায়তাকর্মী সিজার তাবেলাকে হত্যা সম্পর্কে বাড়তি বিবরণও দিয়েছে। দাবিক-এর একটি নিবন্ধে বলা হয়, আইএসের একটি ‘সিকিউরিটি সেল’ ঢাকায় সিজার তাবেলাকে চিহ্নিত করে হত্যা করেছে। ঢাকার একটি রাস্তায় তাঁকে অনুসরণ করে গুলি করা হয়েছিল। পাঁচ দিন পর আইএসের সদস্যরা আবার আঘাত হেনে রংপুরে কুনিও হোশিকে হত্যা করে। কারণ, তিনি ছিলেন জাপানের নাগরিক, যে দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে আইএসবিরোধী কার্যক্রমে সহায়তা করে।
ওই নিবন্ধে বাংলাদেশে অন্যান্য সন্ত্রাসী হামলার বিবরণও রয়েছে। দেশটিকে ঐতিহাসিক নাম ‘বেঙ্গল’ হিসেবে উল্লেখ করে আইএস। ঢাকায় শিয়া সম্প্রদায়ের একটি মসজিদে (হোসেনি দালান) হামলা চালিয়ে একজনকে হত্যা (আহত একজন পরে মারা গেছেন ) ও প্রায় ১০০ জনকে জখম করেছে তারা। এ ছাড়া ঢাকায় এক তল্লাশিচৌকিতে পুলিশের ওপর হামলাও আইএস করেছে বলে নিবন্ধে দাবি করা হয়।
এনবিসির খবরে বলা হয়, ওই সাময়িকীর আরেকটি নিবন্ধে আইএস বাংলাদেশকে একটি নতুন যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে বর্ণনা করেছে। তারা কৌশলগত সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে দেশটিকে বেছে নিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সন্ত্রাসবাদ নিয়ে গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটিজ স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) মনিরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, যেহেতু আইএসের নিজস্ব প্রকাশনায় বাংলাদেশ সম্পর্কে এত বিস্তারিতভাবে লেখা হয়েছে। তাই বিষয়টি আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান করে দেখতে হবে। যদি এর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়, সে ক্ষেত্রে এদের প্রতিহত করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
দাবিক-এর বরাত দিয়ে গত দুদিন আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে আইএসের এসব দাবি ও পরবর্তী নিশানা নিয়ে খবর প্রকাশিত হয়েছে। দাবিক-এর ওই নিবন্ধে বাংলাদেশে নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) প্রশংসা করে এর প্রতিষ্ঠাতা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া শায়খ আবদুর রহমানকে ‘শহীদ মুজাহিদ’ আখ্যা দেওয়া হয়। দাবিক-এর ওয়েবসাইটে দেখা যায়, ওই নিবন্ধের ‘দ্য হিস্ট্রি অব জিহাদ ইন বেঙ্গল’ অধ্যায়ে শায়খ আবদুর রহমান ও জেএমবির প্রশংসা করে বলা হয়, এর ফলে ইউরোপীয় উপনিবেশ ও হিন্দু সংস্কৃতির চাপে যে ভূখণ্ড শত শত বছর ‘শিরক’ ও ‘বিদাতে’ ডুবে ছিল, সেখানকার মুসলমানরা একটা আশার আলো দেখেছিল।
নিবন্ধে বলা হয়, মুরতাদ সরকার শায়খ আবদুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে তার আরও কিছু মুজাহিদ কমান্ডারসহ মৃত্যুদণ্ড দেয় ২০০৭ সালে। কয়েক বছরের মধ্যেই উচ্চপদস্থ অনেক কর্মকর্তা এবং ‘তাগুত’ বাহিনীর অনেক কমান্ডার বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের এক বিদ্রোহে নিহত হয়, যাদের অনেকে ‘মুজাহিদ স্কলারদের’ মৃত্যুদণ্ডে জড়িত ছিল।
আইএসের সাময়িকীতে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীকে ‘মুরতাদ’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর একটি ছবি দিয়ে তাতে লেখা হয়েছে, ‘মুরতাদপ্রধান’।
এনবিসির খবরে বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থার পরামর্শক ও ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি ব্লুমিংটনের সেন্টার অন আমেরিকান অ্যান্ড গ্লোবাল সিকিউরিটির পরিচালক সুমিত গাঙ্গুলি বলেন, বাংলাদেশে আইএসের তৎপরতা বৃদ্ধির ঘটনাটি গভীর চিন্তার বিষয় এবং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভারত ও বাংলাদেশের অবস্থান কাছাকাছি এবং প্রতিবেশী দুটি দেশের সীমান্তে অনেক ফাঁকফোকর রয়েছে। আইএস যদি সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশে শিকড় গেড়ে বসে, এটা দেশটিতে অত্যন্ত ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের পূর্বাভাস দিচ্ছে। আর এতে আরেকটি মুসলিমপ্রধান দেশ কট্টরপন্থার বিপদে পড়তে যাচ্ছে।
অবশ্য আইএসের সাময়িকীর এসব দাবিকে গুরুত্ব দিতে রাজি নন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি গতকাল শুক্রবার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ দেশে আইএস বলে কিছু নেই। ইতালীয় নাগরিক তাবেলাকে বিএনপি নেতা কাইয়ুম তাঁর ভাইকে দিয়ে শুটার ভাড়া করে হত্যা করেছে। তাদের কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। এসব ঘটনা যারা ঘটাচ্ছে, তারাই আইএসের নামে এসব প্রচার করছে। এসব প্রচারণাকে আমরা গুরুত্ব দিই না।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0