দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অধীনে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ছোট ছোট সেতু-কালভার্ট নির্মাণ (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্পের অধীনে রাঙামাটি সদর উপজেলার দেড় কোটি টাকার পাঁচটি কাজের দরপত্র জমাদানে বাধা দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জনসংহতির কতিপয় সদস্য সমঝোতার মাধ্যমে এই বাধা দেওয়ায় অংশ নেন বলে ঠিকাদাররা অভিযোগ করেন।
জেলার ১০ উপজেলায় একই সময়ে দরপত্র বিজ্ঞপ্তি ও দরপত্র জমা দেওয়ার সময় নির্ধারিত ছিল। তবে অপর উপজেলাগুলোতে সুষ্ঠুভাবে দরপত্র জমাদান সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে। সদর উপজেলায় তিনটি রাজনৈতিক দলের কতিপয় সদস্য যৌথভাবে দরপত্র জমা দিতে বাধা দিয়েছেন। দরপত্র জমা দেওয়ার একদিন আগে রাতে ঠিকাদারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে দরপত্র কেড়ে নেওয়ারও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ঠিকাদার। গত সোমবার ছিল দরপত্র জমা দেওয়ার সময়।
গতকাল দরপত্র যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করা হয়। তবে জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের ত্রাণ ও দুর্যোগ শাখা এবং সদর উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা কার্যালয় বলছে, দরপত্র জমাদানে যেন কোনো ধরনের সমস্যা সৃষ্টি না হয় তার জন্য পুলিশের পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কার্যালয়ের বাইরে কিছু ঘটে থাকলে তাদের করার কিছু নেই।
রাঙামাটি সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ তৈয়ব জানান, প্রকল্পের পাঁচটি কাজের ১৩৩টি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়েছে প্রতিটি কাজের বিপরীতে চারটি করে মাত্র ২০টি, এটা অস্বাভাবিক ঘটনা। আর পাঁচটির মধ্যে তিনটিতে সমদর এবং দুটিতে শূন্য দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশ নিম্নদর দেওয়া হয়েছে। তবে জেলার বাঘাইছড়ি, জুরাছড়ি ও কাপ্তাই উপজেলার দরপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ওই সব উপজেলায় সব কাজের দরপত্র পাঁচ শতাংশ নিম্নদরে জমা দেওয়া হয়েছে। অথচ রাঙামাটির যোগাযোগ ব্যবস্থা ওই তিনটি উপজেলার চেয়ে অনেক ভালো।
রাঙামাটি জেলা উপজাতীয় ঠিকাদার সমিতির সভাপতি মানস মুকুর চাকমা অভিযোগ করেন, তিনি গত রোববার সকালে রাঙামাটি সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে দরপত্র কিনতে চাইলে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জনসংহতি সমিতির কিছু কম বয়সী সদস্য রাঙামাটি সদর উপজেলার কাজের দরপত্র কিনতে বাধা দেন। তারপর তিনি সদর উপজেলার কাজের দরপত্র না কিনে অন্য একটি উপজেলার কাজের দরপত্র কেনেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তিনজন পাহাড়ি ও বাঙালি ঠিকাদার অভিযোগ করেন, তাঁরা দরপত্র কেনার সময় বাধা পেয়ে গোপনে সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু খবর পেয়ে দরপত্র জমাদানের নির্ধারিত দিনের আগের রাতে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জনসংহতি সমিতির কিছু সদস্য তাঁদের বাড়িতে গিয়ে দরপত্রগুলো দিতে বাধ্য করেছিলেন। এ ছাড়া বেশ কয়েকজন ঠিকাদার অভিযোগ করেন, দরপত্র জমাদানের নির্ধারিত দিনের আগের রাতে তাঁদের বাড়িতে গিয়ে দরপত্র জমা দিতে বারণ করে আসা হয়েছিল।
দরপত্র জমাদানের দিন জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের দুর্যোগ ও ত্রাণ শাখা এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে পাহারা বসানো হয়েছিল। ফলে তাঁদের সেখানে গিয়ে দরপত্র জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি। রাঙামাটি সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ তৈয়ব বলেন, ‘আমরা খবর পেয়েছিলাম দরপত্র কিনতে কয়েকজন বাধা দিয়েছে। তবে সে ব্যাপারে কেউ লিখিত কোনো অভিযোগ করেনি।’
জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ কর্মকর্তা বিশ্বনাথ মজুমদার বলেন, ‘আমরা শুনেছি তিনটি রাজনৈতিক দলের কয়েকজন সদস্য দরপত্র বিক্রি ও জমাদানে বাধা দিচ্ছে। তবে কেউ কোনো ধরনের অভিযোগ করেনি।’
জনসংহতি সমিতির সহকারী তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা বলেন, ‘আমাদের অনেক সদস্যের ঠিকাদারি ব্যবসা আছে জানি। তারা কে কী করল তার কোনো খবর আমাদের রাখা সম্ভব হয় না।’
জেলা বিএনপির সভাপতি মো. শাহ আলম বলেন, ‘বিষয়টি আমি জেনেছি। এভাবে রাজনৈতিক দলের ছেলেরা দরপত্র নিয়ন্ত্রণ শুরু করলে সাধারণ ঠিকাদারেরা বাঁচবে কীভাবে?’
জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও রাঙামাটি সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. মুছা বলেন, ‘ঘটনাটি আমি শুনেছি। সে ব্যাপারে যাচাই-বাছাই করতে হবে। আমাদের কোনো ছেলে জড়িত এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন