default-image

গাইবান্ধার সাংসদ মনজুরুল ইসলামকে (লিটন) হত্যার পরপর সন্দেহভাজন হিসেবে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতের যে ১৫৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, এখন তাঁদের কী হবে? এই হত্যার পরিকল্পনা ও অর্থায়নের কথা স্বীকার করে জাতীয় পার্টির সাবেক সাংসদ আবদুল কাদের খানের জবানবন্দি এবং তাঁর তিন কর্মীর সরাসরি খুনে অংশ নেওয়ার কথা স্বীকারের পর এখন এই প্রশ্ন সামনে এসেছে।
রাজনৈতিক দলগুলো বলছে, কাদের খানসহ পাঁচজনের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর এটা পরিষ্কার হয়েছে যে আগে যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তাঁরা সাংসদ হত্যায় জড়িত নন।
তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও গাইবান্ধার সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) বলছেন, মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সন্দেহভাজনদের কারাগারেই থাকতে হবে।
গাইবান্ধার বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাংসদ মনজুরুল হত্যার পর এই তিনটি দলের ১৫৫ জন নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এঁদের মধ্যে ২৩ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয় সাংসদ হত্যা মামলায়। বাকিদের বিস্ফোরক ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা নতুন চারটি মামলা দিয়ে তাতে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
সাংসদ হত্যা মামলাসহ সবগুলো মামলাই হয়েছে সুন্দরগঞ্জ থানায়। ওই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিয়ার রহমান গতকাল রোববার প্রথম আলোকে বলেন, সাংসদকে হত্যার পর ১৫৫ নয়, ১১০ জনকে বিভিন্ন নাশকতা ও বিস্ফোরক মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলাগুলোর তদন্ত অব্যাহত আছে। আর সাংসদ মনজুরুল হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয় ২৮ জনকে। যার মধ্যে সর্বশেষ পাঁচজন হলেন সাবেক সাংসদ ও অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা কাদের খান ও তাঁর চারজন সহযোগী, যাঁরা সবাই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
এর আগে হত্যা মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে যে ২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়, তাঁদের মধ্যে ২১ জনই জামায়াতের নেতা-কর্মী বলে দলটির জেলা নেতারা দাবি করছেন। বাকি দুজন আওয়ামী লীগের। তাঁরা হলেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সদস্য ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আহসান হাবিব এবং আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা মাসুদুর রহমান (মুকুল)।
অবশ্য জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সৈয়দ শামস-উল-আলম প্রথম আলোকে বলেন, যেহেতু মামলা তদন্তাধীন। তাই তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের দুজন কারাগারে থাকার পক্ষে তিনি।
বিএনপি ও জামায়াতের নেতারা বলছেন, সাংসদ মনজুরুল হত্যার পরপর আওয়ামী লীগের কেন্দ্র থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের নেতারা ঘটনার জন্য জামায়াত-শিবির ও বিএনপিকে দায়ী করে বক্তৃতা দেন। ফলে পুলিশের গ্রেপ্তার তালিকায়ও এই দুটি দলের নেতা-কর্মীর সংখ্যা বেশি।
গাইবান্ধা জেলা জামায়াতের আমির মো. আবদুর রহিম সরকার প্রথম আলোকে বলেন, সাংসদ হত্যার পর তাঁদের দলের ১২৩ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২১ জনকে সাংসদ হত্যা মামলায় এবং বাকি ১০২ জনকে পুলিশের করা বিস্ফোরক আইনের তিনটি ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের করা এক মামলায় গ্রেপ্তার দেখায়।
জামায়াত জানায়, গ্রেপ্তার নেতা-কর্মীদের মধ্যে জেলা কমিটির সাবেক সেক্রেটারি শাহিন মাহমুদ, ১৯৯১ ও ’৯৬ সালে সংসদ নির্বাচনে গাইবান্ধা-২ (সদর) আসনে জামায়াতের প্রার্থী আমিনুল হক এবং সুন্দরগঞ্জ উপজেলা পূর্ব অঞ্চলের আমির সাইফুল ইসলাম অন্যতম। বাকিরা মূলত কর্মী।
গাইবান্ধা জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও আইনজীবী মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, সুন্দরগঞ্জ থানা বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক ও বেলকা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি সানোয়ার হোসেনসহ তাঁদের দলের ৩০ জনের মতো নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের বিস্ফোরক মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, প্রতিটি মামলার এজাহারে বিপুলসংখ্যক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। ফলে একটি মামলায় কেউ জামিন পাওয়ার পর পুলিশ অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখাচ্ছে। এটাকে কেন্দ্র করে গ্রেপ্তার-বাণিজ্যও হয়েছে।
বিএনপির এই নেতার দাবি, ঘটনার সঙ্গে যে বিএনপির কেউ জড়িত নন, তা ইতিমধ্যে প্রমাণিত। তাই সন্দেহভাজন হিসেবে যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাঁদের মুক্তি দিতে হবে।
মামলার নথি ঘেঁটে দেখা যায়, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর সাংসদ মনজুরুল ইসলামকে হত্যার পর ৪, ৮, ১৬ ও ২০ জানুয়ারি চারটি মামলা করে পুলিশ। এর মধ্যে তিনটি বিস্ফোরক আইনে ও একটি হয়েছে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে। এই চার মামলার এজাহারে আসামি হিসেবে ৭৫ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, আর অজ্ঞাতনামা আসামির সংখ্যা ৩৯০ জন। বিএনপি-জামায়াতের গ্রেপ্তার নেতা-কর্মীদের বড় অংশকে ওই অজ্ঞাতনামা সন্দেহে ধরা হয়।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, সাংসদ মনজুরুল হত্যার রহস্য উদ্ঘাটিত হয়েছে। এর পরিকল্পনাকারী ও অর্থদাতা কাদের খান। খুনে সরাসরি অংশ নেন তাঁরই তিন ঘনিষ্ঠ কর্মী। তাঁরা সবাই গ্রেপ্তারও হয়েছেন। এই অবস্থায় আগে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কী হবে। এ নিয়ে গত শনিবার সকালে (নতুন কর্মস্থল খাগড়াছড়ি যাওয়ার আগে) কথা হয় গাইবান্ধা জেলার পুলিশ সুপার আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সন্দেহভাজন হিসেবে যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাঁদের বিষয়ে আদালত সিদ্ধান্ত নেবেন।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে গাইবান্ধা জেলা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) শফিকুর রহমান গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, হত্যাকাণ্ডটি কারা ঘটিয়েছে, তা চিহ্নিত হয়েছে, ঠিক আছে। কিন্তু যেহেতু এখনো তদন্ত চলছে এবং অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি, তাই এ ঘটনায় গ্রেপ্তার অন্যরা কারাগারেই থাকবেন। অভিযোগপত্র দেওয়ার পর কার বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেটা বোঝা যাবে।

সংশোধনী
গতকাল রোববার ‘কাদের খান দোষ স্বীকার করলেন’ শিরোনামে প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদনে ভুলবশত পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হককে ‘মহাপরিদর্শক (অব.)’ লেখা হয়েছে। অনিচ্ছাকৃত এ ভুলের জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত।-বার্তা সম্পাদক

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন