আজও আছে মানবতা

বিজ্ঞাপন
default-image

রাত একটা। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার চাঁদনীঘাট অটোরিকশাস্ট্যান্ড এলাকা। সেখান থেকে ভেসে আসছে নবজাতকের কান্না। ছুটে আসে কিছু মানুষ। দেখতে পান রাস্তার পাশে পড়ে আছে এক নবজাতক। কিছু দূরে মা। মায়ের কোনো অনুভূতি নেই। এমন দৃশ্য দেখে স্থানীয় লোকজন খবর পাঠান সদর থানায়। সেখান থেকে পুলিশ আসে। মা ও নবজাতককে ভর্তি করে ২৫০ শয্যার সদর হাসপাতালে।
এই ঘটনা ঘটেছে গত ২৭ আগস্ট। মা ও নবজাতক সেখানেই আছে। তবে আলাদা স্থানে। মা মানসিক রোগী। তাই সন্তানের যত্ন নিতে পারছেন না। পালাক্রমে নার্স বা হাসপাতালের দায়িত্বরত কর্মীরা শিশুটিকে দুধ খাওয়াচ্ছেন। কাপড়চোপড় পাল্টে দিচ্ছেন। মাঝে মাঝে কর্তব্যরত চিকিৎসক খোঁজখবর নিচ্ছেন। সদর হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা মিলেমিশে নবজাতক ও মায়ের সেবা করে যাচ্ছেন।
১০ দিন ধরে মৌলভীবাজার শিশু ওয়ার্ডের ২ নম্বর ইউনিটে এভাবেই নবজাতকটি আছে। তবে এভাবে কত দিন হাসপাতালে তার লালনপালন সম্ভব, এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট অনেকেই চিন্তিত। শিশুটির মা (২৫) হাসপাতালের মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডে আছেন।
গতকাল শনিবার দুপুরে হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, শিশু ওয়ার্ডে নার্সদের বসার জায়গার পাশেই একটি বিছানায় নবজাতক ঘুমিয়ে আছে। কর্তব্যরত জ্যেষ্ঠ স্টাফ নার্স সেলিনা আক্তার বলেন, ‘আমরা যে যখন ডিউটিতে থাকি, শিশুটির পরিচর্যা করি। তাকে গুঁড়ো দুধ খাওয়ানো হচ্ছে। বাচ্চা সুস্থ আছে। দুধ খাওয়ানোর জন্য মায়ের কাছে আনা হয়েছিল। সে বাচ্চাকে কাছেই নেয় না। ভর্তির পর বাচ্চার কোনো আত্মীয়স্বজন খোঁজ নিতে আসেনি।’

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ২৭ আগস্ট রাত আড়াইটার দিকে মৌলভীবাজার সদর মডেল থানার এসআই কামাল হোসেন স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় জায়েদা (স্থানীয় মানুষের দেওয়া নাম) নামে এক রোগীকে নবজাতকসহ ভর্তি করান।

হাসপাতালের মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডে দেখা গেছে, ওয়ার্ডের বারান্দার ৩২ নম্বর বিছানায় জায়েদা বসে আছেন।  মহিলা ওয়ার্ডের জ্যেষ্ঠ স্টাফ নার্স মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘মায়ের আচরণ সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক। শরীরে কাপড়চোপড় রাখতে চান না। তাঁকে খাওয়ানো, কাপড় পরানো, গোসল করানো— সবকিছু আমরা সবাই মিলে করছি। যে যখন ডিউটিতে আসি, সেই দেখাশোনা করছি।’

সদর থানার এসআই কামাল হোসেন বলেন, গত ২৭ আগস্ট রাত একটার দিকে চাঁদনীঘাট অটোরিকশাস্ট্যান্ড এলাকা থেকে মা ও নবজাতকটিকে উদ্ধার করা হয়। স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, মা এক জায়গায় ও শিশুটি এক জায়গায় পড়ে আছে। স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, মা অটোরিকশাস্ট্যান্ড এলাকায় ঘোরাঘুরি করতেন। তাঁর ঠিকানা কেউ বলতে পারেননি। ওই রাতেই তিনি সন্তান জন্ম দিয়েছেন।

মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) পলাশ রায় বলেন, ‘হাসপাতালের পক্ষ থেকে মা ও শিশুকে দেখাশোনা করছি। শিশুটি সুস্থ আছে। মায়ের মানসিক সমস্যা আছে। তাঁর ট্রিটমেন্ট চলছে। তাঁর অবস্থা উন্নতির দিকে।’ আরএমও আরও জানান, একজন শিশুটিকে দত্তক নিতে চাইছেন। কিন্তু এখনই সিদ্ধান্ত দেওয়া যাচ্ছে না। মায়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। মায়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এলে তখন মা যে সিদ্ধান্ত নেবেন, তাই হবে। তত দিন তাদের দুজনকে হাসপাতাল থেকে দেখাশোনা করা হবে। 

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন