default-image

অনেকগুলো মোটা বই হাতে নিয়ে, সম্ভবত বইয়ের ভারেই ধীর পায়ে বইমেলার বাইরে হাঁটছিলেন গোপীবাগের ফরিদ আহমেদ। একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরির পর এখন তাঁর অখণ্ড অবসর। খুব জরুরি কিছু না থাকলে বাসা থেকে বের হন না। কাঁচা-পাকা চুল, চোখে চশমা, শীতের বাতাস থেকে বাঁচার জন্য জ্যাকেট, পায়ে কেডস। জানালেন, বইগুলো কিনেছেন তাঁর দুই ছেলের জন্য। এবারের মেলায় এলেন এই প্রথম।
‘আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে বইমেলায় আসি। বই কেনাটাই একটা মজার ব্যাপার। পছন্দের বই পেলে তো আনন্দের শেষ নেই।’ বললেন তিনি। যোগ করলেন, ‘গতানুগতিক বই-ই বাজারে আসছে, মৌলিক বই খুবই কম। চিন্তা-চেতনার দৈন্যের যুগে এমন বই আমাদের প্রয়োজন, যে বই আমাদের জগৎটাকে উন্নত করতে পারে।’
কেমন লাগছে এবারের বইমেলা? ‘এ বছর বইমেলা ছিমছাম, সুন্দর মনে হচ্ছে। তবে বাংলা একাডেমি চত্বরেই বইমেলা হওয়া উচিত। তবে ভেতরের চাপ কমানোর জন্য উদ্যানে আয়োজন করা যেতে পারে। আর তা যদি করতে হয়, তবে দুই ভাগে ভাগ না করে এক জায়গায় আয়োজন করলেই ভালো।’
উদ্যানে ঢুকতে প্রবেশপথে তল্লাশির কড়াকড়ি। মাইক্রোফোন হাতে থাকলে যে সংবাদকর্মীরা কিছুটা হলেও ছাড় পেতেন, তাঁরা ছাড় পাচ্ছেন না। আর্চওয়ে পার হয়ে খোলামেলা জায়গাটায় দেখে শান্তি লাগে। দূরে স্বাধীনতাস্তম্ভের গ্লাস টাওয়ার হাতছানি দিচ্ছে। একসময় স্ত্রী আসমা আব্বাসীর হাত ধরে মেলায় ঢুকলেন মুস্তাফা জামান আব্বাসী। বিরক্ত না করে তাঁদের অনুসরণ করি। একদম উত্তর দিকে ঐতিহ্যর স্টলে গিয়ে দাঁড়ালেন তাঁরা। আসমা আব্বাসী কিনলেন এই প্রকাশনী থেকে বের হওয়া প্রথম আলো গোল্লাছুট সেরা গল্প, ডানপিটে কাণ্ড, দ্য অ্যাডভেঞ্চার অব মার্ক টোয়েন, সেলিনা হোসেনের ইলিশ। মুস্তাফা জামান আব্বাসী জানালেন, গতকালই মেলায় এসেছে তাঁর লেখা বই রাসুল (স.)-এর পদপ্রান্তে। এবার মেলায় অন্তত তিনটি বই থাকছে তাঁর।
মিডিয়া কর্মকর্তা পারভেজ চৌধুরী হাঁটছিলেন ধীর পায়ে। হাতে এক গাদা নতুন বইয়ের তালিকার লিফলেট। বই কিনছেন না? খুব চেনা একগাল হাসি দিয়ে বললেন, ‘এখন শুধু তালিকা সংগ্রহ করছি। পরে তালিকা ধরে কেনা।’ আরও বললেন, ‘মেলায় খোদ বাংলা একাডেমিই শব্দদূষণ করছে।’ কথাটা যথার্থই মনে হলো। মাইকের কর্কশ আওয়াজে মাঝে মাঝে নিজেদের কথাবার্তাও শোনা যাচ্ছিল না।
অনেকগুলো স্টলেই ভিড় দেখা গেল। প্রথমা প্রকাশনের স্টলে নজরে আসে একই ধরনের হলুদ টি-শার্ট পরা বিক্রয়কর্মীদের। এ স্টলে চল্লিশোর্ধ্ব শামসুদ্দোহার সঙ্গে দেখা। হাতে এক গাদা বই। আরও বই চাই তাঁর। পুরান ঢাকার নারিন্দায় থাকেন। তাঁর বড় ভাই ছিলেন স্কুলশিক্ষক। ভাইয়ের স্মরণে পাঠাগার নিয়ে স্বপ্ন ও পরিকল্পনার কথা জানালেন। গ্রামের ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে বই পড়তে আসবে, আড্ডা হবে, তাদের পদচারণে পাঠাগার প্রাঙ্গণ মুখরিত হবে—এই তাঁর স্বপ্ন। কথা বলার ফাঁকেই তিনি কেনেন হরিশংকর জলদাসের এখন তুমি কেমন আছ এবং রেজাউর রহমানের পিঁপড়া।
মেলার পূর্ব পাশে সাহিত্যপ্রকাশ, পাঠক সমাবেশ, কাকলী, বেঙ্গল পাবলিকেশনসের স্টল। এখানেই বাঁশ ও বাঁশের কঞ্চি দিয়ে অস্থায়ীভাবে বানানো হয়েছে বেঞ্চ। একটি বেঞ্চে বসে ছিলেন জিগাতলা থেকে আসা তরুণী ফিজা। এবারই প্রথম একুশে বইমেলায় এলেন তিনি। ‘আগে অনেকবার বইমেলায় আসতে চেয়েছি, কিন্তু সময় ও সুযোগের অভাবে আসতে পারিনি। এবারই প্রথম এলাম।’ সঙ্গের মানুষটি কে? প্রশ্ন শুনে লজ্জায় আনত ফিজা বললেন, ‘বন্ধু’।
একটা বেঞ্চে বসি। পাশের মানুষটির হাতে গোটা দশেক বই। পরিচয় দিয়েই কথা বলি। তিনি খুলে ধরেন স্মৃতির ঝাঁপি, ‘ছোটবেলায় কঠিন অসুখ হয়েছিল আমার। বিছানায় শুয়ে শুয়ে দিন কাটত। বাবাকে একটা তালিকা ধরিয়ে দিয়ে বললাম, বইগুলো নিয়ে এসো। আমি শুয়ে শুয়ে বই পড়তাম, আর কাঁদতাম।’ কথাগুলো বলার সময় পল্টনের রাশেদুজ্জামানের চোখ ভারী হয়ে ওঠে। জানা গেল, রাশেদুজ্জামানের কাছে বই-ই জীবনদায়ী শক্তি। বই পড়াটা তাঁর কাছে নেশার মতো যেন। উপন্যাস, কবিতা, ভ্রমণকাহিনি ও আত্মজীবনীমূলক বই পড়েন বেশি। ‘ছোট ছেলেটার মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য তাকে মেলায় নিয়ে আসতে পারলাম না, আফসোস লাগছে। তবে তার জন্য প্রতিদিনই কিছু কিছু বই কিনছি। পরীক্ষা শেষ হলেই একসঙ্গে অনেক বই নিয়ে তার সামনে হাজির হব। সে নিশ্চয়ই অবাক হয়ে যাবে!’ হাতে ধরা বইয়ের মধ্যে আছে ছেলের জন্য কেনা হায়াৎ মামুদের বাহান্নর সেই ছেলেটি, আহসান হাবীবের ধুপপুর জঙ্গলে এ্যালিয়েন। নিজের জন্য কিনেছেন আহমদ রফিকের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, গোলাম কুদ্দুছের ভাষার লড়াই ও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। বললেন, ‘বই কেনার জন্য পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকার বাজেট আছে। প্রতিদিন মেলায় এসে পছন্দমতো বই কিনব।’
উদ্যানের মাঝখানে অনেকগুলো বইয়ের অনুকৃতি দিয়ে সাজানো যে স্টল, সেটি ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনা সংস্থা ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড। অনেক পাঠক ছবি তোলার জন্য এই স্টলটির বাইরে ভিড় করেন। এমনই ভিড়ে মিলল ভাইবোন আসিফ ও সুমাইয়ার দেখা। বয়স আট আর ছয়। সোমবার ছিল আসিফের জন্মদিন। মঙ্গলবার সুমাইয়ার। মামা কথা দিয়েছিলেন ভাগনে-ভাগনিকে বই কিনে দেবেন। মামার মোটরসাইকেলে করে ওরা এসেছে মেলায়। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের এই দুই খুদে পাঠক ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ ও সিসিমপুরের স্টল থেকে দুই ব্যাগ বই কিনে ফেলল।
ফেরার পথে টিএসসির কাছে কয়েকজন তরুণ-তরুণীকে দেখা গেল, যাঁরা যেখানে-সেখানে ময়লা না ফেলা নিয়ে পথচারীদের সচেতন করছেন। সাধুবাদ তাঁরা পেতেই পারেন।
নতুন বই ও মোড়ক উন্মোচন
একাডেমির তথ্যকেন্দ্র এবং সমন্বয় ও জনসংযোগ উপবিভাগ থেকে জানা গেছে, গতকাল মঙ্গলবার মেলার দশম দিনে নতুন ১২৫টি বই এসেছে। মঙ্গলবার নজরুল মঞ্চে নতুন ছয়টি বইয়ের মোড়ক খোলা হয়। এর মধ্যে খ্যাতনামা বাউল আরিফ দেওয়ান আলোকায়ন থেকে আসা গবেষক ও লেখক শাকির দেওয়ানের ভয়ংকর ভূতের ভয়ংকর কাণ্ড বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন। অন্বেষা প্রকাশনী থেকে কুসুম সিকদারের নীল ক্যাফের কবি বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। এ ছাড়া গতকাল বিকেলে অমর একুশে গ্রন্থমেলা উপলক্ষে বাংলা একাডেমির ই-তথ্যকেন্দ্রের উদ্বোধন করা হয়েছে। একাডেমির বর্ধমান হাউসে স্থাপিত তথ্যকেন্দ্রে ই-তথ্যকেন্দ্র সংযুক্ত করা হয়। এটি উদ্বোধন করেন একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন