বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এইচআরএফবি বলেছে, আদালতের এমন পর্যবেক্ষণ অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সুরক্ষা প্রদান করবে, ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগীর জন্য তা উপযোগীও নয়। বরং তা ভুক্তভোগীদের জন্য বিদ্যমান সামাজিক ও আইনি প্রতিবন্ধকতাগুলো আরও বাড়িয়ে দেবে। আদালতের এমন পর্যবেক্ষণ ভুল বার্তা দেবে ও ধর্ষণের ঘটনায় বিচার পাওয়া কঠিন করে তুলবে।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, আদালত নির্দেশনা দিয়েছেন যে ধর্ষণের ঘটনার ৭২ ঘণ্টা পার হয়ে গেলে পুলিশ যেন মামলা গ্রহণ না করে। অথচ ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসারে অপরাধের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনে মামলা গ্রহণের নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। ফলে এমন নির্দেশনার আইনগত ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ।

সংবাদ সম্মেলনে মানবাধিকারকর্মী হামিদা হোসেন বলেন, ট্রাইব্যুনালের বিচারকের অধিকার নেই আইন পরিবর্তন করার। তিনি বলেন, নিম্ন আদালতের বিচারকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন, বিশেষ করে যৌনসম্পর্ক বিষয়ে।

ধর্ষণের ৭২ ঘণ্টা পর মেডিকেল টেস্ট করলে এর আলামত পাওয়া যায় না বলে ওই বিচারক বলেছেন। কিন্তু ধর্ষণে মেডিকেল প্রতিবেদনই একমাত্র প্রমাণ নয়, অন্যান্য প্রমাণও থাকে, যা বিচারকাজে সহায়ক হয় বলে উল্লেখ করে এইচআরএফবি।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ‘অভিযোগকারী দুজন যৌনকর্মে অভ্যস্ত’ বিধায় তাঁরা বিশ্বাসযোগ্য নন বলে বিচারক যে মতামত দিয়েছেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। বিচারকের কাজ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, ভুক্তভোগীর চারিত্রিক সনদ প্রদান করা নয়।

সংবাদ সম্মেলনের সঞ্চালক মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, বারবার নারীকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। এই রায়ে নারী কী করল, কোথায় গেল—এসব বলা হয়েছে। পুরুষের চরিত্র নিয়ে কিছু বলা হচ্ছে না। নারীদের সম্মান না করা হলে, তাদের প্রতি সহিংসতা কমবে না। নারীর প্রতি নেতিবাচক মানসিকতা থাকলে তারা বিচার পাবে না।

তদন্ত কর্মকর্তা প্রভাবিত হয়ে মামলার অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন উল্লেখ করে মূল্যবান সময় নষ্টের জন্য ভুক্তভোগীকে ভর্ৎসনা করেছেন আদালত। কিন্তু পুনরায় তদন্ত করা বা এ বিষয়ে অন্য কোনো পদক্ষেপ নিতে আদালতকে দেখা যায়নি বলেও সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়।

বিচারকের এই পর্যবেক্ষণ তাঁর এখতিয়ার ও সংবিধানবহির্ভূত উল্লেখ করে অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এএলআরডি) নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, বিচার বিভাগে এ ধরনের পর্যবেক্ষণ দেওয়ার মতো বিচারকও আছেন। এ ধরনের মানসিকতা রাখা বিচারকদের শনাক্ত করার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। ওই পর্যবেক্ষণ দেওয়া বিচারকের সাজা দাবি করেন তিনি।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ২০১৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ধর্ষণ মামলার এক রায়ে ১৮ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন উচ্চ আদালত। সেখানে ৩ নম্বর নির্দেশনায় আদালত বলেন, কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা অভিযোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে দেরি বা অভিযোগ নিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারবেন না।

নিম্ন আদালতের বিচারকদের পড়াশোনার ওপর জোর দিয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিচালক (প্রোগ্রাম) নিনা গোস্বামী বলেন, বিচারকেরা যদি পড়াশোনা না করেন, তা দুঃখজনক। সাম্প্রতিক রায়গুলো নিয়ে পড়াশোনা থাকলেও এ ধরনের ঘটনা ঘটত না।

লিখিত বক্তব্যে দাবি জানানো হয়, আদালত সম্পর্কে জনমনে আস্থাহীনতার ঝুঁকি সৃষ্টির জন্য নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭–এর সংশ্লিষ্ট বিচারকের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে উচ্চ আদালতের স্বপ্রণোদিত উদ্যোগ গ্রহণ, ওই বিচারকের বিরুদ্ধে স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়া, ধর্ষণের অভিযোগের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের ১৮ দফা নির্দেশনা মেনে চলা ও এর ব্যত্যয় ঘটলে ব্যবস্থা গ্রহণ। এ ছাড়া ১৮ দফা নির্দেশনা ব্যাপকভাবে প্রচার, সাক্ষ্য আইনের ১৫৫(৪) ধারা বাতিলের প্রক্রিয়া দ্রুততর করা ও সাক্ষী সুরক্ষা আইন দ্রুত প্রণয়ন করার দাবিও জানানো হয়।

নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন বলেন, ৪০ বছর পরও ধর্ষণের অভিযোগ তোলা যায়। তিনিও নিম্ন আদালতের বিচারকদের প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেন।

বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক সালেহ আহমেদ বলেন, নিম্ন আদালতের বিচারকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গির কিছুটা হলেও পরিবর্তন হবে।

এ সময় আরও বক্তব্য দেন বিশিষ্ট আইনজীবী তাজুল ইসলাম, স্টেপস টুয়ার্ডস ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক রঞ্জন কর্মকার, ওমেন উইথ ডিজঅ্যাবিলিটিস ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক আশরাফুন নাহার।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন