যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার (ইউএসএআইডি) কর্মকর্তা জুলহাজ মান্নান ও তাঁর বন্ধু মাহবুব তনয়ের নৃশংস হত্যার পর জঙ্গিবাদ মোকাবিলা, মুক্তচিন্তার মানুষের নিরাপত্তা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে বহির্বিশ্বে যে ধরনের চাপ তৈরির আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, বাংলাদেশ তা কিছুটা সামলে উঠতে পেরেছে বলে মনে করছে। পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এই ধারণা পাওয়া গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সহকারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়ালের ঢাকা সফরের পর বাংলাদেশের কর্মকর্তারা এমনটি মনে করছেন। নিশা বিসওয়াল তাঁর সফরকালে একদিকে জুলহাজ ও তনয় হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করার ওপর যেমন গুরুত্ব আরোপ করেছেন, তেমনি জঙ্গিবাদের হুমকি মোকাবিলায় সব ধরনের সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছেন। বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বলছেন, বিসওয়ালের বার্তায় যেটা স্পষ্ট হয়েছে তা হলো, এসব বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারকে চাপ দিয়ে নয়, পাশে থেকে সহযোগিতা করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে নিশা দেশাইয়ের আলোচনায় উপস্থিত একাধিক সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে গতকাল শুক্রবার এ অভিমত পাওয়া গেছে।

>প্রথম আলোকে রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট
প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সন্ত্রাসী সংগঠনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আমাদের অবশ্যই ভ্রান্ত মতাদর্শের বিরুদ্ধে লড়তে হবে

বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, জুলহাজ মান্নানের হত্যাকাণ্ডের বিষয়টিকে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব মুক্তমনা লোকজনের নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। ওই হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতেরা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় বসার অনুরোধ জানিয়েছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী দেশের বাইরে থাকায় বৈঠকটি হয়নি।
তবে, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র একাধিকবার এ বিষয়ে উদ্বেগ জানান। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রধান এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টের বাংলাদেশবিষয়ক গ্রুপের প্রধান পৃথক বিবৃতিতে জঙ্গিদের হামলায় সাম্প্রতিককালে নিহতদের তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করে দোষীদের বিচারের আহ্বান জানান। ব্রিটিশ সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী দেশটির পার্লামেন্টে এমপিদের প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ সরকারের কাছে নাগরিকদের নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রশ্নে তাঁর সরকারের অবস্থান অবহিত করার কথা জানান। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষযক হাইকমিশনারের দপ্তর থেকেও এসব হত্যাকাণ্ডের বিচারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের লেখকদের সংগঠন, পেন আমেরিকাসহ ১৬টি সংগঠন বাংলাদেশে ব্লগার ও মুক্তমনাদের হত্যার বিষয়ে জাতিসংঘের তদন্ত দাবি করে। জুলহাজের হত্যাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে রীতিমতো ঝড় ওঠে।
সাম্প্রতিক সময়ে জুলহাজ ও তনয় ছাড়াও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকী, টাঙ্গাইলের গোপালপুরে দরজি নিখিল চন্দ্র জোয়ারদার, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাজিম উদ্দিন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।
জুলহাজ হত্যাকাণ্ডের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথা বলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। এমন পরিস্থিতিতে সহকারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর নিয়ে সরকারের মধ্যে একধরনের কৌতূহল ছিল। এই সফরে ওয়াশিংটনের কোনো কড়া বার্তা নিশা দেশাই দিয়ে যাবেন কি না, এ নিয়ে সরকারের মধ্যে একধরনের চাপা অস্বস্তি ছিল। তবে সফরে এসে কোনো ধরনের চাপের কথা তিনি জানাননি। বরং সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের হাত বাড়িয়ে রাখার প্রত্যয়ের কথা জানিয়ে গেছেন তিনি। যেখানে যতটা সহযোগিতা প্রয়োজন, তার সবটাই করবে যুক্তরাষ্ট্র। তবে জুলহাজ মান্নানের হত্যার তদন্তের চূড়ান্ত পরিণতি দেখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।
নিশা দেশাই তাঁর টুইটে লিখেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনায় জুলহাজসহ অন্যদের হত্যাকাণ্ডের তদন্তে পুরোপুরি সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছি। এ ছাড়া অন্য হামলাগুলো প্রতিহত করার প্রয়াসেও পুরোপুরি সহযোগিতা থাকবে।’
জানতে চাইলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট গতকাল শুক্রবার প্রথম আলোকে ই-মেইলে বলেন, ‘জাতিসংঘে লিডার্স সামিটে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সন্ত্রাসী সংগঠনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আমাদের অবশ্যই ভ্রান্ত মতাদর্শের বিরুদ্ধে লড়তে হবে। এটা নিশ্চিত করতে হবে, যেন আমাদের বৈচিত্র্যপূর্ণ সমাজগুলোতে সব বিশ্বাস ও পরিচয়ের মানুষকে শ্রদ্ধা করা হয়। সন্ত্রাসীরা যাতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের সুযোগ নিতে না পারে। সে জন্য এসব সমস্যার সমাধান করতে হবে এবং সুশাসন ও জনগণের মধ্যে বিতর্কের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।’
বার্নিকাট বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেমনটা বলেছেন, “ইসলাম কাউকে খুন করার অনুমোদন দেয় না।” ইসলাম নিশ্চয়ই কোনো ব্যক্তিকে তাঁর বক্তব্য বা লেখা কিংবা তাঁর ধর্মবিশ্বাস অথবা কাউকে ভালোবাসার জন্য হত্যা করার অনুমোদন দেয় না। কিছু মানুষ আমাদের এটা বিশ্বাস করতে বলেন যে আমাদের অবশ্যই ধর্মবিশ্বাস ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের মধ্যে একটি, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও ধর্মবিশ্বাসের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হবে। তাঁরা সঠিক বলছেন না, তাঁদের এ পথও সঠিক নয়।’
জানতে চাইলে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীর গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সন্ত্রাসী হামলার প্রেক্ষাপটে জুলহাজ হত্যাকাণ্ড নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ফলে বৈশ্বিক প্রচারমাধ্যমের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এটা মনে রাখতে হবে, আর্থ-সামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রার অব্যাহত রাখার স্বার্থে সহিংস ও সন্ত্রাসী এসব কর্মকাণ্ড কার্যকরভাবে প্রতিরোধের ব্যাপারে দেশের ভেতরে একধরনের প্রত্যাশা আছে। তেমনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এসব তৎপরতা বন্ধে প্রত্যাশা ও সহযোগিতার মনোভাব আছে। এই প্রত্যাশাকে চাপ হিসেবে না দেখে ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকেই বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
বাংলাদেশের কর্মকর্তারা মনে করেন, নিজেদের কর্মকর্তা হত্যাকাণ্ডের পর পুরো বিষয়টি যথেষ্ট ভারসাম্যমূলকভাবে সামাল দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। কারণ, এ নিয়ে বাংলাদেশকে চাপ দিলে দুই পক্ষের মধ্যে দূরত্ব তৈরির যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। আর দূরত্ব তৈরি হলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতার ক্ষেত্র সংকুচিত হতে পারে। তাই সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত থেকেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার নীতিতে হাঁটছে যুক্তরাষ্ট্র।
সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, জুলহাজ যেহেতু মার্কিন সরকারের কর্মকর্তা ছিলেন, তাই নিজেদের কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সমকামী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অধিকারের বিষয়টিকে পেছনে রেখে এসব হামলা সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের সম্পৃক্ততার ওপর জোর দিচ্ছে দেশটি। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব মনে করে, এ ক্ষেত্রে সরকার এখনো যথেষ্ট পদক্ষেপ নেয়নি কিংবা সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ পর্যাপ্ত নয়। তাই এ হত্যার তদন্তের চূড়ান্ত পরিণতি টানাটা বাংলাদেশের জন্য জরুরি। তবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক নিন্দার ঝড় উঠলেও বিষয়টি নিয়ে এখন পর্যন্ত সরকারের ওপর কোনো চাপ সৃষ্টি হয়নি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে নিশা জানান, জুলহাজ মান্নান মার্কিন সাহায্য সংস্থার কর্মকর্তা হওয়ায় তাঁর গতিবিধির ওপর হত্যাকারীদের নজরদারির কথা যুক্তরাষ্ট্র আগেভাগেই জানত। এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁকে জানান, জুলহাজ যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য সংস্থার কর্মকর্তা বলে তাঁর ওপর নজরদারির বিষয়টিতে সরকার অবহিত নয়। তবে সমকামীদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হওয়ায় তাঁর ওপর জঙ্গিদের নজরদারির কথা জানতে পেরেছেন বাংলাদেশের গোয়েন্দারা। এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলা প্রতিহত করার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আগাম তথ্য থাকলে তা দেওয়ার অনুরোধ জানান। নিশা দেশাই তখন ইতিবাচক সাড়া দেওয়ার আশ্বাস দেন।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন