বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ওই মাঠে গতকাল বিকেলে একটি নাগরিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে মানবাধিকারকর্মী, পরিবেশবাদী ও বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের নেতা-কর্মী, এলাকাবাসী ও শিশু-কিশোরেরা অংশ নেয়।

মাঠ রক্ষার দাবি জানিয়ে গতকাল বিশিষ্ট নাগরিকেরা দুটি আলাদা বিবৃতি দেন। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, রামেন্দু মজুমদার, সারোয়ার আলী, শাহরিয়ার কবির, মুনতাসীর মামুনসহ ১৯ জন বিশিষ্ট নাগরিকের একটি বিবৃতিতে বলা হয়, ‘প্রশ্ন জাগে যে কেন কোনো প্রকার প্রতিবাদ করলে সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রতিবাদকারীকে এ দেশে গ্রেপ্তার হতে হয়। এভাবে মতপ্রকাশে বাধা দেশকে স্থবির করে দিচ্ছে।’

জাফরুল্লাহ চৌধুরী, সুলতানা কামাল, হোসেন জিল্লুর রহমান, ইফতেখারুজ্জামান, রাশেদা কে চৌধূরীসহ ৩৬ জন বিশিষ্ট নাগরিকের আরেক বিবৃতিতে বলা হয়, আন্দোলনকারী নারী ও তাঁর কিশোর ছেলেকে আটক ও তুলে নিয়ে যাওয়া এবং মাঠ দখলের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কলাবাগান থানা যে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতিরই নিন্দনীয় প্রতিফলন ঘটিয়েছে, তা স্পষ্ট।

কলাবাগানের তেঁতুলতলা মাঠে থানা ভবন নির্মাণ করার বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে গতকাল কিছু বলা হয়নি। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বলেন, শিশু-কিশোরদের খেলার মাঠের জন্য বিকল্প জায়গায় খুঁজতে সবাইকে বলা হয়েছে। যদি না হয়, তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও থানা ভবন করাটা অতীব জরুরি। কারণ, থানা এখন ভাড়া ভবনে কার্যক্রম চালাচ্ছে। মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা পরবর্তীতে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব কী করা যায়।’

শিশুদের জন্য যে খেলার মাঠ দরকার, তা–ও উল্লেখ করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমরা যে খেলাধুলা করেছি, সেই অবস্থাটা এখন আর নেই। আমরা সে জন্য কষ্টবোধ করি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য।’

পুলিশ প্রহরায় নির্মাণকাজ

কলাবাগানের তেঁতুলতলা মাঠটি স্কয়ার হাসপাতালের উল্টো দিকের একটি গলিতে। সেটি মূলত একটি খালি জায়গা, যা পুলিশ জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে বরাদ্দ নিয়ে কলাবাগান থানার ভবন নির্মাণ করছে। ছোট এই মাঠে এলাকার শিশু-কিশোরেরা খেলাধুলা করে। এ মাঠে ঈদের নামাজ, স্থানীয় কেউ মারা গেলে তাঁর জানাজা ও সামাজিক অনুষ্ঠান হয়।

মাঠটি রক্ষার দাবিতে অনেক দিন ধরেই আন্দোলন চলছিল। এরই মধ্যে গত রোববার সৈয়দা রত্না মাঠে নির্মাণকাজের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লাইভ করায় তাঁকে ও তাঁর ছেলেকে বেলা ১১টার দিকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। আর আন্দোলন না করার মুচলেকা নিয়ে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয় রাত ১২টার দিকে।

default-image

তেঁতুলতলা মাঠে গতকাল সকাল ১০টায় গিয়ে দেখা যায়, পুলিশ সদস্যদের একটি দল মাঠটি পাহারা দিচ্ছে আর শ্রমিকেরা কাজ করছেন। তিনটি শিশু মাঠের পাশের রাস্তায় দাঁড়িয়ে তাদের খেলার মাঠে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজ দেখছিল। ঘটনাস্থলে শ্রমিকের চেয়ে পুলিশের সংখ্যা ছিল বেশি।

বেলা সাড়ে তিনটার দিকে গিয়ে দেখা যায়, শ্রমিকেরা সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজ করছেন। পুলিশও আগের মতো পাহারা দিচ্ছে। বিকেল চারটার দিকে যখন মাঠের পাশের রাস্তায় নাগরিক সমাবেশ শুরু হয়, তখনো নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন শ্রমিকেরা। তবে কিছুক্ষণ পর নাগরিক সমাবেশে উপস্থিতি বাড়লে রাস্তায় যান চলাচল বন্ধের উপক্রম হয়। তখন সমাবেশে আসা ব্যক্তিরা মাঠের ভেতরে যান। সেখানে সমাবেশ শুরু হয়। এরপর সীমানাপ্রাচীর নির্মাণকাজও বন্ধ করে দেওয়া হয়। অবশ্য বিকেল সাড়ে পাঁচটা থেকে দেখা গেছে, পুলিশ ও শ্রমিকেরা মাঠেই ছিলেন।

উল্লেখ্য, কয়েক মাস ধরে মাঠটি পাহারা দিচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। গত ৩১ জানুয়ারি মাঠটিতে খেলতে যাওয়া কয়েকটি শিশুকে কান ধরে ওঠবস করায় পুলিশ। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পুলিশের চার সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়।

‘থানা হলে শিশুরা খেলার জায়গা হারাবে’

তেঁতুলতলা মাঠে নাগরিক সমাবেশে অংশ নেওয়া এলাকাবাসীর মধ্যে ছিলেন জামিল হোসেন নামের এক ব্যক্তি। তিনি বলেন, ‘এই মাঠে আমাদের অনেক স্মৃতি রয়েছে। কলাবাগান এলাকার একমাত্র মাঠ এই তেঁতুলবাগান। এখানে থানা হলে শিশুরা খেলার জায়গা হারাবে।’ তিনি মাঠটিতে থানা ভবন না নির্মাণ করে অন্য কোথাও করার দাবি জানান।

সমাবেশে নিজেরা করির সমন্বয়ক খুশী কবির, বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের সভাপতি মোবাশ্বের হোসেন, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক ইকবাল হাবিব, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক জামশেদ আহমেদ প্রমুখ। তাঁরা মাঠ রক্ষার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।

কলাবাগানে ছয়টি মাঠ থাকার কথা: আইপিডি

এদিকে মাঠ রক্ষার আন্দোলনে নামা মা ও ছেলেকে ১৩ ঘণ্টা আটকে রাখার ঘটনার পর নগর গবেষণাসংক্রান্ত অলাভজনক সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) গতকাল এক বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, আদর্শগতভাবে নগর–পরিকল্পনায় দুই থেকে তিন হাজার মানুষের জন্য ন্যূনতম একটি করে খেলার মাঠ থাকা দরকার। ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (ড্যাপ) মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি পাড়া-মহল্লায় প্রতি সাড়ে ১২ হাজার মানুষের জন্য দুই থেকে তিনটি করে খেলার মাঠ থাকতে হবে। অতি ঘনবসতির এলাকা কলাবাগানে আনুমানিক ৩০ হাজারের মতো মানুষের বাস। এ এলাকায় অন্তত ছয়টি মাঠ দরকার।

আইপিডি আরও বলেছে, কলাবাগানের তেঁতুলতলা মাঠের আয়তন এক বিঘার মতো। যেটি প্রয়োজনের তুলনায় ছোট। মাঠটি রক্ষা করতে হবে। থানা ভবন অন্য কোথাও করা যেতে পারে।

তেঁতুলতলা মাঠে গতকাল সমাবেশে অংশ নেয় দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী তামিম হাসান। সে প্রথম আলোকে বলে, ‘আমাদের আর কোনো খেলার মাঠ নেই।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন