default-image

সারা দুনিয়া করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। করোনার এ সংক্রমণ থেকে কোনো দেশই মুক্ত নয়। ইতিমধ্যে এই রোগে সারা বিশ্বে প্রায় সাত লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। বিশ্ববাসীর জন্য সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, এই রোগের কোনো ওষুধ এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। করোনার আগ্রাসন সারা বিশ্বের জনজীবনকে স্থবির করে দিয়েছে। জীবিকা হারিয়ে মানুষ নিদারুণ সংকটে দিন কাটাচ্ছে। অভাব-অনটনের কারণে অনেক দেশে মানুষ অর্ধাহারে, এমনকি অনাহারেও দিন কাটাচ্ছে। করোনার ছোবল প্রতিদিনই বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবনের স্পন্দন থামিয়ে দিচ্ছে। প্রতিদিনই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে মৃত্যুর এই মিছিল। এই রোগের ওষুধ না থাকায় মৃত্যুর কাছে প্রতিদিনই ঘটছে মানুষের অসহায় আত্মসমর্পণ। মৃত্যু-আতঙ্কের এ বিভীষিকা বিশ্বের মানুষকে জীবন্মৃতে পরিণত করেছে। করোনাজনিত কারণে জীবিকা হারানোর ফলে ক্ষুধা আর সঠিক ওষুধের অভাবে মৃত্যুভীতিতে সারা বিশ্বের দরিদ্র ও মধ্যম আয়ের দেশের মতো আমাদের দেশের মানুষও অত্যন্ত দুর্বিষহ অবস্থার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে। জনসংখ্যার ভারে জর্জরিত বাংলাদেশের কর্মক্ষম অনেক মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য দেশে কর্মরত বিপুলসংখ্যক চাকরিজীবী প্রতিদিনই ফেরত আসছেন। মধ্যম ও স্বল্প পুঁজির ব্যবসায়ীদের ব্যবসা বন্ধ হয়েছে। গত রোজার ঈদ ও কোরবানির ঈদের মতো অর্থনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত কয়েক কোটি মানুষের জীবিকার এই দুটি উপলক্ষ নষ্ট হয়ে গেছে। করোনার কারণে কৃষিপণ্যের বাজারজাত করার সমস্যার কারণে এ কাজের সঙ্গে যুক্ত বিপুলসংখ্যক মানুষ অভাবী হয়ে পড়েছেন। দেশের অর্থনীতিতে রক্ত সঞ্চালক পোশাকশিল্প আজ অনেকটা স্থবির।

করোনার এই জীবন-জীবিকাঘাতী সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশের সমগ্র উত্তরাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের বন্যা। দেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা এখন বন্যাকবলিত। পদ্মা, যমুনা, ধলেশ্বরী, তিস্তা, দুধকুমারসহ উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের সব নদ-নদীর তীরবর্তী মানুষ নিদারুণ কষ্ট আর ভোগান্তির মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। করোনার আঘাতের ওপর বন্যার এই আঘাত দেশের এসব অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। বাড়িঘর, গাছপালা, স্কুল-কলেজ, গবাদিপশুসহ সহায়-সম্বল সবকিছু বন্যায় ভাসিয়ে নিয়ে গিয়ে এসব অঞ্চলের মানুষকে নিঃস্বে পরিণত করেছে। এর ওপর দেখা দিয়েছে নদীভাঙন। বন্যা ও করোনায় দুস্থ মানুষের মাঝে সরকার ত্রাণ বিতরণ করছে। কিন্তু করোনা ও বন্যার ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য শুধু সরকারের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে দেশের ধনাঢ্য ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি, বেসরকারি সংস্থাগুলোকেও এসব মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসতে হবে। এটা আমাদের সবার নৈতিক এবং জাতীয় দায়িত্ব। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে পর্যাপ্ত খাদ্য সাহায্য দেওয়া, গৃহহীনদের জন্য গৃহনির্মাণ সাহায্য ও গবাদিপশু ক্রয়ের জন্য বিনা সুদে ঋণ, স্বল্প সুদে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ঋণের ব্যবস্থা করার জন্য এখনই সরকারের পরিকল্পনা গ্রহণ করা আবশ্যক।

বন্যা, নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস, খরা ও মহামারির থাবা থেকে দেশের মানুষকে বাঁচাবার জন্য দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণে আর বিলম্বের সময় নেই। প্রতিবছরের নদীভাঙন আর প্রতিবছরের বন্যায় দেশের মানুষকে ভোগান্তির শিকার হতে হবে, এটা যেন এ দেশের মানুষের নিয়তি হিসেবে অনেকে ধরে নিয়েছেন। এসব দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকার প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করা সত্ত্বেও মানুষ এসব দুর্যোগ থেকে মুক্তি পাচ্ছে না। কিন্তু দেশের মানুষকে প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের বলি হতে দেওয়া যায় না। প্রতিবছর প্রকৃতির হাতে মার খাওয়াটা এ দেশের মানুষের নিয়তি হতে পারে না। এই দুর্যোগ থেকে দেশকে এবং দেশের মানুষকে রক্ষার জন্য সরকারকে সুচিন্তিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এ জন্য সরকারকে এমন কার্যকর পরিকল্পনা নিতে হবে, যে পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশ ও দেশের মানুষ প্রকৃতির বিধ্বংসী তাণ্ডব থেকে রক্ষা পাবে। এ কাজ বাস্তবায়নের জন্য বিদেশি সাহায্য-সহযোগিতার প্রয়োজন হলে তা-ও নিতে হবে। চীন যদি ‘হোয়াংহো’ বশ করতে পারে, তাহলে আমরা কেন এ জাতীয় দুর্যোগ দূর করে দুর্ভোগ থেকে রেহাই পেতে পারব না? এ বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণ করে তা বাস্তবায়নে অগ্রসর হওয়াই এখনকার প্রধান কাজ। যেকোনো মূল্যে প্রকৃতির হাতে প্রতিবছর মার খাওয়া এ দেশের দুঃখী মানুষের দুঃখের দিনের অবসান ঘটাতেই হবে। পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংকের উত্থাপিত অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে এই সেতু নির্মাণ করে আমাদের প্রধানমন্ত্রী তাঁর যোগ্যতা ও সক্ষমতা বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দিয়েছেন। দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের এ সংকটকালে আমাদের সাহসী, চৌকস, সক্রিয় এবং অফুরন্ত প্রাণ-প্রাচুর্যে ভরা প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান দেশবাসীকে নিঃসন্দেহে উজ্জীবিত করবে। পদ্মা সেতু নির্মাণের মতো তাঁর দৃঢ় সিদ্ধান্ত, প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তি ও তাঁর প্রতি দেশবাসীর অকুণ্ঠ সমর্থন, দুর্যোগ থেকে দেশকে মুক্ত করতে সক্ষম হবেই।

করোনা, নদীভাঙন, বন্যা, জলোচ্ছ্বাসের কারণে মানুষ আজ ভীষণ বিপন্ন। বিপন্নতাবোধ আর বিষণ্নতাবোধ মন থেকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দিয়ে আমাদের হতে হবে আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান। আমরা আশাবাদী হতে চাই, অতি দ্রুত এই দুর্যোগ এবং দুর্ভোগ কেটে যাবে। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের কলরবে আবার মুখরিত হয়ে উঠবে। মসজিদ-উপাসনালয়ে মানুষ আবার পরিশুদ্ধ মনে ধর্ম-কর্ম করবে। খেলার মাঠগুলোতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসবে। কারখানার চাকা আবার ঘুরবে। কৃষক ফসল ফলানোর নতুন আশায় উদ্দীপ্ত হয়ে মাঠে নামবেন। গ্রামের গঞ্জ-হাটবাজারের দোকানপাটসহ দেশের প্রত্যন্ত জনপদে আবার প্রাণের স্পন্দন জেগে উঠবে। মানুষের জীবনে আবার স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে আসবে। ‘আবার জমবে মেলা, বটতলা-হাটখোলা, অঘ্রানে নবান্নের উৎসবে সোনার বাংলা হয়ে উঠবে সোনায় বিশ্ব অবাক চেয়ে রবে।’

লেখক : সমাজকর্মী। mamasud102@yahoo.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0