বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মারুফার এই মৃত্যু কাঁদিয়েছে তাঁর সহযোদ্ধাদের। তাঁদের আশঙ্কা হয়তো প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার আগে এভাবেই দুনিয়া ছাড়তে হবে তাঁদের। সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারুফার মৃত্যুর খবর পেয়ে তাই ছুটে গিয়েছিলেন ভুক্তভোগী আর মানবাধিকারকর্মীরা।

মফিজুল ইসলাম ছিলেন ঢাকা মহানগর ছাত্রদলের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি। তিনি যখন গুম হন, তখন সাইদুল অষ্টম শ্রেণির ছাত্র, ছোট ভাই রামিমুল ইসলামের বয়স আড়াই বছর।

আজ শনিবার রাতে স্বজন গুম হয়ে গেছেন এমন মানুষদের মঞ্চ মায়ের ডাকের সমন্বয়কারী আফরোজা ইসলামের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলছিলেন, ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে কী কষ্ট করেছেন মারুফা, তার প্রত্যক্ষদর্শী তিনি।

আফরোজা বলেন, ‘যে নারী কখনো মুদির দোকানে যাননি, স্বামীর খোঁজে তিনি পথে পথে ঘুরেছেন। মায়ের ডাকের সব অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন। ফোনে যোগাযোগ রাখতেন। স্বামী গুম, ছেলে দুটো মানুষ করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে ভাবতেন সব সময়। কোনো দিন এক বেলা, কখনো আধপেটা খেয়ে দিন পার করেছেন।’

মারুফা ইসলামের বড় ছেলে সাইদুল ইসলাম ও ছোট ছেলে রামিমুল ইসলাম এখন চাঁদপুরে। সেখানেই দাফন হয়েছে তাঁর। ২০১২ সালের ৮ এপ্রিল রাত থেকে তাঁর বাবার খোঁজে মায়ের যে যুদ্ধের শুরু, তার সমাপ্তি কী করে ঘটল প্রথম আলোকে তাই বলছিলেন সাইদুল।

মফিজুল ইসলাম ছিলেন ঢাকা মহানগর ছাত্রদলের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি। তিনি যখন গুম হন, তখন সাইদুল অষ্টম শ্রেণির ছাত্র, ছোট ভাই রামিমুল ইসলামের বয়স আড়াই বছর। মফিজুল ঝুট কাপড়ের ব্যবসা করতেন। প্রতিদিনের মতো সেদিনও বেলা ১১টার দিকে বাসা থেকে বের হন।

আম্মুর বিশ্বাস ছিল আব্বু ফিরবে। অনেক দিন ধরে গুম হয়ে আছেন, এমন কেউ ফিরে এসেছেন শুনলেই আম্মু আমাদের খবর দিত। এখন আব্বু ফিরলেও আম্মুকে আর পাব না। আমরা চারজন আর এক হতে পারলাম না।
সাইদুল

রাত সাড়ে ৮টার দিকে মারুফাকে ফোন করেন বাবার বন্ধুরা। তাঁরা জানান, একদল লোক ডিবি পরিচয়ে মফিজুলকে তুলে নিয়ে গেছে। তাদের পকেটে ওয়াকিটকি আর পরনে ডিবির জ্যাকেট। অনেক ধস্তাধস্তির পর মফিজুলকে একটা মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে চলে গেছে তারা।

রাত পেরোতে না পেরোতেই স্বামীর খোঁজে নামেন মারুফা ইসলাম। এক ছেলেকে কোলে আর আরেক ছেলের হাত ধরে পরদিন তিনি দারুস সালাম থানা, শাহ আলী থানা, মিরপুর মডেল থানা ও পল্লবী থানায় যান। থানা জানায়, ওই নামে তারা কাউকে গ্রেপ্তার করেনি।

এসএসসির পর সাইদুলকে কাজে দিয়ে দেন মারুফা। ১৭ বছরের ছেলে সংসারের হাল ধরে, পড়ালেখাও চালিয়ে যায়। আর মারুফার পথের সঙ্গী হয় তাঁর ছোট ছেলে রামিমুল।

থানা–পুলিশের পরামর্শে এবার মারুফা যান মিন্টো রোডে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) কার্যালয়ে। সেখান থেকেও জানানো হয় এই নামে গ্রেপ্তার নেই কেউ। দারুস সালাম থানায় পরে একটি সাধারণ ডায়েরি করতে পেরেছিলেন মারুফা।
পরদিন মারুফার গন্তব্য ছিল ঢাকার সব হাসপাতাল। প্রতিটি হাসপাতালের লাশঘরে একটি একটি করে মৃতদেহ খুঁজে পার হয় আরও একটি দিন। এরপর তিনি যান আদালত পাড়ায়।

সাইদুল বলছিলেন, যদি গ্রেপ্তারের পর স্বামীকে আদালতে তোলা হয়, এই আশায় কতবার যে মিরপুর থেকে পুরান ঢাকার আদালতে তাঁর মা গেছেন, দুই হাতে গুনেও তিনি শেষ করতে পারবেন না।

ছোটাছুটির একপর্যায়ে মারুফা বুঝতে পারেন, ঘরে জমানো টাকা ফুরিয়ে আসছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, মফিজুলের বন্ধু, কখনো বাবার বাড়ি থেকে চেয়েচিন্তে চলতে হচ্ছিল। একদিন মিরপুরের বাসা থেকে তাঁরা সাভারের হেমায়েতপুরের একটা কম ভাড়ার বাসায় উঠে যান। খোঁজ তবু ফুরায় না মারুফার। দুষ্ট লোকেরাও নানা সময় তাঁকে ফোন করে ধোঁকা দিয়েছে। যখন যেখানে দেখা গেছে বলে খবর পেয়েছেন, তখনই ছুটেছেন তিনি।

এসএসসির পর সাইদুলকে কাজে দিয়ে দেন মারুফা। ১৭ বছরের ছেলে সংসারের হাল ধরে, পড়ালেখাও চালিয়ে যায়। আর মারুফার পথের সঙ্গী হয় তাঁর ছোট ছেলে রামিমুল।

গুম নিয়ে যখনই কেউ পথে দাঁড়িয়েছে মফিজুলের ছবি বা প্ল্যাকার্ড হাতে ছেলেকে নিয়ে দাঁড়িয়েছেন তিনি। এখন রামিমুলকে নিয়েই চিন্তা সাইদুলের। রামিমুলকে মা কোল ছাড়া করতে চাইতেন না। বাবার স্মৃতি নেই তার, মায়ের হাতে খেত, ঘুমাতোও মায়ের সঙ্গেই। মৃতদেহে হাত বুলিয়ে দেখেও রামিমুলের বিশ্বাস হয়নি মা আর নেই।
সাইদুল বলছিলেন, ‘আম্মুর বিশ্বাস ছিল আব্বু ফিরবে। অনেক দিন ধরে গুম হয়ে আছেন, এমন কেউ ফিরে এসেছেন শুনলেই আম্মু আমাদের খবর দিত। এখন আব্বু ফিরলেও আম্মুকে আর পাব না। আমরা চারজন আর এক হতে পারলাম না।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন