default-image

৫০ বছর আগের কথা। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাংলাদেশে গণহত্যা শুরু করল। এখনো চোখে ভাসে, মানুষের পর মানুষ শুধু প্রাণটুকু বাঁচাতে আর একটু আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটে চলেছে সীমান্তের দিকে। মানবতার কী নিষ্ঠুর অবমাননা! ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষিত হলো। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশমতো দেশকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দখলমুক্ত করতে আমরা মুক্তিযুদ্ধ শুরু করলাম। মুক্তিকামী লাখো মানুষ—নারী, পুরুষ, ছাত্র, জনতা, কৃষক, শ্রমিক, প্রশিক্ষিত বাহিনীর সদস্য সীমান্ত পাড়ি দিতে থাকল মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে। সবার বুকে একই প্রত্যয়—এ লড়াই আদর্শের লড়াই; ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা’র লড়াই (স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র); মানবমুক্তির লড়াই। তাই এই লড়াইকে আমরা অভিহিত করলাম মুক্তিযুদ্ধ বলে।

দেশ, মা-বাবা, স্বজন, বন্ধুবান্ধব পেছনে ফেলে যুদ্ধে যোগ দিয়েছি আমরা। আর কখনো ফেরা হবে কি না জানি না। জানি না, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাস্ত করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আনতে পারব কি না। কিন্তু না, সবকিছুর উৎসারণ ঘটিয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশের উজ্জ্বল উপস্থিতি আজ অনস্বীকার্য, আপন মহিমায় ভাস্বর। নানাভাবে তার প্রমাণ আমরা রেখে চলেছি।

কিছুদিন আগেই নোবেল পুরস্কারজয়ী কৈলাস সত্যার্থী বলেছেন, শিশুশ্রম নিরসনে বাংলাদেশ এশিয়ার আদর্শ হতে পারে। বাংলাদেশের নারীর অগ্রসরমাণতা বা ক্ষমতায়নের চিত্র পৃথিবীকে চমৎকৃত করে। শত বাধাবিঘ্ন সত্ত্বেও নানা বিশেষজ্ঞমতে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক দিক থেকে ‘ইমার্জিং টাইগার’। উন্নয়নের অন্যান্য খাতেও বাংলাদেশের অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য। কয়েকটি ক্ষেত্র ছাড়া অন্য বহু দেশের তুলনায় সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় ভালো ফল করেছে বাংলাদেশ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও জাতিসংঘ–প্রসূত উন্নয়ন নির্দেশিকাগুলোও দেয় বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার সাক্ষ্য। দেশে চরম দারিদ্র্যের প্রায় অবসান ঘটেছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা ছুঁয়েছে, মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে, অনেক রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয়েছে। আমরা কোভিড অতিমারিও মোকাবিলা করেছি প্রশংসনীয়ভাবে। মানুষের মাথার ওপর যথাসম্ভব ছাদ তৈরি করে দেওয়ার প্রয়াস চলেছে। ‘পথের ধারে উলঙ্গ শিশু’ এখন বিরল চিত্র।

বিজ্ঞাপন

একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচার আমরা শুধু শুরুই করিনি, অনেকখানি সম্পন্নও করেছি। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনীতি বাংলাদেশকে আর বাদ দিয়ে চলার কথা ভাবতে পারে না। অনুন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে পরিচিতির যোগ্যতার স্বীকৃতি আমরা পেয়েছি।

এর সবই অপার গৌরবের। তাই এবারের স্বাধীনতা দিবস এসেছে অনন্য দ্যোতনা নিয়ে। তা আরও মহীয়ান হয়ে উঠেছে একই সঙ্গে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদ্‌যাপন করছি বলে। এই উদ্‌যাপনের তাৎপর্য অনেক বেশি, কারণ এ উপলক্ষে নতুন করে স্বাধীন বাংলাদেশের আদর্শ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর বঙ্গবন্ধুর ভাবনা–স্বপ্ন–নির্দেশ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ’৭৫–পরবর্তী ২১ বছর ধরে সেসব ভুলিয়ে দেওয়ার প্রাণপণ প্রয়াস ছিল তদানীন্তন শাসকদের।

সবকিছু পাল্টে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রাণময় উপস্থিতি এখন আমাদের সামনে। আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু–কন্যা শেখ হাসিনা দৃঢ়প্রত্যয়ে বারবার বলছেন, বাংলাদেশ পরিচালিত হবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে। সাধারণ একজন নাগরিক হিসেবে বর্তমান উদ্‌যাপনের অংশ হিসেবে সেই আদর্শের অন্বেষণ আবশ্যক।

৭ মার্চের ভাষণ থেকেই সেই দিকনির্দেশনার শুরু। মনে পড়ে কবিতার মতো তাঁর সেই কথাগুলো, ‘আজ বাংলাদেশের মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়।’ বাংলাদেশের ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা দিতে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, ‘এ দেশের মানুষ অর্থনীতি, রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে।’ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের মানুষের সার্বিক মুক্তির নির্দেশনা দিয়েছিলেন, শুধু খণ্ডিত অর্থনৈতিক মুক্তির নয়।

দুজন মানবদরদি অর্থনীতিবিদের কথা মনে পড়ে যায়। মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনে মাহবুবুল হক বলেছিলেন, ‘মানব উন্নয়ন এমন এক প্রক্রিয়া, যা মানুষের বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রগুলোকে সম্প্রসারিত করে।’ আর অমর্ত্য সেন বলেছেন, ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি বাড়ানো বৃহত্তর, অনেক বৃহত্তর অঙ্গীকারের একটিমাত্র অংশ হতে হবে।’ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশের ধারণার সঙ্গে এই কথাগুলোর অচ্ছেদ্য মিল।

এখন এ স্বপ্ন বাস্তবায়নের অধিকার ও দায়িত্ব সবার, সব নাগরিকের। তবে যাঁরা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেন, সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের মূল দায় বহন করেন তাঁরা। কারণ, তাঁরা স্বেচ্ছায় সে দায়ভার গ্রহণ করেন। সেটাই তাঁদের কর্তব্য। এ ক্ষেত্রে জনগণের আছে সাংবিধানিক অধিকার, দাবি আর দায়িত্ব; কিন্তু নিয়মানুযায়ী এটা করার ক্ষমতা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে। তাঁরা ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের স্বার্থে নীতি নির্ধারণ করবেন এবং তা নির্বাহ করবেন।

অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইয়ে বঙ্গবন্ধু নিজের সম্পর্কে বলেছেন, দলের প্রতি তাঁর আনুগত্য সেখানেই শেষ, যেখানে দেশের প্রতি আনুগত্যের শুরু। তাঁর অনুসারী বলে দাবিদারেরা আজ তার কতখানি মানছেন? নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, ভূমিদস্যুতা, নদী-পাহাড়-বন দখল, চাঁদাবাজি, নারী নির্যাতন, সাম্প্রদায়িক হামলার মতো অপরাধের সংবাদে প্রায়ই ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তির সম্পৃক্তি দেখে মন ব্যথিত হয়। চিলির কবি পাবলো নেরুদার মতো আর্তস্বরে বলতে হয়, ‘আবার আমার দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হলো।’ শঙ্কা জাগে, কারণ এঁরা তো থাকেন আইনের অনেক ঊর্ধ্বে। এসবের সংবাদ প্রকাশ আর গ্রেপ্তারের জালেই আটকে থাকে ঘটনাগুলো। নিগৃহীতরা যে ন্যায়বিচার পেয়েছে, হাতে গোনা কিছু ঘটনা ছাড়া তার উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত নেই। নানা দখলদারত্ব ঘটে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাতেই। সেই দখলদারি মুক্ত করতে আবার সরকারকেই গলদঘর্ম হতে দেখি। জাতীয় সম্পদসংক্রান্ত নীতি নির্ধারণে জনগণের সম্মতির প্রয়োজনীয়তা নীতিনির্ধারকেরা বোধ করেন বলে মনে হয় না। নইলে জনগণের অর্থে জনগণের স্বার্থহানিকর প্রকল্পগুলো একের পর এক ছাড় পায় কী করে?

এ রকম পরিস্থিতিতে পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর ক্ষোভের কথা স্মরণে আসে। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন, ‘জাতীয় সম্পদ বিশেষ গোষ্ঠীর—জনগণ যেন কেউই নয়।’ ক্ষমতাসীনদের দৃষ্টিতে—তা তাঁরা যে দলেরই হোন—জনগণ কি আসলেই এখনো কেউ? নাগরিকদের কোন ভূমিকা যে সরকারের কাম্য, তা নিয়েও অনিশ্চয়তার শেষ নেই। সময়ে সময়ে মানুষের কথা বলার, সংগঠন গড়ার অধিকারের ওপর নানা আইনগত—যা অনেক ক্ষেত্রেই সংবিধানে অগ্রহণযোগ্য—শর্ত আরোপ সে কথাই প্রমাণ করে।

বিজ্ঞাপন

উৎসবমঞ্চ থেকে স্বয়ং দেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের খেদোক্তি কানে আসে, ‘আজকাল যেন রাজনীতি উল্টো পথে হাঁটছে। কিছু সুবিধাবাদী লোক রাজনীতিটাকে পেশা বানিয়ে ফেলেছেন।’ সম্মানিত ব্যতিক্রম নিশ্চয়ই আছেন। তবে দুঃখজনকভাবে তাঁরা ব্যতিক্রম বলেই চিহ্নিত। আমলাদের অনেকে এখনো পাকিস্তানি আমলের ধ্যানধারণাকেই স্বতঃসিদ্ধ মেনে বসে আছেন। আমাদের অভিজ্ঞতায় প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছাপ্রসূত অনেক নির্দেশই শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয় না।

আবারও বঙ্গবন্ধুর শরণাপন্ন হই। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে পড়ি, ‘অযোগ্য নেতৃত্ব, নীতিহীন নেতা ও কাপুরুষ রাজনীতিকদের সাথে কোনো দিন একসাথে হয়ে দেশের কোনো কাজে নামতে নেই। তাতে দেশসেবার চেয়ে দেশের ও জনগণের সর্বনাশই বেশি হয়।’

আজকে স্বাধীনতার ৫০ বছর পরে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি টানা এক যুগ ধরে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকার কারণে বহুদিকে আমরা অহংকার করার মতো উন্নতি করেছি। আবার দুর্নীতি দমনে বৈশ্বিক অবস্থানে যখন আমরা তিরিশের কোঠা ছুঁতে পারি না; মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় প্রতিকার আর জবাবদিহিতে উদাসীনতা দেখি; দেখি এ দেশের মানুষ ভিন্ন পরিচয় বা বিশ্বাসের কারণে ধারাবাহিকভাবে হামলার শিকার কিংবা পরিচয়হীনতার বঞ্চনা নিয়ে বাস করতে বাধ্য হয়; মৌলবাদের আস্ফালনে প্রগতিশীল চিন্তা, নারী স্বাধীনতা, অসাম্প্রদায়িক সর্বজনীন শিক্ষার ধারণা বাধাগ্রস্ত, দুর্বৃত্তের দাপটে মুক্তচিন্তার মানুষ ক্রমাগত সংকুচিত—তখন ভাবি বঙ্গবন্ধুর কোন আদর্শে দেশ পরিচালিত হচ্ছে?

আমরা যাঁরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নিষিক্ত, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ করে দেশের স্বাধীনতা অর্জন করেছি—মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও নির্দেশনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে এ প্রশ্ন তো আজ তাঁদের নিজেদের করতেই হবে। যেমনটা জাতির হয়ে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, এ দেশের মানুষ অধিকার নিয়ে মানুষের মতো বাঁচতে চায়। যেমনটা বলেছিলেন পরম শ্রদ্ধেয় অগ্রজপ্রতিম শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লা কায়সার তাঁর অবিস্মরণীয় কাব্যে, ‘আমরা যে জীবন মানি’—আমরা সেভাবেই মানব–মর্যাদায় বাঁচতে চাই।

সেই জীবনের স্বরূপ সন্ধানে আমাদের বারবার করে স্মরণ করতে হবে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে, যা আমরা রচনা করেছি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে, তিরিশ লাখ শহীদের রক্ত–আখরে, লাখো নারীর ওপর অত্যাচারের বিনিময়ে।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে সব শহীদের স্মৃতির প্রতি এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উদ্‌যাপন–মুহূর্তে তাঁর প্রতি জানাই গভীরতম শ্রদ্ধা।

সুলতানা কামাল: মানবাধিকারকর্মী এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন