বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ওই হামলার ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের একজন তরুণ বড়ুয়া। তিনি রামু কেন্দ্রীয় মহাসীমা বিহার পরিচালনা কমিটির সভাপতি, রামু উপজেলা বৌদ্ধ ঐক্য কল্যাণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে রামুর চৌমুহনী স্টেশনে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘মধ্যরাতে বৌদ্ধপল্লিগুলোতে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল। সে সময় ১২টি শতবর্ষী বৌদ্ধবিহার ধ্বংস করা হয়েছিল। যাঁরা এ কাজ করেছিলেন, তাঁদের অনেকের নাম পুলিশের অভিযোগপত্রে নেই। অনেকে এলাকায় ঘোরাফেরা করছেন বীরদর্পে। মামলায় যাঁদের আসামি করা হয়েছে, তাঁদের অনেকে হামলার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দিলে সংখ্যালঘুরা আবার রোষানলে পড়বেন। এ কারণে আমরা সাক্ষ্য দেব না, বিচারও চাই না।’

পুলিশ ও আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর বিকেলে উত্তম কুমার বড়ুয়া নামের এক ব্যক্তির ফেসবুক পেজ থেকে পবিত্র কোরআন অবমাননার কয়েকটি ছবি প্রকাশ করা হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওই দিন সন্ধ্যায় দিকে চৌমুহনী স্টেশন এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেন শত শত মানুষ। মধ্যরাতে দুর্বৃত্তরা হামলা ও অগ্নিসংযোগ চালিয়ে ধ্বংস করে রামুর ১২টি প্রাচীন বৌদ্ধবিহার ও বৌদ্ধদের ৩৪টি বসতবাড়ি। পরের দিন অগ্নিসংযোগ করা হয় উখিয়া ও টেকনাফের আরও ৭টি বৌদ্ধবিহার ও হিন্দু মন্দিরে। এ ঘটনায় ১৯টি পৃথক মামলা করা হয়। একটি মামলা আপসে নিষ্পত্তি হলেও বাকি ১৮টি মামলার কোনোটির বিচার শুরু হয়নি। বর্তমানে মামলাগুলো কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতসহ বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন। বিচারাধীন ১৮ মামলায় আসামি ৯৯৫ জন; সবাই জামিনে।

* এই হামলার ঘটনায় মোট মামলা হয়েছে ১৯টি। একটি মামলা আপসে নিষ্পত্তি হয়েছে। * বাকি ১৮টি মামলার কোনোটির বিচার শুরু হয়নি।

আসামিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিরা হলেন নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান তোফাইল আহমদ, কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক মেয়র সরওয়ার কামাল, উখিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি সরওয়ার জাহান চৌধুরী, জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও জেলা জামায়াতের সাবেক সেক্রেটারি শাহজালাল চৌধুরী প্রমুখ।

কক্সবাজার আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) ফরিদুল আলম বলেন, ‘১৮ মামলায় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের দেড় শতাধিক ব্যক্তি সাক্ষী। একাধিকবার নোটিশ ও তাগাদা দেওয়ার পরও কেউ সাক্ষ্য দিতে আদালতে আসেননি। সবাই নিরাপত্তার অজুহাত দেখাচ্ছেন। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আশ্বাসও দিচ্ছি। কিন্তু সাড়া মিলছে না। করোনার মহামারির কারণে দীর্ঘ সময় আদালতের বিচারকার্য বন্ধ ছিল। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় সাক্ষীদের সঙ্গে আবার যোগাযোগের চেষ্টা চলছে।’

default-image

এদিকে উত্তম কুমার বড়ুয়ার স্ত্রী রিতা বড়ুয়া গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, হামলার রাতে লোকজন স্লোগান দিয়ে তাঁদের বাড়ির দিকে আসছিলেন। তখন তাঁর স্বামী বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। এরপর তাঁর খোঁজ নেই। উত্তম বড়ুয়ার নামে যে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে পবিত্র কোরআন অবমাননার ছবি প্রকাশ হয়েছিল, সেটি ভুয়া আইডি বলে দাবি রিতার।

কার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেব

হামলায় ধ্বংস হয়েছিল প্রাচীন বৌদ্ধবিহার ‘রামু কেন্দ্রীয় মহাসীমা বিহার’। হামলার সময় বিহারের দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষে ঘুমিয়েছিলেন ভিক্ষু শীলপ্রিয় থের। তখন পালিয়ে কোনো রকম প্রাণে বেঁচেছিলেন তিনি। শীলপ্রিয় থের বলেন, ‘সেদিন যাঁরা হামলা চালিয়েছিল, তাদের কারও শাস্তি হয়নি। তাদের অনেকেই আসামি হননি। তাহলে আমরা কার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেব?’

হামলার শিকার রামুর উত্তর মিঠাছড়ির পাহাড়চূড়ার প্রাচীন বৌদ্ধবিহার বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও বৌদ্ধভিক্ষু করুণাশ্রী মহাথের বলেন, হামলার মূল হোতারা বাইরে। পুনরায় হামলায় শঙ্কা ও নিরাপত্তার কথা ভেবে সে সময় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কেউ মামলার বাদী কিংবা সাক্ষী হতে রাজি হননি।

কক্সবাজার জেলা বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বলেন, এরই মধ্যে রামুতে সম্প্রীতির অনেকটা উত্তরণ ঘটেছে। আস্থার সংকটও কিছুটা কেটে গেছে। বৌদ্ধবিহারে প্রকৃত হামলাকারীদের আইনের আওতায় আনা গেলে আস্থার সংকট দ্রুত কেটে যেত।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন