বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে ১৯৭২ সালে গঠিত হয়েছিল বাংলাদেশ গণপরিষদ। এর মাধ্যমে প্রণীত সংবিধানই সেই বছরের ১৬ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়।

সেমিনারে গণপরিষদের অন্যতম সদস্য এম আমীর-উল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের গণপরিষদ বিতর্কে রাষ্ট্রভাবনার বিষয়টি প্রাধান্য পায়নি বা আলোচনায়ও আসেনি। গণপরিষদে রাষ্ট্রের কাঠামো সম্পর্কে আলোচনা হয়েছিল৷ তার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের সংবিধান তৈরি হয়েছিল। রাষ্ট্রভাবনার কথা বলতে হলে বলতে হয় এটি এসেছিল আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র থেকে। কী কী কারণে এবং কোন কোন বিষয়ের ভিত্তিতে আমরা একটা রাষ্ট্র হতে পারি, তার মৌলিক বিষয়গুলো আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে আছে।’ তিনি বলেন, ‘সংবিধানের প্রস্তাবনাটিকে আমি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। এটি এমন একটি বিষয়, যেটি প্রতিদিনই স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়-ক্লাস শুরু করার আগে সবাই মিলে যদি একসঙ্গে উচ্চারণ করা যায়, তাহলে দেখা যাবে আমাদের সাংবিধানিক মূল্যবোধটা কী এবং সেখানে নাগরিকদের বিচরণটা কী হতে হবে। নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগকে আমরা আমাদের রাষ্ট্রের কাঠামো বলি। কিন্তু আমি মনে করি যে নাগরিকেরা হচ্ছেন রাষ্ট্রের মূল কাঠামো। সেই নাগরিককে আমরা তৈরি করতে পারছি না। শুধু নির্বাহী কর্মকর্তাদের জন্যই নয়, সংবিধানে নাগরিকদের জন্যও একটা শপথ আছে। সংবিধানের প্রস্তাবনাটাকে আমি বেশি গুরুত্ব দিই। প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের এটি পড়ানো উচিত।’

এম আমীর-উল ইসলাম আরও বলেন, ‘সংবিধান শুধু আদালতে ব্যবহারের জন্য নয়, এটি অবশ্যই নাগরিকদের প্রতিদিনের জীবনে আত্মীকৃত হতে হবে। প্রতিটি নাগরিকের মধ্যে এটি দৃঢ় হলেই সংবিধান প্রস্ফুটিত হবে। অন্যথায় আমরা প্রায় প্রতিদিনই সংবিধান ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন দেখতে পাব।’

আলোচনায় অংশ নিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাংসদ আরমা দত্ত সংবিধান কাটাছেঁড়া করার প্রতিবাদ জানান। তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর কোথাও সংবিধান কাটাছেঁড়া করা হয় না, মূলনীতির ওপর তো কেউ হাতই দেয় না। নাগরিকের অধিকারের বিষয়ে বাহাত্তরের সংবিধানে বিস্তারিতভাবে দেওয়া ছিল। এই জায়গাটা আমার জন্য তীব্র ব্যথা, যন্ত্রণা ও অপমানের যে আমাদের সংবিধানকে কাটাছেঁড়া করা হয়েছে। এর মাধ্যমে শহীদদের অপমানিত করা হয়েছে।’

সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার জায়গায় অসাম্প্রদায়িকতা শব্দটি ব্যবহার করা উচিত বলে মত দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ৷

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইন বিভাগের চেয়ারম্যান আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, ‘আমাদের গণপরিষদের সদস্যরা মুক্তিযুদ্ধটা করে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অবয়ব কী হবে, কোন আদর্শ ও লক্ষ্যের জন্য আমরা একটা নতুন রাষ্ট্র গঠন করেছি—সেই সমস্ত বিষয় খুব সততার সঙ্গে প্রতিফলিত করেছেন। গণপরিষদ বিতর্কের প্রতিটা শব্দের মধ্যে আমরা এর প্রমাণ পাই। কিন্তু আশ্চর্য বিষয় হচ্ছে গণপরিষদ বিতর্ক বাংলাদেশের সবচেয়ে অনালোচিত দলিলগুলোর একটা। আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামের নায়কেরা কী রাষ্ট্র গঠন করতে চেয়েছিলেন, তা জানা খুবই জরুরি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন। তিনি বলেন, ‘গণপরিষদ বিতর্ক খুব বেশি আলোচনায় আসেনি। সেখানে খুবই স্বাস্থ্যকর একটি বিতর্ক হয়েছিল, যা একটি ভালো গণতান্ত্রিক সমাজের পূর্বশর্ত। আমাদের সংবিধানের চার মূলনীতি হঠাৎ করে কোনো ব্যক্তির মস্তিষ্কপ্রসূত কোনো বিষয় নয়। এগুলো একটি জাতির ঐতিহাসিক পরিক্রমায় নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে আবর্তিত হয়ে বিবর্তিত কতগুলো ধারণা।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন মো. রহমত উল্লাহর সভাপতিত্বে ও আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসলিমা ইয়াসমীনের সঞ্চালনায় সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক বোরহান উদ্দীন খান।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন