>

করোনাভাইরাস পাল্টে দিয়েছে আমাদের জীবনের বাস্তবতা। দেশ-বিদেশের পাঠকেরা এখানে লিখছেন তাঁদের এ সময়ের আনন্দ-বেদনাভরা দিনযাপনের মানবিক কাহিনি। আপনিও লিখুন। পাঠকের আরও লেখা দেখুন প্রথম আলো অনলাইনে। লেখা পাঠানোর ঠিকানা: dp@prothomalo.com

default-image

বিশ্বে মহামারি করোনাভাইরাসের আগমনের পর থেকেই আমি অন্য এক ক্রান্তিকাল জীবন যাপন করতে শুরু করেছি। জীবনের চাওয়া–পাওয়াগুলো ধীরে ধীরে দুর্বল করতে থাকে। আমার ভালোবাসা, আমার সংসার, আমার জীবন—এগুলোকেও মনে হয় করোনার মতো আক্রমণ করতে থাকে। একটা সময় মনে হয় জীবনের অর্থ কী, ভালোবাসার মূল্য কী? আমার অস্তিত্বের মূল্য কী? আমি কোনো এক সাগরে ছোট একটা নৌকায় বইঠাবিহীন ভাসছি।

আমাদের তিনজনের পরিবার। সংসারজীবনে কখনো সুখ, কখনো দুঃখ পাল্লা দিয়ে খেলা করেছে বহুবার। কিন্তু এবারের ব্যাপারটা অভাবনীয়। হঠাৎ পরিবর্তন, যা কখনো কল্পনাও করতে পারিনি।

সংসারজীবনে কত ঘটনাই ঘটে, আবার শেষও হয়। বিশ্বের মানুষ যখন করোনায় আতঙ্কিত তখন আমি বেশি আতঙ্কিত প্রিয়তমার ভালোবাসা নিয়ে। কী ভুল বুঝে প্রিয়তমা আমায় একা ফেলে চলে গেল। আমি নিরুপায় হয়ে গেলাম। কাউকে কিছু বুঝতে দিতে চাচ্ছিলাম না। না কোনো পরিবারের সদস্য, না কোনো বন্ধুবান্ধব, না বাইরের কেউ। নিজের দুঃখটা নিজের ভেতর লুকিয়ে রেখেছি। আর প্রতিনিয়ত অনুভব করছি হৃদয়ের অনুভূতি দিয়ে। এ যেন অন্য রকম অনুভূতি। করোনার কারণে লকডাউন হচ্ছে, ঠিক তখন আমি ভালোবাসার কাছে লকডাউনে আটকে পড়েছি। মনে হচ্ছে এই ভাইরাসের লকডাউন থেকেও অন্য রকম লকডাউনের ভয়াবহতা অনুভব করছি। ভালোবাসা এখন আমার থেকে অনেক দূরে। কিন্তু অভিমানের ভেতর অনুভব করছি প্রতিক্ষণ। তার অভিমান আমি ভাঙাতে পারিনি। কেন পারিনি জানি না। তাকে আটকাতে গিয়েও পারিনি, কেন পারিনি তাও বলতে পারছি না। হয়তো আমার ব্যর্থতা। কিন্তু আমি তার অযৌক্তিক ভাবনা কিংবা কার্যকলাপকে সমর্থন করিনি বলে এমনটা সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।

আজ আমি একাকী। সঙ্গীবিহীন জীবন যাপন করছি। এ ঘর–সে ঘর ঘুরছি। ভালো লাগছে না। লকডাউনেও প্রায় প্রতিদিন অফিস করছি। অফিসে কাজের মনোযোগ নেই। মন নেই বর্তমান অন্যতম ভালোবাসা সাহিত্যচর্চার সঙ্গে, কবিতার সঙ্গে। কিন্তু এ সবে আমার আকর্ষণ হচ্ছে না। কবিতা লিখতে পারছি না। বইমেলায় স্বরচিত দুই–তিনটা বই বের করেছিলাম। ঘুরেফিরে সেগুলোই হাতে নিচ্ছি। একের পর এক সিগারেট টানছি। ভীষণ বিষণ্নতায় ভুগছি। রাতেও ঘুম হচ্ছে না। ভাবছি হয়তো এই নিঃসঙ্গতাই মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাবে।

একমাত্র ছেলের স্কুল বন্ধ। সেও আমার অনুপস্থিতে একাকিত্ব অনুভব করছে। প্রতিদিন তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থা আমার এই অনভিজ্ঞতার হাতেই হচ্ছে। কখনো লবন বেশি, কখনো ঝাল বেশি, কখনো তেল বেশি হচ্ছে রান্নায় । ভাত যদি লবণ দিয়ে রান্না করা যেত, তাহলে আর খেতে হতো না। কিছুই ভালো লাগছে না। জীবনে এক উদাসীনতার অনুভব করছি।

একটা সময় অনুভব করতে থাকি


আমি কে, আমি কী ?

যা নিজেকে এভাবে ভাবিনি

যা হতে চেয়েছিলাম জীবনে

কখনো তা হতে পারিনি।


ভুল করে ভুল পথে পা বাড়াই

আমি সীমাবদ্ধ আমার আমিতেই

অন্ধকারাচ্ছন্ন সময় আলোকিত করতে

নিজেকে জড়িয়ে ফেলি যা খুশিতেই।

ছেলে দশম শ্রেণিতে পড়ে। তাকে কখনো মোবাইল কিনে দিইনি। করোনায় অনলাইনে ক্লাস শুরু হয়েছে। মোবাইলের দোকানগুলো বন্ধ। প্রতিদিন পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে মোবাইলের দোকান খুঁজতে থাকি। কিন্তু খোলা নেই। হঠাৎ মনে হলো হজ ক্যাম্প মার্কেটে যাই, কিছুক্ষণের জন্যও খোলা পেলে বাজিমাত। পকেটে কিছু টাকা নিয়ে বের হলাম। সৌভাগ্যক্রমে মোবাইল দোকান খোলা পেলাম মাত্র একটি। সেই দোকানটা সার্ভিসিংয়ের কাজ করে বলে দুই–তিন ঘণ্টার জন্য খুলে রেখেছে। মোবাইল তাড়াতাড়ি হাতাহাতি করে দেখে যেটা পছন্দ হলো, তা সাধ্যের মধ্যেই ছিল। ছেলের সেই মোবাইল পছন্দ নয়। মনে মনে আমার রাগ হচ্ছে প্রচুর। তাকে বোঝানোর চেষ্টা করছি এমনকি বিক্রেতাও বোঝানোর চেষ্টা করছে। ছেলে কিছুতেই বুঝতে চাচ্ছে না। তার আরও দামি মোবাইল চাই। আমার সামর্থ্য সম্পর্কে তার ধারণা কম, তাই হয়তো এমনটা করছে। অবশেষে মোবাইল কেনা হলো সামর্থ্যের মধ্যেই। সিমের দোকান বন্ধ। সিম কোথায় পাই ভাবছি। খুঁজে খুঁজে হয়রান। মেজাজ আরও খারাপ হচ্ছে। প্রথম দিনে সিম কিনতে পারলাম না। পরদিন আবার মিশন শুরু। ঘুরে ঘুরে পেয়ে গেলাম একটা দোকান। সিম কেনার পর সেটা আর একটিভ হলো না। মেজাজ আরও বিগড়ে গেল। এদিকে দুপুর ১২টা বাজে। দোকান বন্ধ করে দিল। হতাশ হয়ে ফিরে এলাম। পরদিন আবার মিশনে, যেভাবেই হোক সিম কিনতে হবে না হলে ছেলের অনলাইন লেখাপড়া নষ্ট হবে। ভাগ্যক্রমে পেয়ে গেলাম সিম। ছেলে মহাখুশি। এত দিন আবদার করে যা পায়নি, তা সহজে পেয়ে গেল। কিন্তু আমি ক্রান্তিকাল অনুভব করছি ভালোবাসার অনুপস্থিতিতে। অন্যদিকে আর্থিক সংকটের কথা ভাবছি কীভাবে সামনের দিনগুলো চলব।

এ বছর কবি বন্ধু মাহজাবিনের সঙ্গে যৌথকাব্য করেছিলাম একুশে বইমেলায়। বেশ ভালোই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। কিন্তু করোনার ক্রান্তিকালে সেও যোগাযোগ বন্ধ করে দিল। না ফোনে কথা হয়, না মেসেঞ্জারে কথা হয়। কি ভেবে সে আমার সঙ্গে এমনটা করল তা আজও জানতে পারলাম না। সেও কি ভুল বুঝে এমনটা করছে না, অন্যকিছু তা আজও বুঝতে পারলাম না। মনে মনে অনেক আঘাত পেলাম। তাকে প্রশ্ন করলে কোনো উত্তর দেয় না। আমি আরও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ি, নিজেকে আরও অসহায় লাগছে। বন্ধুর সঙ্গে অনেক কিছুই শেয়ার করতে চাচ্ছিলাম তা আর হলো না। এই সময় প্রিয় বন্ধুরা যখন মুখ ফিরিয়ে নেয় তখন অসহায়ত্ব আরও বেড়ে যায়। নিজেকে এত অসহায় কখনো এর আগে লাগেনি। জানি না কোন অপরাধে সে দূরত্ব সৃষ্টি করেছে।

মানুষ পরিবর্তনশীল। পরিবর্তনশীল তার মন, তার আশা–আকাঙ্ক্ষা। তাই হয়তো বন্ধুটিও পরিবর্তন হয়েছে। কোন মিথ্যা অভিযোগে আমাকে অভিযুক্ত করে দূরত্বের দেয়াল তৈরি করেছে। তার মঙ্গল কামনা করছি সর্বদা। কখনো এমন কিছু ভাবিনি, যাতে তার অমঙ্গল হয়। অনেক দিন একসঙ্গে পথ চলেছি। কিন্তু আজ তার হঠাৎ পরিবর্তন সহজে মেনে নেওয়া কষ্ট হচ্ছে। জানি না কেন এমন হলো। মাঝেমধ্যে মনে হয় জীবনটা বোধহয় এমনই। অনেক সময় ভাগ্যকে মেনে কষ্ট হয়। তবু তা আবার মেনে নিতে হয়। ক্রান্তিকালে এমনভাবে নিজে অসহায় হয়ে যাব, তা কল্পনাও করতে পারিনি। আজ আন্তরিকতাও লকডাউন হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে জীবিত থেকেও মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছি। নিজেকে কীভাবে সান্ত্বনা দেব, তা–ই ভেবে পাচ্ছি না। তারপরও সব কিছু মেনে নিয়ে জীবনের পথ চলছি। সাহিত্যের সঙ্গে সম্পৃক্ততা থাকার কারণে কিছু লেখালেখির চেষ্টা করছি কিন্তু পারছি না। মাথায় কিছুই খেলছে না। একের পর এক ধূমপান করে যাচ্ছি, আর ভাবছি, এ কোন নির্মম পরিহাসের স্বীকার হচ্ছি।

জানি না কবে নাগাদ লকডাউন শেষ হবে। কবে নাগাদ আমার প্রিয়তমা ভালোবাসা আমার কাছে ফিরে আসবে। সবকিছু আগের মতো স্বাভাবিক হবে। স্বাভাবিক হবে আগের মতো জীবনের পথচলা। তাই আশা–ভালোবাসার মাঝে প্রত্যাশা নিয়ে পথ চেয়ে বসে আছি। শুধু একটি কথাই অনুভব করছি, মানুষ মানুষের জন্য। জীবন জীবনের জন্য।

অবশেষে আমার প্রিয়তমার ভালোবাসার প্রতি শুধু এটুকুই বলতে পারি,


অনুভূতি দিয়ে অনুভব করি

তোমার ভালোবাসার অনুভূতি

আত্মবিশ্বাস নিয়ে অবলোকন করি

তোমার আমার সব স্মৃতি।

অনুভূতির ভেতর অনুভূতি

অভূতপূর্ব রূপে প্রকাশ পায়

অভিমানে ভালোবাসা সংকুচিত হয়

অভিযোগে আবার তা হারায়।

* চাকরিজীবী, দক্ষিণখান, ঢাকা। nur.kibria@gmail.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0