কোয়ারেন্টিনের ধূসর দিনগুলোকে কয়েক পাতায় লিপিবদ্ধ করতে মন চাইল আজ। যদি বেঁচে ফিরি এ মহামারি থেকে, তবে বছর কতক পরে, কোনো এক অবসরে খুলে দেখা যাবে জীবনের পরতে পরতে সাজানো ভয়ংকর সব অভিজ্ঞতার গল্প।

আমি প্রাণভরে আকাশ দেখি না আজ এক শ সাতচল্লিশ দিন (গত ১৮ মার্চ থেকে)। আমি বাতাসকে ছুঁতে পারি না মন খুলে। আমার বারান্দা দিয়ে বাহির পানে চোখ মেললে বিশাল অট্টালিকাই দেখা যায় দৃষ্টিসীমার বেশির ভাগটা জুড়ে, কেমন যেন বীভৎসতা নিয়ে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে তারা। হঠাৎ মনে হয় এই বুঝি শ্বাসটা আটকে দিল আমার! আমি সকালে পাখির কিচিরমিচির শুনি, কিন্তু চোখ দিয়ে দেখতে পারি না।

রাতের বেলা ঘরের বাতি নিভিয়ে নীরবতাকে উপভোগ করার চেষ্টা করি, আমি গল্প লেখার ভান করি। কোনো এক রাতে সুখ-দুঃখের আলাপ করি হঠাৎ কাউকে ধরে এনে।

গত পরশু দিন পাশের বাসায় করোনা আক্রান্ত এক ব্যক্তি মারা গেলেন। মনে হলে ক্ষণিকের জন্য ভয় জেঁকে বসে। কিন্তু আমি তাকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিই। বাবা বাসায় নেই আজ সাতচল্লিশ দিন। সরকারি চাকরি, কর্মস্থলে তো থাকতেই হবে। এর মধ্যে আবার আমার এক দাদার মৃত্যুসংবাদ শুনলাম। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

আগাগোড়া অসুন্দরের মাঝেও খুঁটে খুঁটে তা থেকে সৌন্দর্য বের করার অভ্যাসটা আগে কেবলই সহজাত ছিল, কিন্তু তা নিয়ে সচেতন হয়ে কাজ করা হতো না। আমি তাকে পর্যবেক্ষণ করতাম না। কিন্তু এই কোয়ারেন্টিনে আমি তাকে আমার একদম গভীর থেকে গভীরতর রূপে কাছে টেনে আনলাম।

বিকেলবেলা যখন আলো ম্রিয়মাণ হতে শুরু করে, আমার ঘর বরাবর একদম সোজাসুজি ভবনটায় কয়েকটা ছোট ছোট বাচ্চা ঘুড়ি ওড়ায় ছাদে। কী অদ্ভুত সুন্দর একটা দৃশ্য! তারা ছাদের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে দৌড়ে বেড়ায় এটা আমি কল্পনা করে নিই। দেখতে পাই না তো পুরোপুরি তাদের! বিশাল দালানের আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকে যে! আমার ঘরের জানালা বরাবর একটা সরু রাস্তা আছে। রাস্তাটার একদম শেষ মাথায় একটা বস্তি আর তারপরই সে বিশাল বিল্ডিংটা। ব্যাপারটাতে একটু বিদ্রূপের হাসি চলে আসে! সমাজ, দেশ বা পুরো পৃথিবীর জন্মলগ্ন থেকে ক্রান্তিকাল পর্যন্ত হয়তো ব্যাপারটি এমনই ছিল, আছে, থাকবে, ধর্মই হয়তো এটা।

বহুদিন পর আমি এখন সূর্যোদয় দেখি যতদূর চোখ যায়। সূর্যাস্তের সময় আকাশ কালো হতে শুরু করে আজকাল। সে স্রষ্টার তুলির আঁচড়ে যেন এক অপরূপ চিত্রকর্ম!

শ্রাবণ মাস। কখনো ভারী বর্ষণ, কখনো ঢলঢলে বৃষ্টি, আবার কখনো টিপটিপ বৃষ্টি, আবার কখনো ঝোড়ো হাওয়া। হঠাৎ ঢলঢলে বারিধারাকে আমার ভীষণ আপন মনে হয়। একদম মিশে থাকে যেন ভেতরটার সঙ্গে। আমি ফোনে বৃষ্টির কান্নার শব্দ ধারণ করি, আর গুনগুন করে গাইতে থাকি, কদমগুচ্ছ খোঁপায় জড়ায়ে দিয়ে, জলভরা মাঠেতে নাচিব তোমায় নিয়ে।

মাঝেমধ্যে একদল ছেলে সে ঢলঢল করে নামা বৃষ্টিতে ফুটবল খেলে। দূরের সেই বস্তিতেই থাকে বোধ হয়। করোনার সম্পর্কিত নির্দেশিকা মানছে এ বিষয়ে কথা বলতে চাচ্ছি না কোনো। তারা কীই–বা মানবে! আর এ দেশে মানা সম্ভবও না।

আমি দেখি তাদের প্রাণোচ্ছলতা, ভালো লাগে বেশ। প্রচণ্ড অস্থিরতাতেও হৃদয়ের কোথায় যেন স্পর্শ করে যায় মৃদু বাতাস।

কোয়ারেন্টিনের দিনগুলোতে কিছু অদ্ভুত সুন্দর জিনিস পেয়েছি, যার মূল্য বোঝানোর মতো নয়। দেখি কত দিন বাঁচা যায় এগুলোকে অবলম্বন করে। আমার বন্ধুগুলোকে মিস করি খুব। কত দিন দেখা হয় না! আনিকার বাসায় রাতজাগা গল্প আর সরস বিশ্লেষণগুলো নতুন মাত্রায় পৌঁছে অনুভবে আসে আজকাল। এ সময়ে স্বপ্ন দেখতে শিখলাম অল্প অল্প করে। ভাবতাম ভুলে গেছি বোধ হয়। ইদানীং ভাবি আমি আর আনিকা ট্যুর দেব কোথাও, দু–তিন দিনের জন্য। কী চমৎকার ব্যাপার হবে বলো তো! কোনো কিছুই হয়তো হবে না, তাও ভাবার জন্য যে সময়টুকু পেলাম, ভাবলামও এটাও কম আনন্দের নয়।

আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, সব যেন তিনি ঠিক আগের মতোই রাখেন। আবার সুদিন পাড়ে এসে নৌকা ভিড়ালে আমি আমার জায়গায় ফিরে যাব ইনশা আল্লাহ। আমি একবার আমার স্কুলে যাব। পাঁচটা বছরের স্মৃতিতে ঘেরা জায়গাটার আনাচকানাচে একটু হেঁটে বেড়াব। একা যাব, কাউকে সঙ্গে নিয়ে না। স্কুলজীবনের ছুটি হতে না হতেই ভেলপুরি মামার কাছে দৌড়ে চলে যাওয়াটা রুটিন ছিল আমার। একবার গিয়ে দেখে আসতে মন চায়, মামা কি এখনো সে জায়গাটাতেই আছেন নাকি...আমার কলেজটাকে একবার আমি দেখে আসব। তাতে আমার প্রিয়সুন্দর অল্প সময়ের স্মৃতি। তাও কাঠগোলাপের মায়ার গন্ধটা এখনো নাকে এসে লাগে প্রায়ই। সবশেষে আমি বুয়েটে যাব। আমি জানি আমি বুয়েটকে ভালোবাসি না। কিন্তু আমি ভালোবাসি বুয়েটের পথটাকে। ভালোবাসি আর্কির করিডোরে বসে আকাশপাতাল চিন্তাভাবনাকে, ভালোবাসি আমার হলের স্নিগ্ধ সুন্দর পথটাকে, বাদলের ধারা মেশানো উত্তাল বাতাসে যেখানে আশপাশের গাছগুলো থেকে বসন্তের পাতা খসে পড়তো। হলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টিবিলাসটাসকে আমি ভালোবাসি। ভালোবাসি ছাতা না নিয়ে ক্লাসে গিয়ে ফেরার পথে বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে যাওয়াটাকে। আমি ভালোবাসি আমার মানুষগুলোকে। আজকাল ক্লাস চলাকালীন ব্যস্ততাটাকে মিস করি বেশ। ওটা তো আমার নিজের জায়গা, সেখানটার কত কোনায় এখনো আমার স্মৃতি জমানো বাকি! কতকাল আমি তার থেকে বিচ্ছিন্ন!

ভালোবাসি আমি ক্লাস শেষে তপ্ত রোদে পলাশির মোড়ে দাঁড়িয়ে রিকশা খোঁজাটাকে। আমি ভালোবাসি আমার দোয়েল চত্বর, চারুকলার সামনের চুড়ির দোকানগুলোকে, ভালোবাসি হাকিম চত্বরের ঝরনাধারাটাকে আর নানা মানুষকে নিজের চোখ দিয়ে দেখতে। চারুকলাটাকে কেন জানি বেশ আপন মনে হয় একদম জানি না কেন। কার্জনও আমার বেশ প্রিয়। একদিকে শান্ত আবার একই সঙ্গে কোলাহলময় পরিবেশ। আমি আমার কাছের মানুষগুলোর সঙ্গে হুটহাট বেরিয়ে এলোপাতড়ি ঘুরে বেড়ানোটাকে ভালোবাসি।

আমি আবার ফিরতে চাই আমার সত্তাতে, আমার ভালোবাসাগুলোতে ফিরতে চাই, ফিরতে চাই বারেবারে।

*লেখক: শিক্ষার্থী, পুরকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0