সংসার খরচ, লেখাপড়ার খরচ নিয়ে পরিবারে টানাপোড়েন হয়নি?

মারুফা: মা গৃহিণী। তবে আমার পড়ানোর জন্য হাতের কাজ মানে কাঁথা সেলাই করেন মাঝেমধ্যে। আর বাবা খালবিলে মাছ ধরেন। মায়ের মাসে ৫০০-৭০০ টাকা আর বাবার প্রতিদিন ২০০-২৫০ টাকা আয় হয়। আমরা তিন বোন আর মা-বাবা মিলে পাঁচজন। এর মধ্যে আমার ও মেজ বোনের লেখাপড়া। সামান্য এই আয়ে কীভাবে ভালো চলা যায় বলুন? তিন বেলা খাবার জুটত না প্রতিদিন। আর ভালো খাবারের তো প্রশ্নই ওঠে না।

আপনার লেখাপড়ার খরচ চলেছে কীভাবে?

মারুফা: মাধ্যমিকে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাহবুবুর রহমান স্যার আমাকে সহযোগিতা করেছেন। আমাকে কয়েকজন শিক্ষকের কাছে বিনা বেতনে পড়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। বাড়ি থেকে স্কুলের দূরত্ব ছিল তিন কিলোমিটার। হেঁটে যাতায়াত করেছি। এইচএসসিতে প্রথম কয়েক মাস বাড়ি থেকে যেতাম ভ্যানে করে। খরচ হতো প্রতিদিন ২০ টাকা। প্রতিদিন আট কিলোমিটার যাতায়াতে অনেক সময় ব্যয় হয়ে যেত। কলেজের অধ্যক্ষ আবদুর রহমান স্যার হোস্টেলে থাকার ব্যবস্থা করে দেন। পাশাপাশি স্যারদের কাছে বিনা বেতনে পড়ারও সুযোগ করে দেন।

হোস্টেলে থাকার সময় মা-বাবার সঙ্গে যোগাযোগ হতো?

মারুফা: মা হেঁটে সপ্তাহে কমপক্ষে চার দিন কলেজ হোস্টেলে গিয়ে আমার খোঁজখবর নিতেন। স্যারদের সঙ্গে কথা বলতেন আমাকে নিয়ে। আমার এ জায়গায় আসতে মা সীমাহীন পরিশ্রম করেছেন। আর বাবা কাজ না করলে তো সবার মুখে খাবার জুটবে না। তাই বাবা যেতে পারতেন না। তবে মা বলতেন, ‘তোর বাবা প্রতিদিন আমার কাছে তোর সম্পর্কে খবর নেয়।’

লেখাপড়ার ফাঁকে কি অন্য কোনো কাজ করেছেন। মানে পড়ার খরচ, নিজের খরচ চালানোর জন্য?

মারুফা: আমাকে আমার মা কোনো কাজ করতে দেননি। আমি যেন লেখাপড়া শেষের আগে কাজ না করি, মা তা–ই চান।

মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার জন্য আলাদা প্রস্তুতি নিতে হয়েছে?

মারুফা: খুলনায় একটি কোচিং সেন্টারে তিন মাস পড়েছি। কোচিং ব্যয় ১৮ হাজার টাকা হলেও আমার কাছ থেকে নিয়েছিল ১০ হাজার টাকা। সেখানে থাকা, খাওয়াসহ অন্যান্য ব্যয় মেটানোর জন্য মা একটি সমিতির কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন।

মেডিকেলে পড়ার তো খরচ রয়েছে।

মারুফা: আমার মা–বাবার পক্ষে এ ব্যয় বহন করা অসম্ভব। সবার সহযোগিতা ছাড়া আমি এগিয়ে যেতে পারব না। আমি সবার সহযোগিতা চাই।

মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার পর প্রথম আলোয় আপনাকে নিয়ে প্রতিবেদন করেছে। কেউ খোঁজখবর নিচ্ছে?

মারুফা: মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার পর অনেকেই খোঁজখবর নিচ্ছেন। আমাকে দেখতে আসছেন। প্রথম আলোর প্রতিবেদন প্রকাশের পর অনেকেই আমার সঙ্গে কথা বলছেন, খোঁজখবর নিচ্ছেন। আমাকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন। এর মধ্যে গতকাল শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী ও র‌্যাব-৬-এর পক্ষে সাতক্ষীরা ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার ইশতিয়াক হোসাইন নগদ অর্থ দিয়েছেন।

প্রথম আলো: লেখাপড়া শেষে কী করতে চান?

মারুফা: আমি সবার আগে আমার মা-বাবার মুখে হাসি ফোটাতে চাই। তাঁদের হাসিমুখ দেখতে চাই সব সময়। পাশাপাশি একজন ভালো মানুষ হতে চাই। একজন মানবিক চিকিৎসক হয়ে গরিব, অসহায় মানুষের সেবা দিতে চাই।

মারুফার পাশে দাঁড়াল র‌্যাব

গত শুক্রবার প্রথম আলোর অনলাইন ও গতকাল শনিবার প্রথম আলো পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর মারুফার পাশে দাঁড়িয়েছে র‌্যাব। গতকাল র‌্যাব-৬–এর সাতক্ষীরা ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার ইশতিয়াক হোসাইন বাড়িতে গিয়ে মারুফার হাতে মেডিকেল কলেজে ভর্তির খরচ বাবদ নগদ অর্থ তুলে দেন।