default-image

প্রায় চার বছর আগে যে রাজনৈতিক কারণে তাঁর প্রতি তামাম বাংলাদেশির অভিমানের সৃষ্টি, সফরের শুরুতেই তা এক লহমায় ঘুচিয়ে দিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দুই বাংলার সাহিত্য, শিল্প ও বিনোদনজগতের নক্ষত্র সমাবেশে গতকাল শুক্রবার তিনি জানিয়ে দিলেন, সীমান্ত বিল পাস হতে চলেছে। আর তিস্তা চুক্তি নিয়ে তাঁর ওপর বাংলাদেশ যেন আস্থা রাখে। মমতা জানিয়ে দেন, ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে সম্পর্কের সেতুবন্ধে তিনি কাঠবিড়ালির ভূমিকা পালন করবেন।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অতিথি হিসেবে বাংলাদেশ সফরে এসে বিশেষত তিস্তা নিয়ে মমতা কোন বার্তা দেন, সেদিকেই ছিল সবার নজর। বৃহস্পতিবার রাতে কলকাতা থেকে ঢাকায় এসে সে বিষয়ে তিনি কোনো আভাস দেননি। কিন্তু শুক্রবারের প্রথম বৈঠকেই তিনি সেই আগ্রহের নিরসন ঘটালেন।
প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের এই অনুষ্ঠানে মমতা কোনো রকম হেঁয়ালি না রেখেই বলে দিলেন, ‘কিছুটা ভুল-বোঝাবুঝি হয়েছিল। অনেকে অনেক রকমভাবে খেলা করে তো? কিন্তু আপনারা নিশ্চিত থাকুন, সেতুবন্ধের কাজটা আমি করেই যাব।’ এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই একনিঃশ্বাসে তিনি বললেন, ‘সীমান্ত বিল নিয়ে সমস্যা হয়েছিল। তার সমাধান হয়ে গেছে। ভারত সরকার বিল আনছে। সংসদীয় কমিটির বৈঠকে সায় দিয়েছি। একটা বড় কাজ হয়ে যাচ্ছে।’ এর পরেই তিনি তিস্তা প্রসঙ্গ তোলেন। বলেন, ‘আপনারা তিস্তা নিয়ে জানতে চান। আমি বলি, আপনারা আমার ওপর আস্থা রাখুন। আমাদের কিছু সমস্যা আছে। আপনাদেরও কিছু সমস্যা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আমার কথা হবে। এটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করবেন না।’
ব্যাপক হাততালির মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘গঙ্গা, পদ্মা, মেঘনা নিয়ে আমাদের ভাগাভাগি করতে দেব না। এবারের সফরেও বাধা ছিল। ব্যাগ গোছানো পর্যন্ত চিন্তা ছিল। কিন্তু সব বাধা ভেঙে যখন এসেছি, তখন সব বাঁধন ঘুচে যাবে।’ তাঁর এই সফরের প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে মমতা বলেন, দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটা এক নতুন সূত্রপাত।
গতকাল দুপুরে দুই ঘণ্টার ‘বৈঠকী বাংলা’ এককথায় ছিল চাঁদের হাট। মুখ্যমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে আসা অভিনেতা প্রসেনজিৎ, দেব, মুনমুন সেন; চিত্র পরিচালক গৌতম ঘোষ; গায়ক নচিকেতা, ইন্দ্রনীল সেন; দুই মন্ত্রী ব্রাত্য বসু ও ফিরহাদ হাকিমদের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের অধ্যাপক আনিসুজ্জামান; সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর; গায়িকা রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমীন, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা; অভিনেতা ফেরদৌস; সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, আলী যাকের প্রমুখ। ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার পঙ্কজ সরনও উপস্থিত ছিলেন।
গুরুগম্ভীর পরিবেশের মধ্যে না গিয়ে মমতা শুরু থেকেই এই অনুষ্ঠানকে খোলামেলা চরিত্র দিয়ে দেন গানে ও কবিতায়। নিজে যেমন আবৃত্তি করেন নিজেরই লেখা কবিতা, তেমনই বন্যা, সাবিনা, নচিকেতা, ইন্দ্রনীলদের দিয়ে খোলা গলায় গান গাওয়ান এবং সবাইকে অনুরোধ করেন সম্পর্কের আরও উন্নতিতে কী কী করা দরকার তা জানাতে। এ সময় রামেন্দু মজুমদার সম্পর্কের ভুল-বোঝাবুঝি ও টানাপোড়েনের উল্লেখ করে বলেন, এই সফর সেই অপূর্ণ চাহিদাগুলো মেটাতে পারবে কি না, সেদিকেই দেশবাসী তাকিয়ে রয়েছেন। একে একে উঠে আসে ভিসা জটিলতা, বাংলাদেশি টিভি চ্যানেল ভারতে দেখতে না পাওয়ার কথা। নাসির উদ্দীন ইউসুফ দুই বাংলার চলচ্চিত্রের সংকটের কথা উল্লেখ করে বলেন, এর বিনিময় হওয়া জরুরি। আলী যাকের মুখ্যমন্ত্রীকে দুই দেশের সম্পর্কের সেতুবন্ধে কাঠবিড়ালির ভূমিকা পালনের প্রস্তাব দেন।
মমতা এসব চাহিদার উত্তর দিতে গিয়েই তিস্তা প্রসঙ্গ টেনে আনেন। সেই সঙ্গে একে একে সব চাহিদারই জবাব দেন। বাংলাদেশি টিভি দেখার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ব্যবসায়িকভাবে যে কেউ দেখাতে পারেন। কোনো বাধা নেই। কলকাতায় রাজারহাটে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ধরে রাখতে একটি ভবন গড়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে তিনি জমি দিতে প্রস্তুত বলে জানিয়ে দেন। সিনেমার জট খুলতে তাঁর প্রস্তাব, আসাদুজ্জামান নূরকে চেয়ারম্যান করে ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠিত হোক। সেই কমিটিতে পশ্চিমবঙ্গের দিক থেকে গৌতম ঘোষ, প্রসেনজিৎ ও ভেঙ্কটেশ ফিল্মসের কর্ণধার শ্রীকান্ত মোহতাকে তিনি মনোনীত করেন।
সংস্কৃতিমন্ত্রী প্রথম আলোকে বলেন, এ বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলে তারপর এগোবেন। মমতা দুই বাংলার চলচ্চিত্র ও সাংস্কৃতিক উৎসব শুরু করার প্রস্তাবও দেন। তাঁর নিজের লেখা ৫৩টি বইসহ ৫০০ বই বাংলাদেশ বইমেলা কর্তৃপক্ষকে উপহার দেওয়ার কথাও জানান। আরও বলেন, কাজী নজরুল ইসলামের নামে বর্ধমান জেলার অন্ডালে নির্মাণাধীন বিমানবন্দরের নাম রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর নামে একটি চেয়ার করার কথাও জানান তিনি। এই চেয়ারের উদ্বোধনের জন্য তিনি শেখ হাসিনাকে অনুরোধ জানাবেন। আজ দুপুরে হাসিনার সঙ্গে মমতার সাক্ষাৎ হওয়ার কথা।
এর আগে ১৯৯৮ সালে মমতা প্রথম যখন বাংলাদেশে এসেছিলেন যুব উৎসবে যোগ দিতে, তখনো শেখ হাসিনাই ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। এবারও তাই।
বঙ্গবন্ধুর প্রতি মমতার শ্রদ্ধা: মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গতকাল বিকেলে ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে যান এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় তিনি বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে কিছু সময় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। পরে তিনি বঙ্গবন্ধু জাদুঘরের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখেন।
রাতে খুদে বার্তা আদান-প্রদানের সাইট টুইটারে মমতা লেখেন, বঙ্গবন্ধু সারা বিশ্বে বাংলার জন্য গৌরব বয়ে আনেন। তিনিই ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল স্থপতি। তাঁর স্মৃতির প্রতি তিনি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করেন।
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে মমতার সাক্ষাৎ: বার্তা সংস্থা বাসস জানায়, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গতকাল সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। রাষ্ট্রপতি আশা প্রকাশ করেন, মমতার এই সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান অনিষ্পন্ন বিষয়গুলোর সমাধান হবে।
বৈঠক শেষে রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব ইহসানুল করিম জানান, দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক সফর বিনিময় সম্পর্কে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, একসঙ্গে বসে তাঁরা সংস্কৃতিবিষয়ক সমস্যাগুলোর সমাধান করবেন। তিনি দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক উৎসব আয়োজনের ব্যাপারে তাঁর পরিকল্পনার বিষয়টি রাষ্ট্রপতিকে জানান।
মমতা বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে পর্যটনের ক্ষেত্রে সম্পর্ক জোরদারের সুযোগ রয়েছে। আগরতলা-ঢাকা-কলকাতা সরাসরি বাস সার্ভিস এবং বাংলাদেশের খুলনা থেকে ভারতের কলকাতার মধ্যে ট্রেন সার্ভিস চালুর ব্যাপারে তাঁর আগ্রহের বিষয়টি রাষ্ট্রপতি হামিদকে অবহিত করেন। তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকার কলকাতায় ‘নজরুল তীর্থ’ এবং আসানসোলে কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে।
এসব উদ্যোগ নেওয়ায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ধন্যবাদ জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, এগুলো দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও গভীর করবে।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন