>
  • কালোবাজারি ঠেকাতে এনআইডি দেখে টিকিট বিক্রি
  • যাত্রীরা বিরক্ত
  • অনেকে জানেনই না।
  • চট্টগ্রাম স্টেশনে গড়ে প্রতিদিন ৫৬ হাজার টাকা আয় কমেছে।
  • ঢাকা স্টেশনে প্রতিদিন গড়ে ৩১ হাজার টাকা আয় কমেছে।
  • রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, টিকিট বিক্রি ও তল্লাশির সঙ্গে যুক্ত জনবল না বাড়িয়ে এনআইডি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত সঠিক নয়।

কোনো প্রস্তুতি ছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) দেখানোর মাধ্যমে টিকিট বিক্রি শুরু হওয়ায় একটি ট্রেনের আয় কমতে শুরু করেছে। ঢাকা-চট্টগ্রামের বিরতিহীন সোনার বাংলা ট্রেনে এনআইডি প্রদর্শনের মাধ্যমে টিকিট কেনার নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় ১৫ জানুয়ারি থেকে। টিকিটের কালোবাজারি ঠেকানোই এর লক্ষ্য বলে জানিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

তবে রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, টিকিট বিক্রি ও তল্লাশির সঙ্গে যুক্ত জনবল না বাড়িয়ে এনআইডি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত সঠিক নয়। এনআইডি যাচাইয়ের সফটওয়্যার তৈরি না করা পর্যন্ত নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকরও সম্ভব নয়। অর্থাৎ এনআইডি যাচাই করার জনবল লাগবে।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর করায় ট্রেনটির চট্টগ্রাম স্টেশনে গড়ে প্রতিদিন ৫৬ হাজার টাকা এবং ঢাকা স্টেশনে ৩১ হাজার টাকা করে রাজস্ব আয় কমেছে।

পূর্বাঞ্চলের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, গণপরিবহনে এনআইডি ব্যবহার পার্শ্ববর্তী দেশেও নেই। তবে বিদেশিরা পাসপোর্ট দেখিয়ে ওই দেশে সংরক্ষিত আসনের আগাম টিকিট কেনেন। এ ছাড়া বাংলাদেশে এনআইডি ব্যবহার করতে সাধারণ মানুষ অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, টিকিট বিক্রি এবং তল্লাশির সঙ্গে কাউন্টারে বুকিং সহকারী, চলন্ত ট্রেনে ভ্রাম্যমাণ টিকিট পরীক্ষক (টিটিই) এবং স্টেশনের ফটকে টিকিট সংগ্রাহক (টিসি) যুক্ত। কেউ বিনা টিকিটে ভ্রমণ করলে টিটিই এবং টিসি তা শনাক্তের মাধ্যমের কার্যকর ব্যবস্থা নেন। মাঝেমধ্যে চলন্ত ট্রেন বা নির্দিষ্ট স্টেশনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা হয়। আদালত বিনা টিকিটের যাত্রীদের কারাদণ্ড বা জরিমানা করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পূর্বাঞ্চলে বুকিং সহকারী ৩০৮ জনের পরিবর্তে কর্মরত আছেন মাত্র ১৮৯ জন। টিকিট বিক্রি করতে তাঁরা হিমশিম খাচ্ছেন। এনআইডি পরীক্ষা করার সময় তাঁদের নেই। কালোবাজারিরা একটি এনআইডি ব্যবহার করে দিনে একাধিকবার টিকিট কিনলে তা যাচাই করার সুযোগ নেই। ফলে ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টেশনে একই পরিচয়পত্র ব্যবহার করে কালোবাজারিরা ৫ থেকে ৭ বার পর্যন্ত টিকিট সংগ্রহ করে চড়া দামে বিক্রি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

চলন্ত ট্রেনে যাত্রীদের টিকিট পরীক্ষা করতে টিটিই যেখানে ১৮০ জন প্রয়োজন, সেখানে কর্মরত আছেন মাত্র ৮৫ জন। এতে অনেক আন্তনগর ট্রেন চলছে টিটিই ছাড়া। এ ছাড়া পর্যাপ্ত টিকিট সংগ্রাহক বা টিসি নেই। পূর্বাঞ্চলে ১০২টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৪৮ জন।

রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা আক্ষেপ করে বলেন, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ না দিয়ে যেমন সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করা হয়েছে, তেমনি এনআইডি যাচাইয়ের সফটওয়্যার না বসিয়ে এবং পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ না দিয়ে টিকিট বিক্রির নতুন সিদ্ধান্ত চালু করা হয়েছে। এতে রেলের রাজস্ব আয়ে ধস নামবে।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সোনার বাংলা দেশের মধ্যে স্মার্ট ট্রেন। শিক্ষিত লোকেরা এটিতে ভ্রমণ করেন। এ জন্য আমরা পাইলট প্রকল্প হিসেবে ট্রেনটি বেছে নিয়েছি। নতুন পদ্ধতি সবেমাত্র চালু হলো। যদি রেলের আয় কমে, তাহলে পুরোনো পদ্ধতিতে চলে যাব।’

এদিকে কালোবাজারি বন্ধে ট্রেনের টিকিট কেনায় এনআইডি বা জন্মনিবন্ধন নম্বর বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনার কথা গত রোববার জানিয়েছেন নতুন রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম। তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের সোনার বাংলা এক্সপ্রেসের টিকিট কেনার নতুন পদ্ধতি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করেছে রেলওয়ে।

আয় কমার চিত্র

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম স্টেশনে ১০ থেকে ১৪ জানুয়ারি পাঁচ দিনে গড়ে ঢাকাগামী সোনার বাংলার টিকিট বিক্রি হয় ৫ লাখ ৬১ হাজার ১৫২ টাকার। ১৫ জানুয়ারি থেকে এনআইডি কার্ড দেখিয়ে টিকিট বিক্রি শুরু হয়। ওই দিন চট্টগ্রামে ট্রেনটির সাপ্তাহিক বিরতি ছিল। ১৬ থেকে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত ট্রেনটির গড় টিকিট বিক্রি হয়েছে ৫ লাখ ৫ হাজার ৬৯২ টাকা। অর্থাৎ এনআইডি ব্যবহারের পর চট্টগ্রাম স্টেশনে ট্রেনটির গড় আয় কমেছে প্রায় ৫৬ হাজার টাকা।

ঢাকা স্টেশনে ১১ থেকে ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত চট্টগ্রামগামী সোনার বাংলার টিকিটের গড় বিক্রি হয় ৫ লাখ ৪ হাজার ৪৮৫ টাকা। ঢাকা থেকে ১৬ জানুয়ারি ট্রেনটি সাপ্তাহিক বিরতি ছিল। ১৫ জানুয়ারি এবং ১৭ থেকে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত ৫ দিনে গড় টিকিট বিক্রি হয় ৪ লাখ ৭৩ হাজার ৫২২ টাকা। অর্থাৎ ঢাকায় ট্রেনটির দৈনিক গড় আয় কমেছে ৩১ হাজার টাকা।

গত রোববার চট্টগ্রাম স্টেশন ঘুরে সোনার বাংলা টিকিটের জন্য দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। কিন্তু এনআইডি প্রদর্শনের বিষয়টি অনেকেই জানতেন না। ফলে টিকিট না নিয়ে অনেকে হতাশ হয়ে ফিরে যান।

রোববার চট্টগ্রাম স্টেশনে কথা হয় ঢাকার পল্টনের বাসিন্দা সাব্বির আহমেদের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, স্টেশনে এসে জানতে পারলেন, এনআইডি ছাড়া টিকিট বিক্রি হবে না। টিকিট থাকা সত্ত্বেও তিনি খালি হাতে ফিরে যেতে বাধ্য হন।

কালোবাজারি ঠেকানোর পদ্ধতি

প্রয়াত রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে নিয়ে সমালোচনা থাকলেও তিনি কালোবাজারি কমিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। ২০১২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি ট্রেনের আগাম টিকিট ১০ দিনের বদলে ৩ দিন আগে বিক্রির নিয়ম চালু করেন। এ ছাড়া ই-টিকিটিং বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে টিকিট বিক্রি তিনি চালু করেন। তখনো এনআইডি ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে কথা হলেও সমস্যা হতে পারে ভেবে তিনি পিছিয়ে যান।

রেলওয়ের কর্মকর্তা ও যাত্রীরা জানিয়েছেন, আগাম টিকিট ১০ দিনের বদলে ৩ দিন আগে বিক্রির নিয়ম চালু হওয়ায় কালোবাজারিদের উৎপাত কমে গিয়েছিল। কাউন্টারে সহজে টিকিট পেয়েছিলেন যাত্রীরা। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে বিদায়ী মন্ত্রীর আমলে আগাম টিকিট বিক্রি ৩ দিনের পরিবর্তে আবার ১০ দিন করা হয়। এতে কালোবাজারিদের দাপট বেড়ে যায়।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0