default-image

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয় পেয়ে আবারও ক্ষমতায় বসতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ। ২০২৩ সাল পর্যন্ত মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি গড়ে প্রায় ৭ দশমিক ৭ শতাংশ থাকবে। তবে এই সময়কালে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মধ্যে থাকবে। আশঙ্কা আছে জঙ্গি হামলারও।

লন্ডনভিত্তিক ‘ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’–এর (ইআইইউ) বাংলাদেশবিষয়ক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। ৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিষয়ে প্রকাশিত সর্বশেষ কান্ট্রি ব্রিফিংয়ে ইকোনমিস্ট গ্রুপের এই গবেষণা উইংয়ের পক্ষ থেকে ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর সময়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অবস্থা কেমন, তার একটি বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। ইকোনমিস্ট গ্রুপের এই গবেষণা ও বিশ্লেষণ বিভাগের প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৪৬ সালে। ৭২ বছর ধরে ইআইইউ নামে পরিচিত বিভাগটি বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশ, সংস্থা ও বিষয়ভিত্তিক গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে।

ইআইইউ ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের পূর্বাভাষ দিলেও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের বর্তমান মেয়াদের বাকি সময় এবং আগামী সরকারের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ঝুঁকির প্রসঙ্গটি উল্লেখ করেছে। নির্বাচনী প্রচারের সময় জঙ্গি হামলাকে এ মুহূর্তে সবচেয়ে আশু ঝুঁকি বলে মনে করা হচ্ছে। জঙ্গি হামলার সাম্প্রতিক অপচেষ্টা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সফলভাবে রুখে দিতে সক্ষম হলেও যেকোনো ধরনের সন্ত্রাসী ঘটনা বেড়ে যাওয়া ব্যাপকতর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা উসকে দিতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গত কয়েক বছর ভালো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এগিয়েছে বাংলাদেশ। ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বড় জয় পাবে। নির্বাচনের পর দেশে রাজনৈতিক সংঘাত চলতে থাকবে। জঙ্গি হামলা, সামাজিক অসন্তোষ এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রতিবাদ থাকবে অব্যাহত। আর এর ফলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আগামী দিনগুলোয় বাড়বে। ইআইইউর প্রতিবেদনে আশঙ্কা করা হয়েছে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্য বাংলাদেশে থাকা বিদেশিদের ওপর হামলা-আক্রমণ বাড়তে পারে।

জিডিপি প্রবৃদ্ধি

ইআইইউর পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা আগামী পাঁচ বছরও অব্যাহত থাকবে। এই সময়ের মধ্য জিডিপি প্রবৃদ্ধি গড়ে ৭ দশমিক ৭ হারে হবে। এ প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও ব্যক্তির ভোগ বৃদ্ধি। বিভিন্ন পণ্য ও সেবা আমদানির পরও প্রবৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত থাকবে।

আগামী পাঁচ বছরের অর্থনীতির পূর্বাভাস দিতে গিয়ে ইআইইউ বলেছে, অবকাঠামো প্রকল্পে খরচ বেড়ে যাওয়া আর করের ব্যবহারের ধীরগতির ফলে ২০১৮/১৯-২২/২৩ অর্থবছরের বাজেটে গড়ে জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) ৪ দশমিক ৪ শতাংশ হারে ঘাটতি দেখা দিতে পারে, যা আগের পাঁচ বছরের চেয়ে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি।

ইআইইউর মতে, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও ভোগ বৃদ্ধির ফলে ২০১৮/১৯-২২/২৩ অর্থবছরের জিডিপি হবে গড়ে ৭ দশমিক ৭ শতাংশ। পণ্য ও সেবার আমদানি বাড়া সত্ত্বেও এ সময়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে চাঙাভাব অব্যাহত থাকবে।

default-image

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা

একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলেও ইআইইউয়ের প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, ভবিষ্যতে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা না কমে আরও বাড়বে। জাতীয় নিরাপত্তা ব্যাহত করতে জঙ্গি সংগঠনগুলো দেশের বড় শহরকেও লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে।

অর্থ আত্মসাতের মামলায় পাঁচ বছরের সাজা পেয়ে ফেব্রুয়ারি মাস থেকে কারাগারে আছেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এরপরও ২০১৪ সালে নির্বাচন বয়কট করা বাংলাদেশের অঘোষিত বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে নির্বাচনে অংশ নিলেও খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে দলটি সোচ্চার। এ দাবি সহিংসতায় রূপ নিতে পারে। আর আওয়ামী লীগ-বিএনপির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অবস্থাটি আগামী নির্বাচনের পরেও অব্যাহত থাকবে। আর এর ফলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আগামী দিনগুলোতে বাড়বে।

সামাজিক অস্থিরতা এবং বিভিন্ন পক্ষের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকবে। এ বছরের জুলাইয়ে রাজধানী ঢাকায় স্কুলশিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে কয়েক দিন ধরে আন্দোলনের কথা তুলে ধরে ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এরপরই সরকার দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নিরাপদ সড়ক আইন সংসদে পাস করে। ২০১৯ থেকে ২০২৩ আগামী পাঁচ বছরেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ ধরনের ঘন ঘন বিক্ষোভ রাজনীতির মাঠে বড় ঝুঁকি হয়ে থাকবে।

রোহিঙ্গা সংকট

আগামী বছরগুলোতেও মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের নিয়ে সমস্যায় পড়বে বাংলাদেশ। আর এ সংকট আগামী কয়েক বছর অব্যাহত থাকবে। রোহিঙ্গা ইস্যুর কারণে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের এই টানাপোড়েন আরও চলবে। আর এ সংকটকে কেন্দ্র করে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কোন্নয়নের আশু কোনো সম্ভাবনাও ইআইইউ দেখছে না।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যে পাঁচ বছরের পূর্বাভাস ইআইইউ দিচ্ছে, তার প্রথম ভাগে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিষয়টি বড় একটি সমস্যা হিসেবেই থেকে যাবে বলে তারা মনে করছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দুই প্রতিবেশী ভারত ও চীন সব সময় প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। ২০১৯-২৩ পর্যন্ত সময়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও জোরদার হবে। তবে আসামের নাগরিকপঞ্জির ঘটনায় বাংলাদেশে কিছুটা অস্থিরতা বাড়বে। অমীমাংসিত তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি স্বভাবতই পেছাবে। কারণ, আগামী বছরের মাঝামাঝি ভারতে নির্বাচন। এর আগে বিষয়টির সমাধান হচ্ছে না। এরপরই ভারত ও বাংলাদেশ এ বিষয়ে একটি সমাধানে পৌঁছাতে পারে।

ভবিষ্যতে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক অব্যাহত থাকবে। এই সময়ের মধ্য চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অবকাঠামোগত প্রকল্প বাড়বে। আওয়ামী লীগ আগামী নির্বাচনে জয় পেলে আগামী দিনগুলোয় বঙ্গোপসাগরের তীরে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ প্রতিবেশী ভারত, চীন ও জাপানের কাছ থেকে আরও অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করে নিতে পারবে বলে ইআইইউয়ের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে লাভবান হবে বাংলাদেশ। আর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে বাংলাদেশ সমস্যায় পড়বে। তবে তেলসমৃদ্ধ এসব দেশে বাংলাদেশের বিপুল জনশক্তি থাকায় প্রবাসী আয় বাড়বে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0