আ.লীগের সমস্যা মন্ত্রী ও সাংসদের পরোক্ষ সমর্থন

বিজ্ঞাপন
default-image

দলীয় কোন্দল ও মেরুকরণের রাজনীতির ফসল হচ্ছে পৌরসভায় আওয়ামী লীগের বিপুলসংখ্যায় বিদ্রোহী প্রার্থী। মন্ত্রী, সাংসদ ও কেন্দ্রীয় অনেক নেতা সরাসরি না হলেও পরোক্ষভাবে বিদ্রোহীদের সমর্থন দিচ্ছেন। এ জন্যই চাপ, ভয় ও হুঁশিয়ারির পরও ৭৬টি পৌরসভায় ৮৭ জন বিদ্রোহী প্রার্থী রয়ে গেছেন।
আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল একাধিক কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল নেতা এবং পৌর নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলে এমনই অভিমত পাওয়া গেছে। নেতারা বলেন, চাপের পরও বিদ্রোহী হিসেবে থেকে যাওয়ার কারণ তিনটি। মূল কারণ হচ্ছে মন্ত্রী, সাংসদ ও নেতাদের আশকারা। এর বাইরের দুটি কারণ হচ্ছে দলীয় কোন্দল ও ভুল প্রার্থী বাছাই।
আওয়ামী লীগের দুজন দায়িত্বশীল কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, পৌরসভায় দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করে নিজ পছন্দের বা প্রভাববলয়ের বাইরের কেউ মেয়র হবেন—এটা অনেক মন্ত্রী-সাংসদ ও কেন্দ্রীয় নেতা মেনে নিতে পারছেন না।
ময়মনসিংহের ত্রিশালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী উপজেলা যুবলীগের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মতিন সরকারের ছেলে। কিন্তু বর্তমান মেয়র ও উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি এ বি এম আনিসুজ্জামান বিদ্রোহী হিসেবে রয়ে গেছেন।
সূত্র জানায়, ময়মনসিংহ জেলা সভাপতি ও ধর্মমন্ত্রী মতিউর রহমানের সঙ্গে মতিন সরকারের দ্বন্দ্ব রয়েছে। জেলা যুবলীগের গ্রুপিংয়েও আনিস মন্ত্রীর বলয়ের লোক হিসেবে পরিচিত। ফলে তিনি পরোক্ষভাবে মতিউর রহমান অনুসারীদের সমর্থন পাচ্ছেন বলে আলোচনা আছে।
মতিন সরকার বলেন, তাঁর ছেলে যোগ্য হিসেবে দলীয় প্রতীক পেয়েছেন। কেউ কেউ বিদ্রোহীকে ইন্ধন দিতে পারেন। তবে ভোটাররা দলীয় প্রার্থীকেই ভোট দেবেন।
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও পৌর মেয়র পদপ্রার্থী মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য ওবায়দুল কাদের প্রথম আলোকে বলেন, দল করলে দলীয় শৃঙ্খলা মানতে হবে। অনেকেই হয়তো কঠোর অবস্থানটা বুঝতে পারছেন না, এ জন্যই প্রার্থী থেকে গেছেন, কিন্তু তাঁদের দলীয় শাস্তি পেতেই হবে। আর মন্ত্রী-সাংসদকে নির্বাচন কমিশনের ও দলের আচরণবিধি মেনে চলতে হবে। কেউ বিদ্রোহীদের ইন্ধন দিলে ধরা পড়ে যাবেন, চিহ্নিত হয়ে পড়বেন। তালিকায় নাম উঠে যাবে।
অনেক পৌরসভায় স্থানীয় সাংসদের পছন্দের বা আত্মীয়স্বজন দলের মনোনয়ন পেয়েছেন। ওই সব পৌরসভায় সাংসদের সঙ্গে তৃণমূলের বা অন্য সাংসদের দ্বন্দ্বের কারণে বিদ্রোহী প্রার্থী উৎসাহ পেয়েছেন। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন আড়াইহাজারের সাংসদ নজরুল ইসলামের বোনজামাই আবু তাহের ফজলে রাব্বী। পৌর আওয়ামী লীগে তাঁর কোনো পদ নেই। ওই পৌরসভার বর্তমান মেয়র সাদেকুর রহমান আওয়ামী লীগের লোক বলে পরিচিত। তবে তাঁরও পদ নেই। তিনি স্বতন্ত্র হিসেবে দাঁড়িয়েছেন।
স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ সূত্র জানায়, নারায়ণগঞ্জের আরেক সাংসদ শামীম ওসমানের সঙ্গে নজরুল ইসলামের দ্বন্দ্ব রয়েছে। গত অক্টোবরে শামীম ওসমান সোনারগাঁয়ে গিয়ে এক জনসভায় সাদেকুর রহমানকে সমর্থন দেওয়ার কথা জানান। সোনারগাঁয়ের সাংসদ জাতীয় পার্টির লিয়াকত হোসেন। তাঁরও পরোক্ষ সমর্থন সাদেকুরের পক্ষে।
জানতে চাইলে সাংসদ নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, সাদেকুর বিএনপির লোক। শামীম ওসমান ও সাংসদ লিয়াকত হোসেন তাঁকে নামিয়েছিলেন, কিন্তু এখন সবাই দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
অবশ্য শামীম ওসমান বলেন, সাদেকুর রহমান ভালো মানুষ। যোগ্য ব্যক্তি। একটা অনুষ্ঠানে তাঁর প্রশংসা করেছিলেন। সোনারগাঁর নির্বাচন নিয়ে তিনি মাথা ঘামাচ্ছেন না। দল যাঁকে প্রার্থী করেছে, তিনিই এখন সবার প্রার্থী।
আওয়ামী লীগের প্রার্থী মনোনয়ন ও বিদ্রোহীদের বশে আনতে তৎপরতা চালানো একজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, বর্তমান মেয়র কিংবা স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী অন্তত ২০ জন প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। ভুল ব্যক্তি দলের মনোনয়ন পাওয়ার কারণে বিদ্রোহীরা শক্তিশালী হয়ে উঠেছেন। উদাহরণ হিসেবে ওই নেতা বরগুনা সদর ও মাদারীপুরের কালকিনির কথা উল্লেখ করেন।
বরগুনা সদর পৌরসভায় বর্তমান মেয়র শাহাদাত হোসেনকে বাদ দিয়ে দলীয় সমর্থন দেওয়া হয়েছে জেলা যুবলীগের সভাপতি কামরুল আহসানকে। এই সিদ্ধান্ত না মেনে শাহাদাত বিদ্রোহী হিসেবে রয়ে গেছেন। তৃণমূল আওয়ামী লীগও তাঁর নাম প্রস্তাব করেছিল।
সূত্র জানায়, কামরুল আহসানের দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের বরিশাল অঞ্চলের দুই নেতার ভূমিকা রয়েছে। তাঁরা পৌর প্রার্থী মনোনয়ন বোর্ডেরও সদস্য। অন্যদিকে স্থানীয় সাংসদ ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর সমর্থন নিয়েই শাহাদাতকে তৃণমূল প্রস্তাব করেছিল। কামরুলকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়ায় সাংসদসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ পরোক্ষভাবে শাহাদাতের পক্ষ নিয়েছে।
মাদারীপুরের কালকিনি পৌরসভায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী এনায়েত হোসেন। তিনি স্থানীয় সাংসদ ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের ঘনিষ্ঠ। তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন আবুল কালাম আজাদ ও মশিউর রহমান। তৃণমূলের প্রস্তাব মেনে আবুল কালাম আজাদকে মনোনয়ন না দেওয়ায় কালকিনি উপজেলা ও পৌর আওয়ামী লীগের নেতারা গণপদত্যাগ করেন। মশিউর রহমান সাবেক মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের প্রার্থী হিসেবে পরিচিত।
এই পৌরসভায় বিএনপির কোনো প্রার্থী নেই। এ জন্য কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ কয়েক দফা বৈঠক করে সুরাহা না করতে পেরে সবার প্রার্থিতা মেনে নিয়েছে।
বিদ্রোহীদের বসে আনতে না পারার বিষয়ে দুজন সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, অনেক প্রার্থীই সম্ভাবনাময়। তাঁদের বিশ্বাস, নির্বাচনে জয়ী হয়ে দলে ভিড়ে পদ-পদবি ফিরে পাবেন। তাই সাময়িক বহিষ্কারের হুমকি কানে তুলছেন না। এ ছাড়া অন্তত ৪০ জন বিদ্রোহী প্রার্থী আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত। কিন্তু দলীয় পদ-পদবি নেই। তাঁরা দলীয় প্রার্থীর ভোট কাটবেন। কিন্তু পদ না থাকায় তাঁদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নেওয়া যাচ্ছে না।
আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে গত রোববার সব বিদ্রোহীকে সাময়িক বহিষ্কার করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এর আগে দলীয় পদধারী বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণ দর্শানোর চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিছু কিছু পৌরসভায় শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহী প্রার্থীকে নিষ্ক্রিয় করে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে নামানোর চেষ্টা অব্যাহত আছে। দলটির একজন জ্যেষ্ঠ নেতা দাবি করেন, শুরুতে দেড় শতাধিক বিদ্রোহী ছিলেন। গত কয়েক দিনে ৯২ জনকে বসানো গেছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন