সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় যাদুকাটা নদ।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় যাদুকাটা নদ।ছবি: আনিস মাহমুদ

যাদুকাটা নদীর বালুমহাল এবার ইজারা হয়নি। তাই সেখানে বালু উত্তোলন বন্ধ থাকার কথা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞাও আছে। কিন্তু এরপরও প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে সেখান থেকে বালু উত্তোলন করা হয়। এই বালু তোলায় সাধারণ শ্রমিকদের পেছনে রয়েছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা।

এই নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সংবাদ সংগ্রহ ও ছবি তুলতে গিয়ে সোমবার হামলার শিকার হয়েছেন দৈনিক সংবাদ পত্রিকার তাহিরপুর উপজেলা প্রতিনিধি কামাল হোসেন। তাঁকে এলোপাতাড়ি মারধরের পর একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। কেড়ে নেওয়া হয় তাঁর মোটরসাইকেল, ক্যামেরা ও মুঠোফোন। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তোলপাড় শুরু হয়। কামাল বর্তমানে সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের ঘাগটিয়া গ্রামের পাশে যাদুকাটা নদীতে সোমবার দুপুরে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় কামাল হোসেন পাঁচজনের নামোল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও পাঁচ-ছয়জনকে আসামি করে থানায় মামলা করেছেন। পুলিশ এ পর্যন্ত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক দলের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যাদুকাটা নদীর ঘাগটিয়া গ্রাম ও আশাপাশের এলাকা থেকে বালু তোলা হয়। একসময় সাধারণ শ্রমিকেরা ছোট ছোট নৌকা নিয়ে নদী থেকে বালু উত্তোলন করতেন। পরে ব্যবসায়ীরা বেশি লাভের আশায় ‘ড্রেজার’ ও ‘বোমা মেশিন’ নিয়ে আসেন। ১০ বছর ধরে এখানে ড্রেজার ও বোমা মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে এলাকার কয়েকটি গ্রাম হুমকির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে ক্ষতি হচ্ছে প্রকৃতি ও পরিবেশের। এলাকাবাসী প্রথমে এসবের বিরুদ্ধে আন্দোলন করলেও এখন বেশি লাভের আশায় গ্রামের কিছু লোক বালু তোলায় যুক্ত হয়ে পড়েছেন। বিভিন্ন সময় প্রশাসন এসব খননযন্ত্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালালেও তা বন্ধ হয়নি। এই বালু তোলায় স্থানীয় প্রভাবশালীরা যুক্ত। তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয়ও রয়েছে।

বর্তমানে যাদুকাটা নদীতে বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ। তবে এই নদীর ওপর নির্ভরশীল সাধারণ শ্রমিকেরা নানাভাবে বালু উত্তোলন করছেন। তাঁদের পেছনে থেকে এসব নিয়ন্ত্রণ করছেন ঘাগটিয়া গ্রামের বাসিন্দা স্থানীয় বাদাঘাট ইউনিয়ন শ্রমিক লীগের সাবেক সদস্যসচিব মুশাহিদ তালুকদার, স্থানীয় ইউপি সদস্য ও বাদাঘাট ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মনির উদ্দিন, বাদাঘাট ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আবু সাইদ, একই গ্রামের বাসিন্দা মাহমদু আলী, রইস উদ্দিন, দীন ইসলামসহ আরও কয়েকজন। মুশাহিদ তালুকদার তাহিরপুর উপজেলার আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মোশারফ হোসেন তালুকদারের ছোট ভাই। তাঁদের মধ্যে সাংবাদিক কামাল হোসেনকে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতনের ঘটনায় দায়ের করা মামলার এহজারভুক্ত আসামি মুশাহিদ তালুকদার, মনির উদ্দিন, মাহমদু আলী, রইস উদ্দিন ও দীন ইসলাম। পুলিশ রইস উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করেছে। অন্যার পলাতক।

বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে তাহিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সহভাপতি মোশারফ হোসেন তালুকদার জানান, এখন নদীতে বালু তোলা বন্ধ। তবে গরিব শ্রমিকেরা পেটের তাগিদে লুকিয়ে কিছু বালু-পাথর তোলেন। এটাই তাঁদের জীবিকার একমাত্র পথ। তিনি বলেন,‘আমার ছোট ভাই মুশাহিদ বালু-পাথরের ব্যবসা করে। কিন্তু সাংবাদিককে মারধরে আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। গ্রাম্য প্রতিহিংসা থেকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের লোকজন অযথাই আমার পরিবারকে এসবের সঙ্গে জড়াচ্ছে।’ উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি ঘাগটিয়া গ্রামের বাসিন্দা আবু সাইদের সঙ্গে কথা বলার জন্য তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।

আমরা ১৫-২০ বছর ধরে এসব নিয়ে কথা বলছি। কিন্তু কোনো ফল হচ্ছে না। এই নদীতে হাজার হাজার শ্রমিক রয়েছেন, যাঁরা বালু-পাথর তুলেই জীবিকা নির্বাহ করেন। তাঁরা যদি হাতে বালু-পাথর উত্তোলন করেন, তাতে কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা হলো ড্রেজার বা বোমা মেশিনে।
কাসমির রেজা, পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি

তাহিরপুর উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসন বিভিন্ন সময় অভিযান চালায়। কিন্তু যাঁরা ধরা পড়েন, তাঁরা সাধারণ শ্রমিক। কিন্তু পেছনে থেকে যাঁরা এসব করান, তাঁরা হয় রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় আছেন, নাহয় স্থানীয় প্রভাবশালী। তাই তাঁদের কখনোই কোনো কিছুই হয় না। যে কারণে এসব বন্ধ হচ্ছে না।

এ ব্যাপারে তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পদ্মাসন সিংহ বলেছেন, ‘যাদুকাটা নদীর বালুমহাল এবার ইজারা হয়নি। তাই এখানে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এরপরও আমরা যখন অভিযোগ বা খবর পাই, তখনই অভিযান পরিচালনা করি। বিভিন্ন সময় বালু উত্তোলনে থাকা লোকজনকে জরিমানাও করা হয়েছে।’

ঘাগটিয়া গ্রামের বাসিন্দা পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, ‘আমরা ১৫-২০ বছর ধরে এসব নিয়ে কথা বলছি। কিন্তু কোনো ফল হচ্ছে না। এই নদীতে হাজার হাজার শ্রমিক রয়েছেন, যাঁরা বালু-পাথর তুলেই জীবিকা নির্বাহ করেন। তাঁরা যদি হাতে বালু-পাথর উত্তোলন করেন, তাতে কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা হলো ড্রেজার বা বোমা মেশিনে। আমরা পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে বালু উত্তোলনের পক্ষে। পরিবেশের ক্ষতিকর পদ্ধতিতে যাঁরা এসব কাজ করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন