লতিফুর রহমান স্মরণসভা

ইতিহাসে তাঁর নাম লেখা থাকবে

বিজ্ঞাপন
>

default-image

আইসিসিবি ও এমসিসিআই আয়োজিত সভায় লতিফুর রহমানকে স্মরণ করলেন দেশের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও দেশে-বিদেশে তাঁর গুণগ্রাহীরা।

মুক্ত গণমাধ্যম ছাড়া গণতন্ত্র হয় না। মালিকপক্ষ স্বাধীনতা না দিলে গণমাধ্যম ভীতিহীন ও পক্ষপাতহীন সাংবাদিকতা করতে পারে না। নিজের প্রতিষ্ঠিত দুটি পত্রিকাকে লতিফুর রহমান সেই স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাস লেখা হলে লতিফুর রহমানের নাম সেখানে অবশ্যই থাকবে।

এ বক্তব্য উঠে আসে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমান স্মরণে আয়োজিত এক সভায়। ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স, বাংলাদেশ (আইসিসিবি) ও মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) গতকাল শনিবার অনলাইনে এ সভার আয়োজন করে। 

অনুষ্ঠানে লতিফুর রহমানের পরিবারের সদস্য, দেশের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও দেশ-বিদেশ থেকে তাঁর গুণগ্রাহীরা অংশ নেন। প্রত্যেকেই লতিফুর রহমানকে একজন সৎ, মূল্যবোধসম্পন্ন, দৃঢ়চেতা, দূরদর্শী ও নীতির প্রশ্নে অনড় অসাধারণ মানুষ হিসেবে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি ছোট ছোট ঘটনা তুলে ধরে দেশের প্রতি তাঁর অসম্ভব ভালোবাসা, মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সমর্থন ও অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের কথাও তুলে ধরেন। বলেন, লতিফুর রহমান বাংলাদেশের একজন ‘রোল মডেল’। তরুণদের উচিত তাঁর জীবনী পড়া ও তাঁকে অনুসরণ করা। 

default-image

লতিফুর রহমান ১ জুলাই ৭৫ বছর বয়সে কুমিল্লায় নিজ বাড়িতে মারা যান। তিনি ছিলেন এমসিসিআইয়ের সাতবারের সভাপতি ও আইসিসি বাংলাদেশের সহসভাপতি। তাঁর স্মরণে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন এমসিসিআইয়ের সভাপতি নিহাদ কবির। অনুষ্ঠানের শুরুতে লতিফুর রহমানকে স্মরণ করে আইসিসিবির সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, তিনি ছিলেন ন্যায়নীতির প্রশ্নে আপসহীন, যা অনেক সময় তাঁর নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধেও যেত।

লতিফুর রহমানের বড় মেয়ে সিমিন হোসেন বলেন, লতিফুর রহমান সব সময় চাইতেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যাক। তিনি মনে করতেন, দেশকে এগিয়ে নিতে সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এমসিসিআইয়ের একটি লাউঞ্জের নামকরণ লতিফুর রহমানের নামে রাখায় সংগঠনটির পর্ষদকে ধন্যবাদ জানান সিমিন হোসেন। 

এসিআইয়ের চেয়ারম্যান এম আনিস উদ দৌলা বলেন, লতিফুর রহমানের মতো একজন বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। আবার তাঁকে হারানো সমান বেদনাদায়ক। 

অ্যাপেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী একটি ঘটনার উল্লেখ করেন। বলেন, ১৯৭৪ সালে একটি মধ্যাহ্নভোজে দুজন বাংলাদেশ নিয়ে নানা নেতিবাচক কথা বলছিলেন। পূর্ব পাকিস্তান থাকার সময়টা কত ভালো ছিল, তাঁরা সেটা আলোচনা করছিলেন। লতিফুর রহমান খুব ভদ্রভাবে তাঁদের বক্তব্যের জবাব দিলেন। সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী বলেন, বিনয়ের সঙ্গে যে বিরোধিতা করা যায়, তা সেদিন দেখিয়েছিলেন লতিফুর রহমান। তরুণদের তাঁর সম্পর্কে জানা উচিত। তাঁর কাছ থেকে শেখা উচিত।

নিউ এজ গ্রুপের চেয়ারম্যান এ এস এম কাসেম বলেন, লতিফুর রহমান মনে করতেন, তাঁর প্রতিষ্ঠানের সবাই একেকজন উদ্যোক্তা। 

বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম বলেন, ‘কারও মৃত্যুর পর মানুষের প্রতি তাঁর ব্যবহারটাই সবচেয়ে বেশি মনে থাকে। আমি আল্লাহ তাআলার কাছে লতিফুর রহমানের জান্নাত কামনা করি।’

ভারতের আদিত্য বিড়লা গ্রুপের গ্রুপ এক্সিকিউটিভ প্রেসিডেন্ট (করপোরেট স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড বিজনেস ডেভেলপমেন্ট) শিব শিবকুমার বলেন, লতিফুর রহমান মানুষকে সম্মান জানিয়ে নিজের সম্মান বাড়িয়েছেন। 

হিন্দুস্তান ইউনিলিভারের চেয়ারম্যান সঞ্জীব মেহতা বলেন, ‘আমি জীবনে যত মানুষের সঙ্গে মিশেছি, তাঁদের মধ্যে একজন সেরা মানুষ ছিলেন লতিফুর রহমান।’

এমসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি রোকিয়া আফজাল রহমান বলেন, কোনো কোম্পানির বোর্ড সভায় লতিফুর রহমানের যোগ দেওয়া মানে ছিল বাড়তি কোনো মূল্য যোগ করা। 

নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি এ কে আজাদ বলেন, পত্রিকা প্রকাশের বিষয়ে পরামর্শ চাইতে গেলে লতিফুর রহমান বলেছিলেন, কখনো বিজ্ঞাপনের জন্য কাউকে বলা যাবে না। বস্তুনিষ্ঠ পত্রিকা করলে বিজ্ঞাপন এমনিতেই আসবে।

স্কয়ার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন চৌধুরী ফুটবল ক্লাব লিভারপুলের স্লোগান তুলে ধরে সিমিন হোসেনের উদ্দেশে বলেন, ‘সিমিন, তোমাকে কখনো একা চলতে হবে না, এটা আমাদের প্রতিজ্ঞা।’ এনভয় গ্রুপের চেয়ারম্যান কুতুবউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা ইতিহাসের সাক্ষী। আর লতিফুর রহমান নিজে ইতিহাস তৈরি করেছেন। বাংলাদেশে কোনো ব্যবসায়ী যদি অনুসরণযোগ্য হন, সেখানে লতিফুর রহমানের নাম অবশ্যই থাকবে।’ বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, সবার জন্য লতিফুর রহমান অনুপ্রেরণার নাম।

এম এম ইস্পাহানী গ্রুপের চেয়ারম্যান সালমান ইস্পাহানী বলেন, তিনি লতিফুর রহমানের কাছ থেকে ব্যবসার অনেক কিছু শিখেছেন।

এমসিসিআইয়ের সাবেক মহাসচিব সি কে হায়দার বলেন, লতিফুর রহমান তাঁকে নিয়ে গোপনে দুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের অর্থসহায়তা দিতে গিয়েছেন। তিনি ছিলেন ধার্মিক মানুষ, কিন্তু অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী। 

এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, লতিফুর রহমান যদি প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার প্রতিষ্ঠা না করতেন, তাহলে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার কী হতো, তা বলা যায় না। এই দুই পত্রিকা সঠিক কথা বলে, তাই কোনো সরকার পছন্দ করে না। তিনি বলেন, লতিফুর রহমানের একটি পাসপোর্টই ছিল। সেটা তিনি গর্বের সঙ্গে বলতেন।

পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, ‘আমি মনে করতাম, লতিফুর রহমান আমাকে বাড়তি ভালোবাসেন। পরে বুঝলাম, তিনি সবাইকেই আপন করে নেন। লতিফুর রহমান ছাড়া পরিবারের বাইরে কারও মৃত্যুতে আমি কেঁদেছি বলে মনে পড়ে না।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর রুমি আলী নিজের ব্যাংকার জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, লতিফুর রহমান প্রমাণ করেছেন, নৈতিকভাবে ব্যবসা করা আর্থসামাজিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে না। এটা নির্ভর করে ব্যক্তির নিজস্ব মূল্যবোধের ওপর। লতিফুর রহমানের নাতি যারেফ আয়াত হোসেন বলেন, ‘এমসিসিআইয়ের প্রতি নানাভাইয়ের ভালোবাসার কারণ দেশের প্রতি তাঁর প্রেম। তিনি চাইতেন এমসিসিআই ও আইসিসিবির মাধ্যমে বাংলাদেশের ব্যবসাকে এগিয়ে নিতে।’ তিনি বলেন, তাঁর লিগ্যাসি ভবিষ্যতে ব্যবসায় নেতৃত্বকে অনুপ্রাণিত করবে।

অনুষ্ঠানে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বারের মহাসচিব জন ডব্লিউ এইচ ডেন্টনের একটি ভিডিও বার্তা প্রচার করা হয়। এ ছাড়া আইসিসিবির মহাসচিব আতাউর রহমান ও এমসিসিআইয়ের সহসভাপতি আনিস এ খান বক্তব্য দেন। সবশেষে দোয়া পরিচালনা করেন মাহবুবুর রহমান।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন