default-image

কেউ রোগীর স্বজন, কেউ স্থানীয় বস্তির বাসিন্দা। দিনমজুর থেকে শুরু করে লকডাউনে আর্থিক টানাপোড়েনে পড়া মধ্যবিত্ত পরিবারের দু-একজন রয়েছেন লাইনে। নিচ্ছেন ইফতারির প্যাকেট। গতকাল রোববার বিকেলে নগরের আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালের সামনে গিয়ে এ চিত্র দেখা গেল। সেখানে রাতে সাহ্‌রির প্যাকেটও পেয়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষেরা।

চট্টগ্রাম নগরের ডবলমুরিং থানা-পুলিশ ১৪ এপ্রিল থেকে মাসব্যাপী বিনা মূল্যে ‘ফ্রি ইফতার অ্যান্ড সাহ্‌রি শপ’ চালু করে। শুরুটা পুলিশ করলেও এখন তাদের সঙ্গে হাত বাড়িয়েছেন ছাত্র, শিক্ষক, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে নানা শ্রেণি–পেশার মানুষ।

জেলার ফটিকছড়ির ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মো. সরওয়ার। লকডাউনের কারণে ঘরবন্দী। ২০ এপ্রিল তাঁর এক বছরের ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শে ভর্তি করান নগরের আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালে। আর্থিক টানাপোড়েনে ইফতার-সাহ্‌রি নিয়ে চিন্তা ছিল। কাল ইফতার নিতে লাইনে দাঁড়ানো আবুল হাশেম প্রথম আলোকে বলেন, ছেলেকে ভর্তি করার পর তাঁর পকেটে টাকাপয়সা ছিল না। যা ছিল, চিকিৎসা আর ওষুধপত্র কিনতে শেষ। আশপাশে কোনো আত্মীয়স্বজন নেই। স্ত্রী-সন্তানকে হাসপাতালে রেখে ফটিকছড়ি আসা-যাওয়া সম্ভব না। প্রতিদিন ইফতার ও সাহ্‌রি ফ্রিতে এখান থেকে নেন। এগুলো দিয়ে তাঁরা স্বামী-স্ত্রী দুজনের হয়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

সরোয়ারের মতো অনেক রোগীর স্বজন রয়েছেন লাইনে, যাঁদের দিন কাটছে হাসপাতালের বারান্দায়। খাওয়া জুটছে ফ্রি ইফতার অ্যান্ড সাহ্‌রি শপ থেকে। নগরের হালিশহরের মো. সবুর, পাহাড়তলীর অলি জাহেদ, বোয়ালখালীর কামরুল হাসান ও কক্সবাজার পেকুয়ার আবু নোমান ফ্রি শপ থেকে নিয়মিত খাবার নেন।

লাইনে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর স্বজনদের পাশাপাশি দিনমজুরও রয়েছেন। আগ্রাবাদ বাদামতলী এলাকায় একটি বস্তিতে থাকেন মো. ইউসুফ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, একটি বাসে চালকের সহকারী হিসেবে কাজ করেন তিনি। লকডাউনের কারণে এখন কাজ বন্ধ। ঘরে জমানো টাকাও নেই। প্রতিদিন ইফতার ও সাহরি এখান থেকে নিয়ে যান।

লকডাউনে নিম্ন আয়ের মানুষ ও রোগীর স্বজনদের কথা মাথায় রেখে ফ্রি ইফতার অ্যান্ড সাহরি নামের এই শপ চালু করেছেন বলে জানান নগর পুলিশের উপকমিশনার (পশ্চিম) মো. আবদুল ওয়ারীশ। তিনি বলেন, শুরুতে ডবলমুরিং থানা-পুলিশের সহায়তায় চালু হলেও এখন অনেকেই সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন। রমজান মাসজুড়ে এটি চালু থাকবে।

আগ্রাবাদ পুলিশ ফাঁড়িতে ইফতার ও সাহরির খাবার তৈরি হয়। অফ ডিউটিতে থাকা পুলিশ সদস্যসহ প্রতিদিন ৮ জন স্বেচ্ছাসেবী ইফতার তৈরি ও বিতরণে সহায়তা করেন। এই কাজে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছেন লিও ক্লাব অফ চিটাগং পোর্ট সিটি এবং লিও ক্লাব অফ চিটাগং ডাইনামিক সিটির সদস্যরা। রান্না থেকে শুরু করে বিতরণ পর্যন্ত পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবীরাও থাকেন। রাত ১১টার পর শুরু হয় সাহরির আয়োজন। চলে ভোর পর্যন্ত। আর বেলা ২টা থেকে শুরু হয় ইফতার তৈরির কাজ। যাঁরা সহযোগিতা করেন, তাঁদের কারও কাছ থেকেই নগদ অর্থ নেওয়া হয় না।

ডবলমুরিং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মহসীন প্রথম আলোকে বলেন, দোকানপাট বন্ধ থাকায় হাসপাতালে রোগী ও তাঁদের স্বজনদের ইফতার-সাহরি নিয়ে কষ্ট হয়। আমরা সে কষ্ট লাঘবে পাশে দাঁড়াতে চেয়েছি। শুরু করেছি ২০০ প্যাকেট ইফতার ও ২০০ জনের সাহরি দিয়ে। এখন প্রতিদিন অন্তত ৮০০ ইফতারসামগ্রী ও ৩০০ সাহরির আয়োজন থাকে। প্রথমে আমরা আমাদের বেতনের একটা অংশ নিয়ে শুরু করি। পরে আমাদের সঙ্গে অসংখ্য মানুষ যুক্ত হয়েছেন। অধিকাংশ মানুষই নাম প্রকাশ করতে চান না। ছাত্র, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, সরকারি কর্মকর্তা, বিভিন্ন সংগঠন, প্রবাসী আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।

আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালের ট্রেজারার রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, হাসপাতালে ৬০০ রোগী রয়েছেন। এর মধ্যে ২০০ দরিদ্র রোগী রয়েছেন। লকডাউনের কারণে রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা হাসপাতালের সামনে পুলিশের চালু করা ফ্রি ইফতার অ্যান্ড সাহরি শপ থেকে বিনা মূল্যে ইফতার-সাহরি পাচ্ছেন। এতে রোগী ও আশপাশের নিম্ন আয়ের মানুষ উপকৃত হচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন