বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ইসি সূত্র জানায়, এখনো সিদ্ধান্ত না হলেও ইভিএমের সুবিধা–অসুবিধা নিয়ে নিজেদের মধ্যে কয়েক দফা বৈঠক করেছেন নির্বাচন কমিশনাররা। জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সঙ্গে বৈঠকে ইভিএমের খুঁটিনাটি কারিগরি দিকগুলো পর্যালোচনা করা হবে। এরপর রাজনৈতিক দলগুলোকে বিশেষজ্ঞ নিয়ে আসার আমন্ত্রণ জানানো হবে। তাঁরা নিজেদের মতো করে ইভিএম খতিয়ে দেখার সুযোগ পাবেন। এরপর বড় পরিসরে ইভিএম ব্যবহারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে ইসি।

অবশ্য ইভিএম নিয়ে বিরোধী দল, বিশেষত বিএনপির সন্দেহ মূলত একটি রাজনৈতিক অবস্থান বলে মনে করছে ইসি। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ইভিএমে কারচুপি সম্ভব নয়, এটি দেখানোর পরও যদি বিএনপি নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকে, তাহলে ইসি আর তাদের বক্তব্য আমলে নেবে না। সে ক্ষেত্রে ইভিএমে ভোটের পথেই হাঁটবে ইসি।

এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন ইসির আমলে ২০১০ সালে প্রথম চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের একটি ওয়ার্ডের ১৪টি কেন্দ্রে পরীক্ষামূলকভাবে ইভিএম ব্যবহার করা হয়। সেটি ছিল বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েটে) তৈরি। এখন ইসি যেসব ইভিএম ব্যবহার করছে, সেগুলো সরবরাহ করেছে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি (বিএমটিএফ)। ইভিএমে ভোট নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক থাকলেও বিভিন্ন স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে ইভিএমে ভোট গ্রহণ করে চলেছে ইসি।

গত সংসদ নির্বাচনের আগে কে এম নূরুল হুদার কমিশনের আমলে অংশীজনদের সঙ্গে সংলাপে ইভিএমের পক্ষে–বিপক্ষে মত এসেছিল। ওই সংলাপে ২৩টি দল একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম নিয়ে নিজেদের মতামত জানিয়েছিল। এর মধ্যে বিএনপিসহ ১২টি দল ইভিএম ব্যবহারের বিপক্ষে মত দেয়। শেষ পর্যন্ত ইসি ছয়টি সংসদীয় আসনে ইভিএম ব্যবহার করে।

৩০০ আসনে একসঙ্গে ইভিএমে ভোট করতে হলে আরও প্রায় ৩ লাখ ইভিএম প্রয়োজন হবে। তাঁরা মনে করছেন, যথাসময়ে সিদ্ধান্ত হলে সারা দেশে আগামী নির্বাচন ইভিএমে করা সম্ভব হবে।
সৈয়দ রাকিবুল হাসান, ইভিএম প্রকল্পের পরিচালক

বর্তমান কমিশনও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে অংশীজনদের সঙ্গে সংলাপ করছে। এখন পর্যন্ত শিক্ষাবিদ, বিশিষ্ট নাগরিক, পত্রিকার সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে ইসি সংলাপ করেছে। এসব সংলাপেও এই যন্ত্রের ব্যবহারের পক্ষে–বিপক্ষে মত এসেছে। তবে বেশির ভাগই বলেছেন, ঐকমত্য ছাড়া জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা ঠিক হবে না।

সংলাপে অনেকে ইভিএমে ভোটার ভেরিয়েবল পেপার অডিট ট্রেইল বা ভিভিপিএটি যুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন। এ ব্যবস্থায় একজন ভোটার ভোট দেওয়ার পর একটি কাগজ (প্রিন্ট করা) বেরিয়ে আসে। এতে ভোটার কোন প্রতীকে ভোট দিয়েছেন, তা দেখতে পারেন। এই যন্ত্রে কারচুপি সম্ভব নয়, এটি নিশ্চিত করারও পরামর্শ দিয়েছেন কেউ কেউ।

আস্থায় এনে সিদ্ধান্ত

গত শনিবার আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে দলের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইঙ্গিত দেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনে সব আসনে ভোট হবে ইভিএমে।

সংসদ নির্বাচনসংক্রান্ত আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী কাগজের ব্যালটে বা ইভিএমে ভোট গ্রহণ করার সুযোগ আছে। তবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার ইসির। তারা চাইলে সব আসনে ইভিএম বা কাগজের ব্যালট অথবা কোথাও কাগজের ব্যালট, কোথাও ইভিএম ব্যবহার করতে পারে।

গতকাল নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে কি না, সে বিষয়ে কমিশনে এখনো কোনো আলোচনাই হয়নি। তিনি বলেন, একটি দল তাদের দলীয় সভায় আলোচনা করেছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু ইসির কাছে ইভিএম ব্যবহারের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক কোনো অনুরোধ আসেনি। আর সরকারের কাছ থেকে এ ধরনের কোনো অনুরোধ আসার সুযোগ নেই।

নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর আরও বলেন, জাতীয় নির্বাচনের এখনো অনেক দেরি আছে। কীভাবে ভোট হবে, তা সাধারণত নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সময় সিদ্ধান্ত হয়। নতুন ইভিএম কেনার বিষয়েও এখনো কোনো আলোচনা হয়নি। তিনি বলেন, অনেকের অবিশ্বাস আছে, কীভাবে অবিশ্বাসের জায়গা থেকে বিশ্বাসের জায়গায় আনা যায়, তা তাঁরা পরীক্ষা–নিরীক্ষা করে দেখছেন। তিনি বলেন, ইভিএম নিয়ে সন্দেহের জায়গা দূর করতে ইসি ব্যবস্থা নেবে। আস্থার জায়গা ঠিক হয়ে গেলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে কতটি ইভিএম ব্যবহার করা হবে।

প্রয়োজন আরও ৩ লাখ ইভিএম

ইসি সূত্র জানায়, এক দিনে ৩০০ সংসদীয় আসনে ইভিএমে ভোট করার মতো সক্ষমতা এখন পর্যন্ত ইসির নেই। বর্তমানে ইসির হাতে থাকা দেড় লাখ ইভিএম দিয়ে ১০০ থেকে ১১০ আসনে ভোট করা সম্ভব। তবে এই ইভিএম সব আসনে ব্যবহৃত হলে একাধিক দিনে ভোট আয়োজন করতে হবে।

ইভিএম প্রকল্পের পরিচালক সৈয়দ রাকিবুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ৩০০ আসনে একসঙ্গে ইভিএমে ভোট করতে হলে আরও প্রায় ৩ লাখ ইভিএম প্রয়োজন হবে। তাঁরা মনে করছেন, যথাসময়ে সিদ্ধান্ত হলে সারা দেশে আগামী নির্বাচন ইভিএমে করা সম্ভব হবে।

নতুন করে ইভিএম কেনার সম্ভাব্য ব্যয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে রাকিবুল হাসান বলেন, বাজারমূল্যের সঙ্গে সমন্বয়, জনবল তৈরি মিলিয়ে খরচ আগের চেয়ে বাড়ার সম্ভাবনা আছে।

ইসি সূত্র জানায়, ২০১৮ সাল থেকে ‘নির্বাচনব্যবস্থায় অধিকতর স্বচ্ছতা আনয়নের লক্ষ্যে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ক্রয়, সংরক্ষণ ও ব্যবহার’ শীর্ষক একটি পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পের অধীনে দেড় লাখ ইভিএম সংগ্রহ করেছে ইসি। আগামী বছরের জুনে প্রকল্পটি শেষ হচ্ছে। এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা আছে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা। প্রতিটি ইভিএমের দাম পড়েছে প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। একই খরচ বিবেচনায় নিলে তিন লাখ নতুন ইভিএম সংগ্রহ করতে ইসিকে ৮ হাজার কোটি টাকার মতো খরচ করতে হবে। অবশ্য নতুন ইভিএম কেনার বিষয়ে এখন পর্যন্ত ইসি কোনো আলোচনা করেনি।

যদিও নির্বাচনে ব্যাপকভাবে ইভিএম ব্যবহারের ক্ষেত্রে এখনো বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। এর মধ্যে আছে ভোটারদের, বিশেষত বয়স্ক ভোটারদের প্রযুক্তিভীতি, দক্ষ জনবলের অভাব, কিছু ক্ষেত্রে ইভিএমে ভোটারের আঙুলের ছাপ না মেলা ও যান্ত্রিক ত্রুটি। আবার সংসদ ও স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনে কাগজের ব্যালটের তুলনায় ইভিএমে ভোট পড়ার হারও কম দেখা গেছে।

এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা ব্রতীর প্রধান নির্বাহী শারমিন মুরশিদ মনে করেন জাতীয় নির্বাচনে ব্যাপকভাবে ইভিএম ব্যবহার করা ঠিক হবে না। কারণ হিসেবে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ব্যাপকভাবে ইভিএমের ব্যবহার হয়নি। এই যন্ত্র যথেষ্ট পরীক্ষিত নয়। ছোট ছোট জায়গায় ব্যবহৃত হয়েছে, সেখানে বেশ কিছু ঘাটতি–দুর্বলতা চোখে পড়েছে। কোথাও কোথাও যন্ত্র গন্ডগোল করেছে, ভোট গ্রহণ অনেক ধীর হয়েছে, একজনের আঙুলের ছাপ দেওয়ার পর ভোট দিয়েছেন অন্যজন।

শারমিন মুরশিদ আরও বলেন, ৩০০ আসনে ইভিএমে ভোট পরিচালনার মতো দক্ষতা ইসির আছে বলে মনে হয় না। জনমনে যে আস্থাহীনতা আছে, আগে সেটি দূর করতে হবে। অনেক দেশ ইভিএম থেকে সরে এসেছে। বাংলাদেশের মতো দেশে কাগজের ব্যালটে প্রচলিত পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণ করাই সর্বোত্তম।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন