জুমে অনুষ্ঠিত প্রথম সভায় ইশারা ভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার জন্য সম্ভাব্যতা যাচাইকরণ, খসড়া আইনি কাঠামো প্রণয়ন, খসড়া সাংগঠনিক কাঠামো প্রণয়ন, অর্থ ও জনবল সংস্থানের প্রস্তাব, প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিধি ও কর্ম এলাকা নির্ধারণ, আন্তমন্ত্রণালয় সভার রূপরেখা, জমি অধিগ্রহণসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।

বাক্‌ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধীদের সংগঠন জাতীয় বধির সংস্থার সাধারণ সম্পাদক রুহুল কুদ্দুছ খান আজ বুধবার ইশারা ভাষার দোভাষীর মাধ্যমে কথা বলেন প্রথম আলোর সঙ্গে। দোভাষী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এ সংস্থার ইশারা ভাষা গবেষণা, প্রকাশনা ও প্রশিক্ষণ বিভাগের পরিচালক মনোয়ার হোসেন।

রুহুল কুদ্দুছ খান বলেন, শুধু ইশারা ভাষা ইনস্টিটিউট–সংক্রান্ত কমিটি থেকে জাতীয় বধির সংস্থাকে বাদ দেওয়া হয়েছে, ব্যাপারটা তা–ই নয়, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও আমন্ত্রণ পান না তাঁরা। ইশারা ভাষা দিবস উদ্‌যাপন কমিটিতেও ডাকা হয়নি। অথচ ১৯৬৩ সাল থেকে যাত্রা শুরু করা এ সংস্থার সদস্য সারা দেশে প্রায় ১৫ হাজার বাক্‌ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষ।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের খবরে ইশারা ভাষার প্রথম দোভাষী হিসেবে দায়িত্ব পালনেরও অভিজ্ঞতা আছে মনোয়ার হোসেনের। নিজের শ্বশুর-শাশুড়ি, ফুফাতো ভাই বাক্‌ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী এবং জাতীয় বধির সংস্থার সঙ্গে দীর্ঘদিন জড়িত থাকার সুবাদে ইশারা ভাষা রপ্ত করেছেন মনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ‘ইশারা ভাষা ইনস্টিটিউট কমিটিতে মন্ত্রণালয় বা অন্য প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অবশ্যই থাকবেন। তবে এ ভাষা ব্যবহার করেন শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা। এই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সঙ্গে অন্যদের এ ভাষা ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়া দোভাষী ও প্রশিক্ষকদেরও তো কমিটিতে রাখা দরকার ছিল। কর্মী হিসেবেও তো আমরা কাজে লাগতে পারি।’

প্রতিবন্ধী নাগরিক সংগঠনের পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সালমা মাহবুব প্রথম আলোকে বলেন, সভায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি উপস্থিত থাকলেও শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তির উপস্থিতি নিশ্চিত না করার বিষয়টিই হাস্যকর। শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি নেতিবাচক চিন্তাভাবনাই এর পেছনে মূল ভূমিকা পালন করেছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার একজন, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার একজন, সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রতিষ্ঠান) এবং পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ), জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) এবং পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ), নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্টের প্রতিনিধি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিউনিকেশন ডিজঅর্ডারস বিভাগের প্রতিনিধি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা ইনস্টিটিউটের প্রতিনিধি, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (প্রতিবন্ধিতা), মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (এনডিডি ও অটিজম), পিএইচটি সেন্টারের একজন বাক্‌ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী–বিষয়ক শিক্ষক, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের নিয়ে কর্মরত ভিপসের সাধারণ সম্পাদক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও কর্মসংস্থান নিয়ে কর্মরত সিডিডির নির্বাহী পরিচালককে প্রথম সভায় উপস্থিত থাকার জন্য চিঠি পাঠানো হয়েছিল।

এ সভায় উপস্থিত থাকার জন্য শ্রবণপ্রতিবন্ধীদের অধিকার নিয়ে কর্মরত সোসাইটি অব দ্য ডেফ অ্যান্ড সাইন ল্যাঙ্গুয়েজও (এসডিএসএল) চিঠি পায়, তবে চিঠিতে দোভাষী হিসেবে কাজ করছেন—এমন কোনো ব্যক্তিকে পাঠানোর জন্য বলা হয়েছিল। এসডিএসএলের সাধারণ সদস্য (দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী) ইফতেখার মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, সরকার একটি ইনস্টিটিউট করতে যাচ্ছে, এটি সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। তবে ইনস্টিটিউটের নাম থেকে বাংলা শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছে, যা বিতর্কের সৃষ্টি করবে। এ ছাড়া যাঁদের জন্য ইনস্টিটিউট, এ সভা থেকে তাঁদেরই বাদ দেওয়া হয়েছে। যাঁরা দোভাষী হিসেবে কাজ করছেন বা পেশা হিসেবে নিয়েছেন, তাঁদেরও বাদ দেওয়া হয়েছে কমিটি থেকে।

বাক্‌ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধীদের সংগঠন জাতীয় বধির সংস্থার সাধারণ সম্পাদক রুহুল কুদ্দুছ খান বলেন, শুধু ইশারা ভাষা ইনস্টিটিউট–সংক্রান্ত কমিটি থেকে জাতীয় বধির সংস্থাকে বাদ দেওয়া হয়েছে তা–ই নয়, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও আমন্ত্রণ পান না তাঁরা।

ভিজ্যুয়ালি ইমপিয়ার্ড পিপলস সোসাইটির (ভিপস) সাধারণ সম্পাদক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী জাহাঙ্গীর আলম প্রথম সভায় উপস্থিত ছিলেন। আজ তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ভিপস কখনোই শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করেনি। তাই ইশারা ভাষা ইনস্টিটিউট–সংক্রান্ত সভায় ভিপসের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের উপস্থিত থাকার চেয়ে শ্রবণপ্রতিবন্ধীদের উপস্থিতি বেশি জরুরি ছিল। মূলত, এ জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বেই কাজটি হওয়ার কথা, সেখানে প্রথম সভা থেকেই তাঁদের বাদ দেওয়া হয়েছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়।

সরকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সনদ ও ঐচ্ছিক প্রতিপালনীয় বিধিবিধান অনুসমর্থন করেছে। ২০০৮ সাল থেকে কার্যকর হওয়া এই সনদ ইশারা ভাষার স্বীকৃতি ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের জন্য শরিকরাষ্ট্রকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। ২০১৩ সালে সরকার যে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করেছে, তাতেও প্রমিত বাংলা ইশারা ভাষা প্রণয়ন ও উন্নয়নে প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম গ্রহণ এবং হাসপাতাল, আদালত, থানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সব জায়গায় ইশারা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলা আছে।

বেসরকারি হিসাবে দেশে ইশারা ভাষা ব্যবহারকারী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৩০ লাখের বেশি। তবে সরকারিভাবে পরিসংখ্যানটি অনেক কম। ১১ বছর ধরে ইশারা ভাষা নিয়ে কর্মরত টার্নিং পয়েন্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক আবু হানিফ মোহাম্মদ ফরহাদ প্রথম আলোকে বলেন, দেশে বাক্‌ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধিতা নিয়ে কাজ করছে—নিবন্ধন করা এমন সংগঠন আছে ৬০ থেকে ৭০টি। ইশারা ভাষায় প্রশিক্ষিত দোভাষী আছেন প্রায় ১০ জন। প্রতিবন্ধিতা–বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হলেই তিনি ইশারা ভাষা বুঝবেন, তা নয়। তাই এই জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা ও নেতৃত্ব ছাড়া কোনো কার্যক্রমই গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রতিবন্ধী নাগরিক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সালমা মাহবুব প্রথম আলোকে বলেন, সভায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি উপস্থিত থাকলেও শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তির উপস্থিতি নিশ্চিত না করার বিষয়টিই হাস্যকর। শ্রবণপ্রতিবন্ধীদের প্রতি নেতিবাচক চিন্তাভাবনাই এর পেছনে মূল ভূমিকা পালন করেছে।

১৮ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত প্রথম সভায় উপস্থিত একাধিক প্রতিনিধি প্রথম আলোকে জানান, ইশারা ভাষা ইনস্টিটিউট–সংক্রান্ত প্রথম সভায় ইনস্টিটিউটের জন্য জমির বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের অধীন এ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে।

২০০৯ সালে বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলা ইশারা ভাষাকে ‘অন্যতম ভাষা’ হিসেবে ঘোষণা করেন। ওই বছর থেকে ৭ ফেব্রুয়ারি বাংলা ইশারা ভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ (বিটিভি) অন্যান্য টেলিভিশন চ্যানেলের প্রধান সংবাদে ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে ইশারা ভাষা উপস্থাপনের নির্দেশ দেন। বিটিভি ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল দেশ টিভি ছাড়া আর কোনো চ্যানেলে এটি বাস্তবায়িত হয়নি। এ ছাড়া নির্যাতনের শিকার নারী বা অন্যান্য মামলায় আদালতে দোভাষীর মাধ্যমে জবানবন্দি দেওয়ার সুযোগ নেই। হাসপাতাল, এমনকি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করা সরকারি প্রতিষ্ঠানেও দোভাষী নিয়োগ দেওয়া হয়নি।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন