ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক

ঢাকা থেকে যাঁরা উত্তরবঙ্গে যেতে চান, তাঁদের নবীনগর মোড় পার হতেই যানজটে ভুগতে হয়। নবীনগর-চন্দ্রার রাস্তাটিতে গাড়ি উঠতে পারলে প্রশস্ত সড়ক। চার লেন সড়ক ধরে যাওয়া যায় টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা পর্যন্ত। এ পথে মির্জাপুরের গোড়াইয়ে উড়ালসড়ক ঈদের আগেই খুলে দেওয়া হবে। কিন্তু সমস্যা হলো বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত যাওয়া।

পুলিশ সদস্য ও পরিবহনশ্রমিকেরা বলছেন, চার লেনের সড়ক ধরে এলেঙ্গা যাওয়ার পর থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত দুই লেনের সড়ক। সেতুও দুই লেনের। যানবাহনগুলো দুই লেনের মুখে আটকে যায়। সেখান থেকেই যানজটের শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু সেতুতে টোল দিতে গিয়েও যানজট লেগে যায়। কয়েক বছর ধরে মূলত এ কারণেই যানজট হচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু সেতুর টোলপ্লাজা সূত্র জানায়, স্বাভাবিক অবস্থায় প্রতিদিন ১২ থেকে ১৩ হাজার যানবাহন সেতু পার হয়। ঈদযাত্রায় তা ৩০ থেকে ৩২ হাজারে উন্নীত হয়। টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সার প্রথম আলোকে বলেন, ঈদের আগে মহাসড়ক যানজটমুক্ত রাখতে পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো হবে।

এদিকে সিরাজগঞ্জের বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার কাজ চলছে। ফলে মহাসড়কটির কোথাও সংকুচিত, আবার কোথাও একমুখী। এ সড়কে দীর্ঘদিন ধরেই যানবাহন চলে ধীরগতিতে। চাপ একটু বাড়লেই যানজট দেখা দেয়।

ঢাকা থেকে বগুড়াগামী ট্রাকচালক আবদুর রাজ্জাক গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, সেতু পার হওয়ার পর থেকেই থেমে থেমে ধীরগতিতে চলতে হচ্ছে। সামনে ঈদের সময় ভয়াবহ যানজট সৃষ্টি হবে।

সিরাজগঞ্জের বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার কাজ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মীর আক্তার হোসেন লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির প্রকৌশলী আবদুল মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, ঈদের সময় অতিরিক্ত যানবাহনের চাপের কথা চিন্তা করে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো বিটুমিন-পাথর মিশিয়ে সাময়িক সময়ের জন্য সচল করা হয়েছে।

সিরাজগঞ্জ পেরিয়ে চান্দাইকোনা থেকে চাপড়িগঞ্জ পর্যন্ত বগুড়ার ৬৫ কিলোমিটার সড়কের ১৬টি স্থানে এখনই দিনরাত যানজট তৈরি হচ্ছে। হাইওয়ে পুলিশ ও চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চান্দাইকোনা-সিরাজগঞ্জ বাজার এবং চান্দাইকোনা বগুড়া বাজারের মাঝামাঝি স্থানে কালভার্ট নির্মাণের কারণে রাস্তা একমুখী হয়ে গেছে। এটাই প্রচণ্ড যানজটের কারণ।

এদিকে সাউথ এশিয়া সাব রিজিওনাল ইকোনমিক কো-অপারেশন রোড (সাসেক) সড়ক সংযোগ প্রকল্প-২–এর প্রকল্প পরিচালক ওয়ালিউর রহমান বলেন, ঈদযাত্রায় ভোগান্তি নিরসনে এলেঙ্গায় রাজশাহী, নাটোর, পাবনা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে চলাচলকারী যানবাহনকে ভুঞাপুর হয়ে বিকল্প পথে চলাচলের উদ্যোগ নেওয়া হবে। নলকা ও চান্দাইকোনায় ঈদের আগেই নতুন সেতু চালু হবে। হাটিকুমরুল মোড়ে যানজট নিরসনে চলমান লেন কিছুটা প্রশস্ত করা হবে। তিনি আরও জানান, মহাস্থান বাজারে বিটুমিন লেয়ারের কাজ শেষ করা হবে। মোকামতলা থেকে রংপুরের মডার্ন মোড় পর্যন্ত কোনো সমস্যা হবে না।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার বারপাড়া এলাকায় চার লেনের সংস্কারকাজের কারণে দুই-তিন কিলোমিটার এলাকায় যানজট লাগছে। আর এ যানজট গিয়ে ঠেকছে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ পর্যন্ত ৫০ কিলোমিটার সড়কজুড়ে।

সওজ কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীতি চাকমা বলছেন, ঘোষণা না দিলেও ঈদের এক সপ্তাহ আগে থেকেই সংস্কারকাজ বন্ধ রাখতে হবে।

এদিকে কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মাধাইয়া বাজার, চান্দিনা বাসস্ট্যান্ড, বুড়িচং উপজেলার নিমসার তরকারি বাজার, আদর্শ সদর উপজেলার ময়নামতি সেনানিবাস এলাকা, কুমিল্লা নগরের পদুয়ারবাজার বিশ্বরোড, চৌদ্দগ্রামের মিয়াবাজার ও চৌদ্দগ্রামে মহাসড়ক এলাকায় বাজারের কারণে যানজট হচ্ছে।

কুমিল্লা-ঢাকা পথের তিশা পরিবহনের চালক সাইফুল ইসলাম বলেন, বাজার এলাকায় গাড়ি চালাতে বেগ পেতে হয়। পণ্যবাহী ট্রাক মাল নামাতে দেরি করে। মহাসড়কের মধ্যে গাড়ি রেখে মাল ওঠানামা করে।

এ সড়কের চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড অংশের ৩৮ কিলোমিটারের আটটি পয়েন্টে ঈদযাত্রায় যানজটের আশঙ্কা করছে হাইওয়ে পুলিশ। এসব পয়েন্টে স্বাভাবিক সময়েও গাড়ি চলছে ধীরগতিতে।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক

রাজধানীর আবদুল্লাহপুর পার হলেই গাজীপুরের টঙ্গী। এখান থেকে শুরু হয়েছে খানাখন্দ আর ভাঙাচোরা রাস্তার। দুর্ভোগের শুরুটাও এখান থেকেই। বেহাল সড়কের একদিকে চলছে উন্নয়নকাজ, অন্যদিকে সংকুচিত হয়ে যাওয়া সড়ক দিয়ে প্রতিদিন চলছে কয়েক লাখ যানবাহন। ফলে এখনই প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেগে থাকে যানজট।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের কাজ চলমান থাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের টঙ্গী থেকে চান্দনা চৌরাস্তা পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার অংশ অতিক্রম করতে এখন সময় লাগে তিন-চার ঘণ্টা। কখনো এর চেয়েও বেশি। ফলে ঈদযাত্রার চাপে ভোগান্তি চরমে ওঠার আশঙ্কা করছেন যাত্রী ও চালকেরা। এ পথের যাত্রীরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে সড়কের মধ্যে অনেক জায়গায় উড়ালসড়ক তৈরির ব্লক রেখে দেওয়া হয়েছে। উড়ালসড়কের কাজ শেষ হচ্ছে না। যানজট কমছে না।

বিআরটি প্রকল্পের পরিচালক এ এস এম ইলিয়াস শাহ বলেন, ঈদের আগে সড়কের বাকি থাকা কার্পেটিংয়ের কাজ শেষ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি আশা করেন, ঈদের যাত্রার আগেই সড়কটি পুরোপুরি চলাচলের উপযোগী করে তোলা হবে।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সোনারগাঁয়ের কাঁচপুর থেকে ভুলতা পর্যন্ত ১২ কিলোমিটারে যানজটের কারণ হতে পারে মহাসড়ক দখল করে গড়ে ওঠা আঞ্চলিক পথে চলাচলকারী যানবাহনের স্ট্যান্ড ও অবৈধ পার্কিং।

গতকাল সরেজমিনে কাঁচপুর সেতুর নিচে শ্যামবাজার বাসস্ট্যান্ড ও তারাব চৌরাস্তায় মহাসড়ক দখল করে গড়ে তোলা লেগুনাস্ট্যান্ডে যাত্রী ওঠানামার করণে যানজট হতে দেখা গেছে। যাত্রামুড়া বাজার ও বরাব থেকে ভুলতা পর্যন্ত সড়কের দুই পাশ দখল করে অলস বাস ও ট্রাক পার্ক করে রাখা। রূপসী মোড় ও ভুলতা উড়ালসড়কের নিচের অংশটুকু রিকশা, ইজিবাইক, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও লেগুনার দখলে ছিল। এ ছাড়া সড়কের বিভিন্ন অংশ ফুলে ওঠা ও অনেক স্থানে গর্তও দেখা গেছে। রয়েছে ধুলার রাজত্বও।

পুলিশ বলছে, ঈদে যানজট নিরসনে নানা ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে আশা রাখতে পারছেন না যানবাহনের চালকেরা।

ঢাকা-নরসিংদী রুটে ১১ বছর ধরে বাস চালান মহসিন মিয়া। তিনি বলেন, কাঁচপুর সেতুর নিচ থেকে ভুলতা উড়ালসড়ক পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার পাড়ি দিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়। এবারের ঈদযাত্রায় এ ১২ কিলোমিটার সড়কই ভোগান্তির বড় কারণ হতে পারে।

[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, কুমিল্লা, বগুড়া, টাঙ্গাইল; প্রতিনিধি, সিরাজগঞ্জ, গাজীপুর, মির্জাপুর, দাউদকান্দি, সীতাকুণ্ড সংবাদদাতা, নারায়ণগঞ্জ]

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন