আজ সারা দেশে ভূমি ও গৃহহীন পরিবারের মধ্যে মোট ৩২ হাজার ৯০৪টি বাড়ি হস্তান্তর করা হবে। এর মধ্যে বকুল বেগমসহ সিরাজগঞ্জ জেলার ৪০৯টি পরিবার পাচ্ছে নতুন ঠিকানা।

সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, ২ শতাংশ জায়গায় ৪১৫ বর্গফুট আয়তনের প্রতিটি ঘরে দুটি কক্ষ রয়েছে, সঙ্গে রয়েছে রান্নাঘর ও শৌচাগার। প্রতিটি ঘরের চারপাশে খোলা জায়গা রয়েছে, যেখানে উপকারভোগীরা চাইলে শাকসবজি আবাদ করতে পারবেন।

জেলা প্রশাসক কার্যালয় জানায়, টাস্কফোর্স কমিটির মাধ্যমে সিরাজগঞ্জের ৯টি উপজেলায় ৪০৯ জন উপকারভোগী নির্বাচন করা হয়েছে। এঁদের মধ্যে সদরে ৮২, রায়গঞ্জে ৭০, কামারখন্দে ৫৩, কাজীপুরে ৫০, তাড়াশে ৪৫, শাহজাদপুরে ৪০, উল্লাপাড়ায় ৪০, বেলকুচিতে ২৫ ও চৌহালীতে ৪টি পরিবার রয়েছে।

উপকারভোগী আরেক নারী সদর উপজেলার চর শৈলাবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা মর্জিনা বেগম (৫৭)। প্রায় ২০ বছর ধরে খালপাড়ের পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধের জায়গায় একটি টিনের ঘরে দুই সন্তান নিয়ে থাকতেন। তিনি বলেন, কখনো স্বপ্নেও ভাবেননি নিজেদের একটি ঘর হবে। সেই ঘরে সন্তানদের নিয়ে বসবাস করবেন। মর্জিনা বেগম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে জায়গাসহ নতুন ঘর পেয়ে সন্তানদের নিয়ে বাঁচার নতুন করে শক্তি পেয়েছেন তিনি।

গতকাল সোমবার দুপুরে সিরাজগঞ্জ সদরের খোকশাবাড়ি আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবারগুলো তাদের নতুন আশ্রয়স্থল গোছগাছ করছেন। সবার চোখেমুখে আন্দন্দের ছাপ। তাঁরা জানান, জেলা প্রশাসন থেকে আজ (সোমবার) তাঁদের ঘরে উঠে সব গুছিয়ে নিতে বলেছেন।

এর আগে গত বছর খোকশাবাড়ি আশ্রয়ণ প্রকল্পে ২২২টি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একটি ঘর পেয়েছেন সদরের ছোনগাছা এলাকার হস্তশিল্পী পলান চন্দ দাস। পলান চন্দ বলেন, অসুস্থ শরীর নিয়ে সড়কের পাশে ঘর তুলে আশ্রয় নিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর পেয়ে তাঁরা নিশ্চিন্ত হয়েছেন।

সদরের কোবদাস পাড়া এলাকার যমুনা নদীর ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে এখানে আশ্রয় পেয়েছেন সেলিনা বেগম (৩৫) ও গোলাম মোস্তফা (৪০) দম্পতি। তাঁদের তিন সন্তান। গোলাম মোস্তফা পেশায় ঘটক। প্রধানমন্ত্রীর উপহার পেয়ে আনন্দের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এই এলাকায় অনেক শিশু রয়েছে, কিন্তু কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। বিষয়টি দেখার জন্য তিনি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক ফারুক আহাম্মদ জানান, গৃহহীনদের দেওয়া প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ–সংযোগ দেওয়া হয়েছে। বসানো হয়েছে গভীর নলকূপ। স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব (পিএমও) মো. তোফাজ্জেল হোসেন মিয়া রোববার সাংবাদিকদের জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার পোড়াদিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্প, বরগুনা সদর উপজেলার খেজুরতলা আশ্রয়ণ প্রকল্প, সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার খোকশাবাড়ি আশ্রয়ণ প্রকল্প ও চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার হাজীগাঁও আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘর হস্তান্তর অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি সংযুক্ত হবেন।

তোফাজ্জেল হোসেন মিয়া জানান, আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে ৬৫ হাজার ৬৭৪টি একক ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। তৃতীয় ধাপের বাড়িগুলোকে আরও টেকসই ও জলবায়ু-সহনশীল করতে সরকার খরচ বাড়িয়েছে এবং নকশায় পরিবর্তন এনেছে। এখন ভূমিহীন ও গৃহহীনেরা ২ দশমিক ২ শতাংশ জমিসহ উন্নত মানের আবাস পাবেন। আরও টেকসই ও দর্শনীয় করতে বাড়িপ্রতি খরচ ১ লাখ ৯১ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়েছে।

তোফাজ্জেল হোসেন আরও জানান, প্রকল্পের প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে মোট ১ লাখ ১৭ হাজার ৩২৯টি একক বাড়ি তৈরি করা হয়েছে এবং এ পর্যন্ত ১ লাখ ৮৩ হাজার ৩টি বাড়ি বরাদ্দ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এর মধ্যে ৫৩ হাজার ৮৩২টি বাড়ি দেওয়া হয়েছে উপকূলীয় ১৯ জেলার বাসিন্দাদের, যাঁরা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভূমিহীন হয়েছিলেন।

সিনিয়র সচিব তোফাজ্জেল হোসেন মিয়া বলেন, মুজিব বর্ষ উপলক্ষে সরকার এসব প্রকল্পের জন্য বাড়ি নির্মাণের জন্য সারা দেশে অবৈধ দখল থেকে ৫৫১২.০৪ একর খাসজমি উদ্ধার করেছে। এর আনুমানিক বাজারমূল্য ২ হাজার ৯৬৭ কোটি ৯ লাখ টাকা।

‘মুজিব বর্ষে একটা মানুষও ভূমিহীন থাকবে না, গৃহহীন থাকবে না’—প্রধানমন্ত্রীর এমন ঘোষণার পর সারা দেশের ভূমি-গৃহহীন পরিবারকে জায়গাসহ ঘর করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন