default-image

বিকেল পাঁচটায় শাহবাগ মোড় থেকে রিকশা নিতেই চালক জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোথায় যাবেন, মেডিকেল?’
এ সময়ে তো সবার বইমেলায়ই যাওয়ার কথা। কিন্তু তিনি ‘মেডিকেলের’ কথা কেন বললেন? তাহলে কি নতুন কোনো দগ্ধ মানুষ বার্ন ইউনিটে ভর্তি হয়েছেন? মনটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। বললাম, না, বইমেলায় যাব।
গতকাল ছিল অমর একুশে গ্রন্থমেলার নবম দিন। কিন্তু মেলাঙ্গনের পরিবেশ ছিল ছন্নছাড়া। রাস্তার এপারে-ওপারে মেলা ভাগ হয়েছে। পরিসর বেড়েছে। কিন্তু জাতির মননের পরিসর যে বাড়েনি, তার প্রমাণ বইমেলার মধ্যেই অবরোধের সঙ্গে হরতালের সংযোগ। কোরবানিতে গরু কিনলে যেমন মুফতে ছাগল পাওয়া যায়, তেমনি আমাদের বৈরী ও বিদ্বিষ্ট রাজনীতি বইমেলার ওপর ডাবল উপদ্রব চাপিয়ে দিয়েছে।
অথচ লেখক-প্রকাশকেরা এই মেলার জন্যই সারা বছর অপেক্ষা করেন। এমনকি পাঠকও। বাংলা একাডেমির মূল ফটক দিয়ে ঢুকতেই দেখলাম, বাঁয়ে আলোচনা সভা চলছে। শ্রোতা-দর্শকদের উপস্থিতি কম। ডানে শিশু-কিশোর ও প্রাতিষ্ঠানিক বইয়ের স্টল। সেখানে কিছুটা ভিড় লক্ষ করা গেলেও লিটলম্যাগ চত্বরটি প্রায় ফাঁকা। সম্ভবত এ যুগটা সেলফির, সে জন্যই কি লিটলম্যাগের প্রতি তরুণদের অনীহা? তবে অনেকে হেঁটে হেঁটে লিটলম্যাগ বিক্রি করছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজের দুই শিক্ষার্থী পোস্টকার্ড নামের একটি লিটলম্যাগ যখন হাতে তুলে দিলেন, বললাম, বিনে পয়সায় নেব না। দাম দেব।
আমরা যদি মেলায় বিনে পয়সায় বই ও লিটলম্যাগ পেতে না চাইতাম, তাহলে তরুণেরা সৃজনশীল কাজে আরও বেশি উৎসাহী হতেন। আরও বেশি লিটলম্যাগ বের হতো। এটাই সাহিত্য মননচর্চার প্রধান বাহন।
বাংলা একাডেমি চত্বর থেকে মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অংশে ঢুকতে খটকা লাগল। বিভিন্ন স্টলে থরে থরে নতুন বই সাজানো। কিন্তু ক্রেতা কম। বিক্রেতারা মন খারাপ করে বসে আছেন। কয়েকজন প্রকাশককে জিজ্ঞেস করলাম, বিক্রিবাট্টা কেমন। বললেন, এই হরতাল-অবরোধে মানুষ আসবেন কীভাবে? শুক্র ও শনিবার যা-ও বিক্রি হয়েছে, আজ একেবারেই মন্দা।
উত্তপ্ত রাজনীতিতে নিরুত্তাপ মেলা। লেখক-পাঠকের ভিড়ে যে মেলা হওয়ার কথা সদা চঞ্চল, সেই মেলা এখনো অনেকটা নিষ্প্রাণ। মেলায় আগত ব্যক্তিদের বেশির ভাগ তরুণ-তরুণী। এঁদের কেউ এসেছেন ঘুরতে, দেখতে কিংবা নিছক গল্প করতে। মনে মনে প্রার্থনা করি, ফেরার সময় যেন তাঁরা একটি করে বই নিয়ে যান।
হঠাৎ করে মেলাঙ্গন সরগরম হয়ে উঠল। চারদিকে হইচই। কী ব্যাপার? একজন জানালেন, মেলায় একজন ‘মন্ত্রী কাম লেখক’ এসেছেন। সঙ্গে জনা পঞ্চাশেক কর্মী। একজন মন্ত্রী মেলায় এসেছেন ভালো কথা। তাই বলে বিরাট লটবহর নিয়ে! আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, মন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে যাঁরা এসেছেন, তাঁদের বেশির ভাগই তাঁর লেখা বইটিও পড়বেন না। মন্ত্রীর বই কিনে পড়ার চেয়ে মন্ত্রীর সঙ্গ অনেক বেশি আকর্ষণীয়।
তবে এত দুঃসংবাদের মধ্যেও যখন দেখি, এই অবরোধ-হরতাল ভেঙে রংপুর থেকে কথাশিল্পী মঞ্জু সরকার মেলায় এসেছেন, তখন আশান্বিত না হয়ে পারি না। যখন দেখি ইউপিএলের স্বত্বাধিকারী মহিউদ্দিন আহমেদ অসুস্থ শরীরেও প্রায় প্রতিদিন মেলায় আসেন, নতুন বইয়ের খোঁজখবর নেন, তখন মনে হয় বাংলাদেশ হরতাল-অবরোধ সন্ত্রাসের এই দুর্যোগ কাটিয়ে উঠবেই। বইমেলায় প্রাণের ছোঁয়া লাগবেই।

নতুন বই
একাডেমির তথ্যকেন্দ্র এবং সমন্বয় ও জনসংযোগ উপবিভাগ জানিয়েছে, গতকাল সোমবার মেলার নবম দিনে নতুন ১২৯টি বই এসেছে। এর মধ্যে গল্প ২১, উপন্যাস ১৭, প্রবন্ধ ৯, কবিতা ৩৭, গবেষণা ৬, ছড়া ২, জীবনী ৬, মুক্তিযুদ্ধ ৩, ভ্রমণ ১, ইতিহাস ২, কম্পিউটার ১, রম্য/ধাঁধা ১, সায়েন্স ফিকশন ২ এবং অন্যান্য বিষয়ের ওপর এসেছে ২১টি বই। নবম দিনে মেলার নজরুল মঞ্চে ৭টি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচিত হয়েছে। এর মধ্যে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম উন্মোচন করেন আবুল কালাম মণ্ডলের একটু পরশ বইটির মোড়ক। রাজনীতিক জি এম কাদের উন্মোচন করেন চারটি বইয়ের মোড়ক। মেলায় নতুন আসা বইয়ের তালিকায় অন্যতম প্রথমা প্রকাশন থেকে আসা এবিএম মূসার আমার বেলা যে যায়। ছয় দশকের বর্ণাঢ্য সাংবাদিক-জীবন এবিএম মূসার। এ দেশের সাংবাদিকতা পেশার সূচনা এবং সেই পেশাকে প্রতিষ্ঠিত করার কর্মযজ্ঞে সক্রিয় ছিলেন তিনি। এ বইয়ে তাঁর দীর্ঘ জীবন প্রত্যক্ষ করা যাবে; পাওয়া যাবে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিকথা। পাশাপাশি ভ্রমণ করা যাবে তাঁর বাল্য, কৈশোর ও যৌবনে ঘটে যাওয়া সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঘটনাবলিতে। একই প্রতিষ্ঠান থেকে এসেছে মহিউদ্দিন আহমেদের জাসদের উত্থান পতন: অস্থির সময়ের রাজনীতি। এ ছাড়া মেলায় আসা নতুন বইয়ের মধ্যে আছে আগামী থেকে মুহিত উল আলমের ভাষা, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু, অন্যপ্রকাশ থেকে এসেছে পূরবী বসুর কিংবদন্তীর খনা ও খনার বচন, কথাপ্রকাশ থেকে এসেছে শামসুজ্জামান খানের বাংলার গণসংগীত, পিয়াস মজিদের কামু মার্কেস ইলিয়াস ও অন্যান্য।

মেলামঞ্চের আয়োজন
সোমবার মেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘প্যারীচাঁদ মিত্রের দ্বিশততম জন্মশতবর্ষ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষ। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন আমিনুর রহমান সুলতান এবং মোহাম্মদ আজম। সভাপতিত্ব করেন মোরশেদ শফিউল হাসান।
সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছিল তামান্না তিথির পরিচালনায় নৃত্য সংগঠন ‘কল্পরেখা’ এবং আবুল ফারাহ্র পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘খেলাঘর কেন্দ্রীয় কমিটি’র পরিবেশনা।

আজকের অনুষ্ঠান
আজ মঙ্গলবার বিকেলে মেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘জাতীয় নেতা শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলামের নব্বইতম জন্মবর্ষ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন মুহাম্মদ সামাদ, অধ্যাপক মোহাম্মদ সেলিম ও ড. এম অহিদুজ্জামান। সভাপতিত্ব করবেন কমরেড অজয় রায়।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন