default-image

বিশ্ব অর্থনীতির জন্য করোনাভাইরাস নামের চ্যালেঞ্জটা বিদ্যমান থাকবে তত দিন, যত দিন এর ভাইরাস সহজলভ্য রূপ ও প্রকারে সব দেশের সব বাজারে পাওয়া না যাচ্ছে। করোনার প্রভাব আমাদের এখানে মধ্যম মানের। পৃথিবীর অনেক উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ যখন জিডিপি হ্রাসের শঙ্কায় বিহ্বল, তখন বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ—এ দুয়েরই হিসাবে বাংলাদেশের জিডিপি ভালোর দিকে যাওয়ারই কথা বলা হচ্ছে।

সরকার ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থনীতির চাকা চলমান রাখার জন্য জরুরি সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ চালু হয়েছে। মোট প্রণোদনা সহায়তার পরিমাণও বিশাল—জিডিপির প্রায় ৪ শতাংশ। এই সহায়তার আবার উল্লেখযোগ্য একটা অংশ যাচ্ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা এসএমই খাতে। বলা বাহুল্য, অর্থনীতির চাকা চালু রাখতে এসএমই খাতই সর্বাগ্রগণ্য খাত, যেহেতু আমরা এখনো একটি বিকাশমান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতি।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো অর্থনীতির এই জরুরি অবস্থার সময় চ্যালেঞ্জ উত্তরণে মূল ভূমিকা পালন করছে। প্রতিটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের সম্পদ ও স্থিতিপত্র অনুযায়ী প্রণোদনা প্যাকেজের টাকা বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর এর আওতায় ব্যাংক যে আর্থিক সহায়তা দেবে, তার ক্ষেত্রবিশেষে ৫০ শতাংশ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ পুনঃ অর্থায়ন করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সময়ে বাজারে তারল্যপ্রবাহ বজায় রাখতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সিআরআর বা নগদ সংরক্ষণের হার ৫ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে করা হয়েছে ৪ শতাংশ। এই মুক্ত হওয়া ১ দশমিক ৫ শতাংশের মানে, ব্যাংকিং খাতে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকার তারল্য। এই তারল্যের সুফল আমরা এরই মধ্যে দেখতে শুরু করেছি। বাজারের উত্তপ্ত অবস্থা কেটে গেছে, আমানতের সুদহার পড়ে গেছে, ব্যাংকগুলো এখন ৯ শতাংশ হারে ঋণ দেওয়ার জন্য ভালো রকম প্রস্তুত। এর পাশাপাশি রেপোর সুদহার (ট্রেজারি বন্ড কিনে তা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বন্ধক রেখে ব্যাংকগুলো যে হারে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা নেয়) ৬ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ, যা কিনা তারল্যের প্রবাহকে আরও সুসংহত করেছে।

বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনার মান ও স্বচ্ছতা এমনিতেই বাংলাদেশের অন্যান্য কোম্পানি থেকে তুলনামূলক ভালো। এর ওপর ভিত্তি করে যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারণ করা প্রণোদনার টাকা ব্যাংকগুলো সুষ্ঠুভাবে বিতরণ করে, তাহলে সংকট থেকে উত্তরণের রুপালি রেখার দেখা মেলা আসলেই সম্ভব। কেন ও কীভাবে? করোনাকালে লকডাউনের সময়ে সব ব্যবসা-বাণিজ্যই কমবেশি ক্ষতির শিকার হয়েছিল প্রায় ৬ মাসজুড়ে।

বাজারের উত্তপ্ত অবস্থা কেটে গেছে, আমানতের সুদহার পড়ে গেছে, ব্যাংকগুলো এখন ৯ শতাংশ হারে ঋণ দেওয়ার জন্য ভালো রকম প্রস্তুত। এর পাশাপাশি রেপোর সুদহার (ট্রেজারি বন্ড কিনে তা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বন্ধক রেখে ব্যাংকগুলো যে হারে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা নেয়) ৬ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ, যা কিনা তারল্যের প্রবাহকে আরও সুসংহত করেছে।

অনেক প্রতিষ্ঠানের কাছেই এই ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার মতো প্রয়োজনীয় সঞ্চয় বা অর্থের সংস্থান ছিল না। প্রণোদনা প্যাকেজে দেওয়া চলতি মূলধন সুবিধা এসব ক্ষেত্রে একটা প্রতিষ্ঠানের লকডাউন-পূর্ববর্তী ও লকডাউন-পরবর্তী সময়ের দুই ভিন্নতর আর্থিক অবস্থার মাঝখানে কাজ করেছে সেতুর মতো। এর পাশাপাশি এই অনিশ্চিত ও ব্যবসায়িক মন্দার সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক যে গ্রাহকের ব্যাংকঋণ শোধ না করার প্রায় এক বছরব্যাপী ছুটি ঘোষণা করেছে, ঋণের নিম্নমান বা শ্রেণীকরণ স্থগিত রেখেছে, সেটাও ব্যবসায়ীদের জন্য কাজ করেছে সুবাতাস হয়ে, তাঁরা ব্যবসায়িক পরিস্থিতি গুছিয়ে ওঠার বেশ কিছুটা সময় পেয়েছেন।

default-image

তবে কোভিড-১৯ মোকাবিলার পরিকল্পনা স্বল্পমেয়াদি হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদিও হতে হবে। ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে দেওয়া প্রণোদনা স্বল্পমেয়াদি একটা সমাধান। দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা সমাধানের জন্য যদি বিদেশ থেকে ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন হয়, আমাদের সেটাও নিতে হবে। আমাদের জিডিপির তুলনায় বিদেশ থেকে নেওয়া ঋণের হার এখনো অনেক কম। ধরা যাক, সরকার যদি ১২ বিলিয়ন ডলারের এই প্রণোদনা প্যাকেজগুলোর টাকার পুরোটার সংস্থান বৈদেশিক ঋণ নিয়ে করত, তবু বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ও জিডিপির অনুপাত বর্তমানের ১৫ শতাংশ থেকে সামান্য বেড়ে হতো মাত্র ১৮ শতাংশ। কিন্তু ব্যাংকিং ব্যবস্থারয় বিদ্যমান তারল্য ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের খোলা পুনঃঅর্থায়ন ব্যবস্থার কারণে আমরা যে এ রকম এক ধাক্কার সময়েও বৈদেশিক ঋণ তেমন একটা নিইনি, সেটাও কিন্তু ভালো। কারণ, সামনে অবস্থা যদি কোনো কারণে খারাপের দিকে যায়, তাহলে সেই অব্যবহৃত পথট খোলাই থাকল।

এ মুহূর্তে বেশ কিছু ব্যাংক ঘরে বসেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার নতুন অ্যাপ চালু করেছে, যা নির্বাচন কমিশনের ‘পরিচয়’ নামের ডেটাবেইসের সঙ্গে যুক্ত। এতে করোনার ভয়ে ভীত থাকা মানুষের ব্যাংকিং সম্ভব হবে, সহজ হবে এবং দীর্ঘ মেয়াদে তা ব্যাংকিং ব্যবস্থার মানচিত্রই বদলে দেবে।

উত্তরণে ব্যাংক কেন ভরসা, তার আরেকটা দিক না বললেই নয়। লকডাউনের সময় যখন সারা দেশ বন্ধ, অফিস-আদালত সব অচল, তখনো হাসপাতাল ও আরও কিছু জরুরি সেবা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি জনগণের জন্য নিজেদের দরজা পুরো খোলা রেখে গেছে ব্যাংকগুলো। বেশ কয়েকজন ব্যাংকার মারা গেছেন করোনায়, তারপরও বন্ধ হয়নি ব্যাংক খোলা রাখা। সরকারের এই সিদ্ধান্ত সাহসী ছিল এবং সময়ের সঙ্গে দেখা গেছে যে তা সঠিকও ছিল। ব্যাংক খোলা রাখার কারণে সেভাবে হোঁচট খায়নি দেশের ভেতরের কেনাবেচা ও উৎপাদন কিংবা আমদানি-রপ্তানি।

বিজ্ঞাপন

এপ্রিল-মে মাসে কোভিডের সেই তীব্র ধাক্কা এখন অনেক কমে গেছে। তার মানে, এ মুহূর্তে ব্যবসা–বাণিজ্যের সূচক আবার ঊর্ধ্বমুখী। দেখছি যে অনেক ব্যবসাই কোভিড-পূর্ববর্তী অবস্থায় পৌঁছে গেছে। আমাদের সিটি ব্যাংকেরই ক্রেডিট কার্ড লেনদেনের কথা যদি দেশের দোকানগুলোয় কেনাবেচা কেমন চলছে তার একটা সূচক হিসেবে ধরি, তো দেখা যায়, দোকানে দোকানে বসানো সিটি ব্যাংকের পয়োন্ট অব সেলস (পস) মেশিনগুলোয় লেনদেনের পরিমাণ এ বছরের প্রথম ৯ মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা কিনা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত বছর থেকে এটা কমেছে মাত্র ১১ শতাংশ। এর মূল কারণ, জুলাই মাস থেকে জনজীবন আবার ফিরে এসেছে প্রায় স্বাভাবিক অবস্থায়, মানুষ আবার ছুটে গেছে বাজারে-দোকানে, তেমনি দোকানি আবার ফিরে গেছেন দোকানে মাল তুলতে কিংবা উৎপাদনে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান দুই স্তম্ভের একটা তৈরি পোশাক রপ্তানি আর অন্যটি বিদেশ থেকে আসা রেমিট্যান্স। রেমিট্যান্স ও তৈরি পোশাক রপ্তানি—দুই খাতেই ব্যাংক পালন করছে সবচেয়ে বড় অনুঘটকের ভূমিকা—ব্যাংক ব্যবস্থার মাধ্যমেই বিদেশ থেকে পাঠানো টাকা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে প্রান্তিক ভোক্তার কাছে, আবার ব্যাংক থেকে এলসি খুলেই বিদেশে পাঠানো হচ্ছে তৈরি পোশাক।

default-image

কোভিড আমাদের অর্থনীতির সহ্যক্ষমতা বা রেজিলিয়েন্সের একটা অ্যাসিড টেস্ট ছিল। এর থেকেই আমরা শিখেছি কী করে বাসায় বসে অফিস করা যায়, কী করে ঘরে বসেই উৎপাদনের চাকা চালু রাখা যায়। ঘরে বসে কাজ করার পুরো ব্যাপারটা ঘটেছে ডিজিটাল মাধ্যমে। অর্থাৎ কোভিড আমাদের বাস্তবের রূঢ় ধাক্কা দিয়ে ডিজিটালাইজেশনের পথে এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে। এ সময়েই ব্যাংকগুলোর ইন্টারনেট ব্যাংকিং বা ডিজিটাল ব্যাংকিং অ্যাপগুলো অনেক বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে; বিকাশ, নগদ ও রকেটের পাশাপাশি কোটি কোটি টাকার লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে ব্যাংকগুলোর নানা অ্যাপে। আমি আমাদের সিটি ব্যাংকের ডিজিটাল ব্যাংকিং অ্যাপ ‘সিটিটাচ’-এর কথাই বলতে পারি যে গত দুই বছরের সমান সিটিটাচ লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে কেবল লকডাউনের চার মাসেই (মে-আগস্ট)। এ মুহূর্তে বেশ কিছু ব্যাংক ঘরে বসেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার নতুন অ্যাপ চালু করেছে, যা নির্বাচন কমিশনের ‘পরিচয়’ নামের ডেটাবেইসের সঙ্গে যুক্ত। এতে করোনার ভয়ে ভীত থাকা মানুষের ব্যাংকিং সম্ভব হবে, সহজ হবে এবং দীর্ঘ মেয়াদে তা ব্যাংকিং ব্যবস্থার মানচিত্রই বদলে দেবে।

ব্যাংকগুলো সুষ্ঠু নীতি প্রণয়ন ও গ্রাহকবান্ধব হওয়ার মাধ্যমে অবশ্যই পারে অর্থনীতিতে করোনার আঁচড়কে দ্রুত উপশম করতে। কিন্তু সুস্থ এক সমাজ গঠনের কথা যদি বলি—সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্য ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য—দুটিতেই পৌঁছানোর কথা যদি বলি—তাহলে ব্যাংকগুলোরও দরকার উন্নয়ন সহযোগী নীতি-সুবিধা। আশার কথা যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোভিডের অপ্রত্যাশিত ধাক্কা খেয়ে বাস্তবতার অভিমুখে চোখ খুলতে বাধ্য হয়ে সেদিকেই যাওয়া শুরু করেছে।

মন্তব্য পড়ুন 0