বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

পাঠ্যবইয়ের মান ও বিষয়বস্তু নিয়ে কখনো কখনো সংগত কারণেই প্রশ্ন ওঠে। এমনকি প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর চাওয়া অনুযায়ী পাঠ্যবইয়ের কিছু বিষয়বস্তু নেতিবাচকভাবে পরিবর্তিত হওয়ার মতো ঘটনাও আমরা দেখি। কিন্তু সব শিক্ষার্থীকে বিনা মূল্যে বই দেওয়ার কারণে তাদের অনেক উপকার হচ্ছে, এটা সর্বজনস্বীকৃত। এতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা কেবল খুশি, তা-ই নয়, ঝরে পড়া রোধ, বিদ্যালয়ে ভর্তির ওপর ইতিবাচক প্রভাবও পড়েছে। শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যা বেড়েছে। বিনা মূল্যে নতুন বই দেওয়ার ফলে সব ধরনের শিক্ষার্থীর মধ্যে বিরাজমান বৈষম্য কিছুটা হলেও কমেছে।

এখন উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান যে বই পাচ্ছে, তেমনি নিম্নবিত্ত বা বিত্তহীন পরিবারের সন্তানও একই মানের, একই বই পাচ্ছে। একটা সময় প্রাথমিকে অর্ধেক বই বিনা মূল্যে দেওয়া হতো। বাকি বই শিক্ষার্থীদের কিনে পড়তে হতো। আর মাধ্যমিক স্তরে সব বই কিনতে হতো। কিন্তু অর্থের অভাবে অনেক শিক্ষার্থী বই কিনতে পারত না। তখন অনেকে পুরোনো বই সংগ্রহ করে পড়ত। হয়তো কোনো শিক্ষার্থী পরের বছর যে শ্রেণিতে উঠত তার আগেই সেই শ্রেণির কোনো শিক্ষার্থীর পুরোনো বই পাওয়ার জন্য অনুরোধ করে রাখত। এভাবে বই পেতে কখনো কখনো বছরের কয়েক মাস চলে যেত। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বেশ বিঘ্ন ঘটত। সুবিধাভোগী জনগোষ্ঠীর কেউ কেউ আগে বই পেয়ে যেত। এর ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে একধরনের বৈষম্যের সৃষ্টি হতো।

কিন্তু ২০১০ সাল থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে সব শিক্ষার্থীকেই বিনা মূল্যে নতুন পাঠ্যবই দিচ্ছে সরকার। বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে আমরা জানতে পেরেছি, শুরুর বছর মোট পৌনে তিন কোটি শিক্ষার্থীর জন্য প্রায় ১৯ কোটি ৯১ লাখ বই ছাপিয়ে বিতরণ করা হয়েছিল। আর চলতি বছর চার কোটি ১৬ লাখের বেশি শিক্ষার্থীর জন্য ৩৪ কোটির বেশি বই ছাপিয়ে বিতরণ করা হয়। তার মানে শিক্ষার্থী ও বইয়ের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। করোনার কারণে চলতি বছরে বই বিতরণে হয়তো কিছুটা অসুবিধা হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু বিনা মূল্যে বই দেওয়ার কাজটি থেমে যায়নি। এ জন্য অবশ্যই সরকার সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য।

বিনা মূল্যে সবাইকে বই দেওয়ার এই দাবিটি চলছিল অনেক দিন ধরে। দেশে গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা চালুর পর থেকেই শিক্ষার অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন, নাগরিক সমাজ ও শিক্ষাবিদেরা পাঠ্যপুস্তক বিতরণে বৈষম্য দূর করার জন্য সরকারের সঙ্গে দেনদরবার করে আসছিলেন। ইতিমধ্যে ২০০০ সালে যখন সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) গৃহীত হলো তাতে বাংলাদেশও ছিল অন্যতম স্বাক্ষরকারী দেশ। সেখানে বলা হয়, শিক্ষার ক্ষেত্রে কোনো শিশুর প্রতি বৈষম্য করা যাবে না। গণসাক্ষরতা অভিযানের পক্ষ থেকেও আমরা তখন এই বিষয়গুলো উল্লেখ করে সরকারের কাছে স্মারকলিপিও দিয়েছিলাম। তখন শুধু সরকারি বিদ্যালয় ও রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বই দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে আমরা বলেছিলাম এতে বড় ধরনের বৈষম্য হয়। আমরা উদাহরণ দিয়ে আরও বলেছিলাম, বস্তি এলাকার শিক্ষার্থী, ভিন্ন জাতিসত্তা ও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা তাদের অধিকার লঙ্ঘনের শামিল। তখন সরকারের একজন কর্মকর্তা নোটে লিখেছিলেন গণসাক্ষরতা অভিযানের আবেদন গ্রহণ করা হলো, কিন্তু ফাইলে লিখেছিলেন, তার মানে কি এনজিও পরিচালিত বিদ্যালয়েও বই দিতে হবে? তারা তো বিদেশ থেকে অর্থ আনেন শিক্ষার্থীদের পড়ানোর জন্য! তখন শুরু হলো আমাদের আরেক সংগ্রাম। আবার আমরা উদাহরণ দিয়ে বলেছিলাম, এই কারণে বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের বইপুস্তক দিয়ে বেসরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ানো হয়। অর্থাৎ জাতীয় শিক্ষাক্রমের আলোকে সব শিক্ষার্থী পাঠ্যবই পড়ছে না এবং একই ধরনের প্রান্তিক যোগ্যতাও অর্জন করছে না। এতে আরেক ধরনের বৈষম্য তৈরি হয়েছে।

এই সংগ্রাম কিন্তু এত সহজ ছিল না। পরে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এই বিষয়টি বিবেচনায় নিলেও বাস্তবায়ন করা হয়নি। ২০০৮ সালে অন্যদের সঙ্গে আমিও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর এ-সংক্রান্ত ফাইলটি একটু নাড়াচাড়া করলাম। তখন যে পরিমাণ বই ছাপা হতো তার ছাপার কাগজ আসত বাইরে থেকে এবং তার জন্য অর্থের জোগান দিত বিশ্বব্যাংক। তখন বিশ্বব্যাংক বলল, প্রকিউরমেন্টের গাইডলাইন অনুযায়ী এটি করা সম্ভব হবে না এবং বই পেতে অনেক দেরি হয়ে যাবে। বাধ্য হয়ে সরকারও পিছু হটল!

অবশেষে, ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন ক্ষমতায় এলেন তখন এ রকম নানা ধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে অতিক্রম করে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নিলেন। তাঁরই দিকনির্দেশনা অনুযায়ী ২০১০ সাল থেকে শুধু প্রাথমিক নয়, মাধ্যমিক স্তরের সব শিক্ষার্থীকেও বিনা মূল্যে নতুন বই দেওয়া শুরু হয়। এখন প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের সব পর্যায়ে সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নতুন বই দেওয়া হয়, যা চলমান আছে, কখনো থেমে যায়নি। সবার জন্য না হলেও কয়েকটি ভিন্ন জাতিসত্তার শিক্ষার্থীদের কয়েকটি শ্রেণিতে তাদের মাতৃভাষায় বই দেওয়া হচ্ছে। এসব বিষয়ে নাগরিক সমাজ ও শিক্ষকসমাজ শক্তিশালী ভূমিকা পালন করেছেন। আর সরকার তার রাজনৈতিক অঙ্গীকার পূরণে এগিয়ে এসেছে, এর মধ্যে দিয়ে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। পৃথিবীর বহু দেশে বিষয়টি প্রশংসিত হয়েছে। যারা কাগজ জোগাড় করতে প্রক্রিয়াগত নানা সমস্যার কথা বলেছিল, তারাও কিন্তু এখন প্রশংসা করে। বিশ্বদরবারেও এই অর্জনটি প্রায়ই অনন্য দৃষ্টান্তরূপে তুলে ধরা হয়।

কিন্তু আমরা এখন যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে আমাদের সামনে ভিশন-২০৪১। টেকসই অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রা-২০৩০-এ (এসডিজি) আমরা স্বাক্ষর করেছি, তাতে শিক্ষার মান ও সমতার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমান বিশ্ব শুধু পাঠ্যপুস্তকের পুঁথিগত জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এখন বাস্তবভিত্তিক সহপাঠের বিষয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। তাই সাপ্লিমেন্টারি পাঠ্যপুস্তক ও উপকরণের প্রয়োজন অনেক বেশি। কিন্তু সে ক্ষেত্রে আমরা এখনো বেশি দূর এগোতে পারিনি। শিক্ষক সহায়িকা গাইডও সময়মতো দেওয়া হচ্ছে না। পুরো শিক্ষা পরিবার, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মনে রাখা প্রয়োজন যে, এখন পৃথিবী ক্রমাগত বদলাচ্ছে, নতুন নতুন দিকে অগ্রসর হচ্ছে। করোনাকালে আমরা তথ্যপ্রযুক্তির গুরুত্ব নতুন করে বুঝতে পেরেছি।

এ ছাড়া চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মোকাবিলা করতে হলেও আমাদের অনেক বেশি প্রস্তুত হতে হবে। নতুন প্রজন্মকে সেভাবেই তৈরি করা প্রয়োজন। প্রস্তাবিত নতুন শিক্ষাক্রমে এই বিষয়গুলোর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সেই শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় আমাদের আরও বহুমুখী কাজ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন, পৃথিবীর জ্ঞানের ভান্ডার শুধু পুঁথিগত বিদ্যা নির্ভর থাকছে না, ক্রমাগত উন্মুক্ত হয়ে যাচ্ছে। পরিশেষে বলতে চাই, বছরের শুরুতে সব শিক্ষার্থীর হাতে নতুন পাঠ্যবই দেওয়ার যে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন হলো, সেটিকে কাজে লাগিয়ে এখন আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। অর্জনগুলো ধরে রাখতে হলে যথাযথ কৌশল ও যুগোপযোগী ও দক্ষ শিক্ষা ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই।

রাশেদা কে চৌধূরী: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন