default-image

বছর তিনেকের জড়তা কাটিয়ে প্রতিপক্ষের আঘাত ও ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিয়ে ভাষার দাবিটি অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে পূর্ব ব্যর্থতার বোঝা ঝেড়ে ফেলতে থাকে। এদিক থেকে ১৯৫১ সালটা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। স্বৈরশাসকদের চণ্ডনীতি বা অদূরদর্শিতা যে কখনো কখনো গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য সুবাতাস বয়ে আনে, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে তা নানা ঘটনায় প্রমাণিত।

আটচল্লিশে পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তর একটি সাদামাটা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান ভাষার দাবিতে আগুন জ্বেলেছিল। তেমনি আভাস ছিল পঞ্চাশে মূলনীতি কমিটির উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা সুপারিশের প্রতিক্রিয়ায়। আর বায়ান্নে প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দিনের রাষ্ট্রভাষাবিষয়ক মন্তব্যের স্ফুলিঙ্গ তো আন্দোলনের দাবানল তৈরি করে।
সবকিছু মিলিয়ে ১৯৫১ সন নানা দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। যেমন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি, তেমনি স্বদেশে সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের দাবি নিয়ে তৎপরতার ক্ষেত্রে। ছাত্র-যুবসমাজে যেমন এ দাবির পক্ষে সমর্থন ব্যাপক হতে থাকে, তেমনি জনচেতনাকেও তা কিছুটা হলেও স্পর্শ করতে দেখা যায়। পায়ের নিচে মাটি শক্ত হয়ে ওঠার কারণেই বোধ হয় ১৯৫১ সালের ১১ মার্চ উদ্যাপন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এদিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে ইতিবাচক। এই প্রথম ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ১১ মার্চ উদ্যাপনের প্রস্ত্ততি চলে। সংগ্রাম কমিটির আহ্বানে ওই দিন সব শিক্ষায়তনে ধর্মঘট পালিত হয়। সংগ্রাম কমিটির প্রচারিত এক ইশতেহারে বলা হয়: ‘বন্ধুগণ, আসুন, আমরা ১১ মার্চ আমাদের ঐতিহাসিক রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে স্মরণ করে পুনরায় লৌহদৃঢ় প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষারূপে ঘোষণা করতে কতৃ‌র্পক্ষকে বাধ্য করি।’ নারায়ণগঞ্জসহ দেশের একাধিক শহরে সেবার ১১ মার্চ সভা, সমাবেশ, মিছিলসহ উদ্যাপিত হয়। আবার স্লোগান ওঠে, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘রাজবন্দীদের মুক্তি চাই।’

বিজ্ঞাপন

নতুন করে রাষ্ট্রভাষা বাংলার অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা এমনই উদ্দীপনা জোগায় যে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতো ধীরস্থির ব্যক্তিও ১৬ মার্চ (১৯৫১) কুমিল্লায় অনুষ্ঠিত শিক্ষক সম্মেলনে সভাপতির ভাষণ দিতে গিয়ে বলেন: ‘বাংলা ভাষা অবহেলিত হইলে আমি ব্যক্তিগতভাবে বিদ্রোহ করিব।’ এ সময় রাষ্ট্রভাষা বাংলার সমর্থনে এগিয়ে আসেন স্বনামখ্যাত বেশ কিছুসংখ্যক শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবী। পরিবেশ তখন অনেকটাই বাংলার পক্ষে। চট্টগ্রামে এ সময় অনুষ্ঠিত সাংস্কৃতিক সম্মেলনে ঐতিহ্যবাহী লোকসংস্কৃতি এবং গণসংস্কৃতি ও প্রগতিবাদী সাংস্কৃতিক চেতনার যে প্রকাশ ঘটে, তা থেকেও সংস্কৃতি অঙ্গনে বাঁকফেরা পরিবর্তনের আভাস মেলে।

তাই দেখা যায়, রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সোচ্চার ছাত্রদের প্রতি জনসাধারণের মধ্য থেকেও সমর্থন উঠে আসতে শুরু করেছে। একান্নর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম কমিটির পক্ষ থেকে পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্যদের কাছে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিসংবলিত স্মারকলিপি প্রেরণ (১১ এপ্রিল)। ওই স্মারকলিপি পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক মহলকে খুব একটা স্পর্শ না করলেও সাংবাদিক মহলে আলোড়ন তুলেছিল। ডন পত্রিকার পরোক্ষ সমর্থনের পাশাপাশি পেশোয়ারের খাইবার মেইল পত্রিকা সম্পাদকীয় নিবন্ধে লেখে: ‘বাংলা ভাষার দাবি অবহেলা করা যায় না। আমরা মনে করি, বাংলা ও উদু‌র্ উভয় ভাষাকেই পাকিস্তানের সরকারি ভাষারূপে স্বীকার করা উচিত’ (২০ এপ্রিল)। একান্ন সালজুড়ে ভাষাবিষয়ক তৎপরতা ছিল লক্ষ করার মতো, যা একুশের বিস্ফোরক পটভূমি তৈরিতে সাহাঘ্য করে।

রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে গড়ে ওঠা অনুকূল পটভূমি সত্ত্বেও বাংলাবিরোধীদের তৎপরতা তখনো বন্ধ হয়নি। সরকারি-বেসরকারি উভয় দিক থেকে তখনো চলেছে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা। গণপরিষদের কোনো কোনো বাঙালি সদস্য এদিক থেকে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। যেমন—করাচিতে অনুষ্ঠিত নিখিল পাকিস্তান উদু‌র্ সম্মেলনে (১৫ এপ্রিল ১৯৫১) সভাপতির ভাষণে মওলানা আকরম খাঁ উদু‌র্ রাষ্ট্রভাষার পক্ষে মতামত প্রকাশ করেন।

এ বক্তব্যের প্রতিবাদে তৎকালীন পাকিস্তান অবজারভার বলিষ্ঠ ভূমিকা গ্রহণ করে। ১৮ এপ্রিল এক প্রতিবাদী সম্পাদকীয়তে লেখা হয়: ‘রিপোর্ট অনুযায়ী মওলানা আকরম খাঁ উদু‌র্ সম্মেলনে বলেছেন যে, যারা উদু‌র্র বিরোধিতা করে তারা ইসলামের শত্রু। ধরে নেওয়া যেতে পারে যে, তিনি এই শত্রুদের মধ্যে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতো ব্যক্তিদেরও অন্তভু‌র্ক্ত করেন।’ এ বিষয়ে ছাত্র-বুদ্ধিজীবীদের একাংশের প্রতিবাদ সূত্রে অবজারভার দুই দফায় প্রতিবাদী সম্পাদকীয় লিখে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। শুধু আকরম খাঁ নন, কবি গোলাম মোস্তফাসহ কয়েকজন লেখক, শিক্ষকও উদু‌র্র পক্ষে সমর্থন জানান। হতে পারে, বাংলা রাষ্ট্রভাষার পক্ষে ক্রমবর্ধমান সমর্থন তাঁদের শঙ্কিত করেছিল।

বিজ্ঞাপন

এভাবে ১৯৫১ সালে বাংলা রাষ্ট্রভাষার পক্ষে নতুন করে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মহলে যে তর্কবিতর্ক ও বাংলার পক্ষে যে তৎপরতা দেখা যায়, তা সেই মুহূর্তে ভাষা আন্দোলনের জন্ম দেয়নি ঠিকই, কিন্তু সন্দেহ নেই, তা ভবিষ্যৎ আন্দোলনের জন্য মজবুত ভিত তৈরি করেছিল। সেসব তৎপরতা ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিকে বাঙালি জীবনের এক তাৎপর্যময় সময় হিসেবে চিহ্নিত করতে সাহাঘ্য করেছে।

পটভূমি হিসেবে আরও নানা দিক থেকে সময়টা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। পূর্ববঙ্গে মানুষ তখন খাদ্যসংকট, লবণসংকট, পাটের মন্দাসহ নানা সমস্যায় জেরবার। চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী আন্দোলন, ভুখামিছিল, অর্থনৈতিক মন্দা এবং সেই সঙ্গে সরকারি দমননীতি, নির্যাতন—সবকিছু মিলেই একুশের পটভূমি তৈরি করে। দেশব্যাপী অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে আগুন জ্বালতে দরকার ছিল একটি স্ফুলিঙ্গের। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন সে স্ফুলিঙ্গটির জোগান দিয়েছিলেন বায়ান্ন সালের ২৭ জানুয়ারি তাঁর ভাষণে।

সূত্র: ভাষা আন্দোলন, আহমদ রফিক, প্রথমা প্রকাশন, ২০০৯

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন